
রক্তে রঞ্জিত প্রেম
নবনীতা চক্রবর্তী
“আরও কতটা পথ পার হতে হবে একসাথে পথ চলতে গেলে,বলতে পারিস,বাবুল?”
কথাটা বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় রুকসা। যাকে বলে,তার দীঘল চোখের দৃষ্টি তখন দূরের সর্ষে ক্ষেতের দিকে। সে বিভোর হয়ে দেখছিল,নীল আকাশের ক্যানভাসে হলুদ সবুজের রং-মিলান্তির খেলা। রুকসার একহাত শক্ত করে তার একহাতে ধরা। হঠাৎ রুকসার এই প্রশ্নে,প্রায় চমকে তাকায়। দেখে, বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে রুকসা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবুল বলে,”এমন সব প্রশ্ন করিস না মাঝেমাঝে !”
রুকসা আর বাবুলের বন্ধুত্ব তাদের কলেজ জীবনের শুরু থেকেই। শহরতলির বড় একটি কলেজে পড়ত ওরা। আড়ষ্ট ও মুখচোরা বাবুলের মায়াবী চোখ, আকৃষ্ট করেছিল ছটফটে মেয়ে রুকসাকে। হস্টেলে থাকা বাবুল মোটেই মিশুকে ছিল না। এদিকে নাচ গানে পটু এবং সারাক্ষণ হইচই করা রুকসার ভীষণ মনে ধরেছিল এই নিরীহ ছুপারুস্তম কবিকে। ধীরে ধীরে যত জেনেছে,দেখেছে,ততই জড়িয়ে গেছে। মনের তাগিদে ছুটে গেছে বাবুলের দিকে,বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে। বাবুলের আড়ষ্টতা কাটতে সময় লেগেছিল কিছুদিন। কিন্তু প্রজাপতি মনা মেয়েটির পাগলামির কাছে হার মেনেছে। কবে থেকে যে গভীর প্রেমে পাগল হল দুটি মন,নিজেরাই জানে না। এমনও হল যে,দুটি প্রেমে মত্ত ছেলেমেয়ে যখন সাহিত্য আলোচনা নিয়ে মেতে উঠত,গলা চড়ে যেত কখনও সুনীল গাঙ্গুলী,কখনও হুমায়ূন আহমেদ আবার কখনও বা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে,লাইব্রেরি রুমে বা কফি শপের কর্নার টেবিলে,তখন মাঝেমধ্যেই আশপাশের লোকজনের দৃষ্টি চলে যেত ওদের দিকে। কিন্তু ওদের কোনও হুঁশ থাকত না।
বাবুলের বাড়ি যাওয়ার পথটা ভীষণ ভালো লাগে রুকসার। বাসে ঘন্টাখানেক,তারপর অটোতে। সব মিলিয়ে ঘন্টা দেড়েকের পথ। প্রকৃতির রূপপিপাসু রুকসা,ওদের বাড়ির অনেক আগেই অটো থেকে নেমে হেঁটে যায়। কারণ চারদিক দেখবে বলে,বাবুলের হাত ধরে নাচতে নাচতে বাচ্চা মেয়ের মতো চলতে থাকে। সরষে ক্ষেত,দীঘির মত পুকুর পেরিয়ে বাবুলের বাড়ি। পথচলার আনন্দ যেন শেষ হয় না। দুটো পাগল ছেলেমেয়ে, বাঁধভাঙা মন নিয়ে খুব কাছাকাছি হতে পারে এমনদিনে। একদম বাচ্চা মেয়ের মতো হয়ে যায় রুকসা। সেদিনও অমনি ভাবে যেতে যেতে ওই অদ্ভুত প্রশ্ন করে,গভীর দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে,বাবুলকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়,প্রায় জনহীন রাস্তায়।
বাবুলের বাড়ির জায়গাটা আধা গ্রাম আধা শহরের মত। অনেকটা জায়গা নিয়ে বাড়ি। পুকুর, সবজি ও ফুলের বাগান আছে। ওর পিসিই সব দেখাশোনা করেন। ওর বাবা সকালের দিকে অফিসেই থাকেন। রুকসার সাথে দেখা হয়নি এখনও। বাবুলের মা, ছোটবেলায় মারা যান।
মায়ের কথা বলার সময় যখন বাবুল রুকসার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদে,তখন রুকসাও চোখের জল ধরে রাখতে পারে না। বাবুলের পিসি খুব ভালোবাসে রুকসাকে। বাড়ির আদরের ছেলের প্রিয় বন্ধু বলে কথা! তিন চারবার এল এই নিয়ে। খুব যত্ন করে নানা পদ রান্না করে খেতে দেন পিসি। রুকসার মন উদাস হয়। এমনভাবে আদর করে কেউ তো ওকে খাওয়ায়নি কোনদিন। ওর মায়ের তো সময় নেই। দোষও দেওয়া যায় না মাকে। বাবা খুব ছোটবেলায় মারা যাওয়ায়,ব্যবসাটা অনেক যুদ্ধ করে দাঁড় করিয়েছে মা। একা একা লড়াই করতে একজন সিঙ্গল মাদারের যে কতটা মনের জোর লাগে সেটা খুব কাছ দেখেছে রুকসা। খেতে খেতে হঠাৎ মায়ের জন্য খুব মন কেমন করে ওঠে রুকসার।
