Shadow

পাকা দেখা – অমরেন্দ্র কালাপাহাড়

PC Freestock

পাকা দেখা


অমরেন্দ্র কালাপাহাড়

তিন্নি কলেজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। মা রান্নাঘর থেকে হেঁকে বলে,“আজ দুটো পর্যন্ত কলেজ করে বাড়ি ফিরবি। আজ তোর পাকা দেখা আছে। ওরা বিকেল চারটার মধ্যে এসে যাবে। তোর বাবা পইপই করে বলে গেছেন যেন অন্যথা না হয়। ছেলে ব্যাংকের ক্যাশিয়ার। তোর বাবার বন্ধুর ছেলে। ওদের কথা-জানা শোনার মধ্যে যখন একেবারে পাকা দেখাই হবে।” 

তিন্নি রাগতস্বরে মাকে বলে,“যে মেয়েটির এখনো কলেজ পড়া শেষ হলো না,নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য একটা চাকরি জুটলো না কেন তাকে নিয়ে এত তোমাদের মাথা ব্যথা? তার চেয়ে গলায় কলসি বেঁধে গঙ্গায় ফেলে দিতে পারো? মা বলে,” অমন সুন্দর ছেলে, জানাশোনা,ভালো চাকরি করে,বাবার বন্ধুর ছেলে ! তারা যেচে এসেছে ! এমন করে হাতের লক্ষ্মী ঠেলে ফেলে দিতে হয় মা?”

তিন্নি
রাগে গজগজ করতে করতে কলেজে বেরোয়। মনের ভিতর একরাশ চিন্তা কিভাবে যাত্রা বিয়ের পাকা দেখার হাত থেকে অব্যাহতি পাবে। কলেজ আজ চুলোয় যাক ! যে কোন ভাবে শুভর সাথে দেখা করতেই হবে। যদি শুভর বুদ্ধিতে যাত্রায় বিয়ের পাকা দেখা বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত না গড়ায়! তিন্নি পথ চলতে বেশ কয়েকবার হোঁচট খায়। সে কিভাবে শুভকে ছেড়ে শুধু পরিচিত বলে, পয়সাওয়ালা বলে তাকে সাত পাকে বাঁধবে! মানুষের মন হৃদয় বলে কি কিছু নেই! সেই স্কুল বেলা থেকে শুভর সাথে তার প্রেম!

মনে মনে তিন্নি ভাবে বাবামা যাই ভাবুক সে দেরি করে কলেজ থেকে ফিরবে! যাহোক একটি অজুহাত খাঁড়া করবে দেরিতে আসার জন্য! কিন্তু পরক্ষণে ভাবে ওটা কোন সমাধান নয় কারণ ওরা বাবার পরিচিত। পরে শীঘ্রই কোন দিন ঠিকই আবার চলে আসবে। ভাবছিল তার সাথে শুভর প্রেমের কথা সরাসরি বাবামাকে জানিয়ে দেবে কিন্তু শুভর মতো একটি বেকার ছেলেকে তার বাবামা কেনই বা মেনে নেবে!

শুভ তিন্নির চোখ মুখ দেখে বুঝতে পেরেছিল সবই কিন্তু বলেছিল একটা সামান্য মাইনের চাকরি না পেলে কোন মুখে সে তার বাবা মার মুখের সামনে দাঁড়াবে!যুক্তি দেয় তুই ছেলেটির সাথে আলাদা করে ডেকে গোপনে তোদের প্রেমের কথা জানিয়ে দিস তাহলেই কাজ হবে!

বিকেল চারটেয় বাবার বন্ধু স্ত্রী তার ছেলে তিমিরকে নিয়ে হাজির হয় পাকা দেখার জন্য। তিন্নির গায়ের দুধে আলতা রঙ সাবলীল কথাবার্তা দেখে রায় দম্পতি আহ্লাদে আটখানা! তিন্নি সুযোগ খুঁজছিল কখন তিমিরের সাথে বসে একান্তে তার মনের কথা বলবে! অবশেষে তিমিরের বাবা রায়বাবু বলেন তোমরা দুজনে একান্তে বসে তোমাদের মতামত দ্রুত জানালে বিয়ের দিন ঠিক করা হবে।

তিমিরের চোখমুখে যেন একটা চঞ্চলতা লক্ষ্য করছিল তিন্নি! তিন্নি শুরু করে আচ্ছা! তুমি কি সত্যিই খুশি হবে তাকেই জীবন সঙ্গিনী পেলে? তিন্নির সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিতে ইতস্ততঃ করছিলো তিমির কারণ তার একটা পিছু টান আছে সে তো সৃজাকে প্রাণের চেয়ে ভালোবাসে। বাবামার জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে তিন্নিকে দেখতে এসেছে। ভেবেছিল যদি তিন্নি সত্যিই খারাপ দেখতে হয় তাহলে তার পক্ষে না বলাটা সহজ হয়ে যাবে। সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না! কিন্তু সে কিভাবে সুন্দরী লাবণ্যময়ী তিন্নির মুখের সামনে পছন্দ হয়নি বলবে? তিন্নি সঙ্গে সঙ্গে বলে দেয় সে কিন্তু তাকে পছন্দ করতে পারছে না কারণ তার বাল্যবন্ধু শুভ ছাড়া সে বাঁচবে না! তিমির তিন্নির কথাটা লুফে নেয়। তিন্নিকে জানায় সৃজা ছাড়া তারও জীবন বৃথা! দুজনের এই অপ্রিয় সত্য কথাটা কখন কিভাবে পেশ করবে নিয়ে চলে টানাপোড়েন!তিন্নিই সাফ জানায় কলেজ পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে কিছুতেই  বিয়ে করতে পারবে না। তিমির সঙ্গে সঙ্গে তাতে সায় দেয়। তাই হোক এত তাড়াহুড়ো কিসের! বিয়ে তো  আর পালিয়ে যাচ্ছে না!

রায় দম্পতির বুঝে নিতে দেরি হয়নি নিশ্চয় মেয়ের কোন পিছুটান আছে। সাফ জানিয়ে দেয় তার সোনার টুকরো ছেলের সুন্দরী পাত্রী পেতে কোনো সমস্যা হবে না। নেহাত চেনা জানা বলে আসা! কত মেয়ে লাইন
দিয়ে আছে!টিফিন খাওয়া সম্পূর্ণ না করে রেগে ওরা চলে যান!

তিন্নির অসম্মতিতে এত বড় ভাল পাত্র হাতছাড়া হওয়ায় তিন্নির বাবা মা ভীষণ মুষড়ে পড়েন,মেয়েকে যাচ্ছেতাই ভাষায় অপমান করে সাফ জানিয়ে দেয় আর কোনদিন যেন তাদের এমনি পাকা দেখায় বসতে না হয় আর এমন অপমান সহ্য  করতে না  হয়!

এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। তিন্নি কলেজ পড়া শেষ হলেও নানা অছিলায় সব সম্বন্ধ ভেস্তে দেওয়ায় বাবামার বুঝতে বাকি থাকে না মেয়ের পিছু টান আছে।  এদিকে রায় দম্পতি নাজেহাল হচ্ছেন ছেলের বউ ঠিক করতে! আসলে যার সঙ্গে যার বিয়ের যোগ স্থির আছে তা যেন খন্ডাবার নয়!

তিন্নি ভাবতে পারেনি তার প্রেমিক শুভ ভালো একটি চাকরি পেয়ে এক পয়সা ওয়ালার সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করে কেটে পড়বে ! তিমিরও বুঝে উঠতে পারেনি সৃজা তাকে এমনি ল্যাং মেরে হাভাতে গোবেচারার এক ছেলের হাত ধরে পালিয়ে যাবে !

অবশেষে তিন্নিই ফোন করে তিমিরকে তার জীবন সঙ্গিনীর পোস্ট কি এখনো কি খালি আছে? তিমির ইতস্ততঃ করে বলে তা বলতেই পারো কারন তার প্রেমিকা একটি বেকার ছেলেকে নিয়ে এমনি পালিয়ে যাবে ভাবতে পারেনি! তিন্নি প্রস্তাব দেয় তিমিরকে তাহলে কি আবার তাদের পাকা দেখা হতে পারে ? তিমির আমতা আমতা করে বলে তার কোনো আপত্তি নেই তার ন্যায় এক সুন্দরী যুবতীকে সাতপাকে বাঁধতে! তবে বাবামাকে লজ্জায় কিভাবে বলবে  সেদিনের অপমানজনক ঘটনার পর!

তিন্নি তিমিরের বন্ধুবান্ধব সে দায়িত্ব নেয়। তিন্নি তিমিরের বাবামাকে ফোন করে দ্রুত চলে আসতে বলা হয় স্থানীয় একটি মন্দিরে। ফোনে জানায় তারা তিন্নি এমন একটি ছেলেকে বিয়ে করছে এবং তিমির এমন একটি মেয়েকে বিয়ে করছে যা তাদের পক্ষেও মানা সম্ভব হচ্ছে না যদি ঠেকাতে চান তো দ্রুত চলে আসেন যেন মন্দিরে! ভাবতে পারেনি তিন্নির বাবা মা রায় দম্পতি নব বধু বেশে তিন্নি তিমিরকে এমনি দেখতে পাবে !তিন্নি তিমিরকে বেশ মানিয়েছে! হঠাৎ তিন্নি তিমির  প্রণাম করে ওদেরকে বলে পাকা দেখাটা শেষ করে ফেলতে! বলে আশীর্বাদ করবে না? ওদিকে বামন ঠাকুর যে ঘনঘন বড় তাড়া লাগাচ্ছে !
************************
অমরেন্দ্র কালাপাহাড়
কবি ও গল্পকার অমরেন্দ্র কালাপাহাড় পরিচিতি: ১৩৬৬ বঙ্গাব্দের ১০ই আশ্বিন দক্ষিণ ২৪পরগনা জেলার কুলপি থানার তারাচাঁদপুর গ্ৰামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম। অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক,এম এ বিএড। শৈশবে টুকিটাকি লেখা হলেও ২০১৮ থেকে পঞ্চাশের বেশি সাহিত্য পত্রিকা ও ফেসবুকে নিয়মিত লেখালেখি। বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ-খোলা আকাশ (২০২০)।

 

 

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!