“রান্নাঘরে সকাল সকাল এতক্ষণ ধরে কি করছিস রে,রুকু”? সীমা জিজ্ঞাসা করে মেয়েকে।
রবিবারে একটু দেরি করেই বিছানা ছাড়ে সীমা।
সারা সপ্তাহের ক্লান্তি তো আছেই,বয়সও হচ্ছে। রুকসা চা নিয়ে মায়ের পাশে বসে। এই একটা দিনই মা মেয়ে একসাথে কাটায় অনেকটা সময়।
রুকসা বলে,”একটু ডিমপোস্ত বানাচ্ছিলাম মা,বাবুলের পিসির কাছ থেকে শিখলাম |”
“ওহ্,তুই ওদের বাড়ি গিয়েছিলি নাকি,এরমধ্যে?” সীমা জিজ্ঞাসা করে।
“হ্যাঁ,পরশু,তোমাকে বলা হয়নি,কি সুন্দর মরশুমি ফুল ফুটেছে ওদের বাগানে! জানো মা,সবজিও হয়েছে কতরকমের! দিয়ে দিতে চেয়েছিল,আমি আনিনি। রান্না করার ঝামেলা |” রুকসা বলে।
“তোর ফাইনাল পরীক্ষা তো চলে এল। এবার তো জোরকদমে পড়াশোনা শুরু করতে হবে মা। কম্পিটিটিভ পরীক্ষার প্রস্তুতিও শুরু করতে হবে। এদিকওদিক বেশি ঘোরাঘুরি এখন বন্ধ করো |” একটু বিরক্তিমাখা মুখে সীমা বলল।
রুকসা একটু দমে গেল। অনেক উৎসাহ নিয়ে মাকে বলতে শুরু করেছিল। মনটা খারাপ হল।
ক্রমে ফাইনাল পরীক্ষা প্রায় এসে গেল ওদের। ক্লাস শেষ। বাবুল হস্টেল ছেড়ে এখন বাড়িতেই থাকে। দেখা হয় না। ফোনেই কথা হয়। দুজনেই পড়াশোনা,টিউশন,কেরিয়ার ইত্যাদি নিয়ে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এইরকম সময়,একদিন,সীমা,বাবুলকে হঠাৎ ফোন করে। কুশল বিনিময়ের পর বলে,একটু দরকারি কথা আছে রুকসার ব্যাপারে। যেন একদিন সুবিধামতো বাবুল আসে তাদের বাড়িতে। আরও বলে যে, এটা রুকুকে এখনই না জানাতে। বাবুল ঘাবড়ে গিয়ে কি হয়েছে জানতে চাইল। সীমা বলে,”এমন কিছু নয়,এলে বলব। দুপুরে খেয়ে যাবে কিন্তু সেদিন |”
“বাবুল,তোমাকে যতদূর চিনেছি,তুমি খুবই সমঝদার ও বিশ্বাসযোগ্য মানুষ। পুরো কলেজ জীবনটা রুকুকে গাইড করেছ এবং তোমরা দুজনে বেস্ট ফ্রেন্ড। তাই ভরসা করে তোমায় কিছু বলতে চাই |” এটুকু এক নিশ্বাসে বলে সীমা। একটু থেমে,চা আর কিছু স্ন্যাকস নিয়ে এসে আবার বলতে শুরু করে,”রুকসার বাবার খুব ইচ্ছে ছিল যে আমাদের পারিবারিক এক বন্ধুর ছেলের সাথে রুকসার বিয়ে হয়। আমারও সেটাই ইচ্ছে। ছেলেটি বাইরে পড়াশোনা করে সেটল করেছে। ওর বাবা-মায়ের খুব ইচ্ছে ওদের বিয়েটি হয়ে যাক এবার। কিন্তু রুকু তো নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ের কথা ভাববে না বোধহয়,আমি যদিও কিছু বলিনি ওকে,কিন্ত জানি রাজি হবে না। তুমি যদি একটু বোঝাও, তোমার কথা শুনবে হয়ত। পড়া তো বিয়ের পরেও চালিয়ে যেতে পারে। তাই না? মেয়েকে থিতু করে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারি। দেখছ তো বাবা,একা মানুষ। বড় দায়িত্ব আমায় দিয়ে,ওর বাবা কবে চলে গেছেন |”
একথা বলে সীমা হয়ত আঁচল দিয়ে চোখ মুছল। সেটা দেখার মতো অবস্থা বাবুলের ছিল না। সে মাথাটা হালকা নুয়ে দিল যাতে তার ছাইয়ের মতো মুখটা উনি না দেখে ফেলেন। চা টাও আধখাওয়া। সেই অবস্থায় কোনমতে বলতে পারল বাবুল,”কথা দিতে পারছি না,তবে আমি চেষ্টা করব কাকিমা”। বলে উঠে দাঁড়াল বাবুল। সীমা বলে,”একি, উঠলে যে ! দুপুরে রুকুর সাথে খেয়ে যাবে তো? ও আর কিছুক্ষণের মধ্যেই টিউশন থেকে ফিরে আসবে |”
বাবুল বলল,”আজ থাক। অন্যদিন খাবো |”
বাবুল,সীমা কাকিমাকে দেওয়া কথা রাখতে পারে নি। নিজের মুখে রুকসাকে সে কথা বলার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো,ভেবেছে। ফোনে যোগাযোগ বন্ধ করেছে। বুকটা ফেটে গেছে তবুও রুকসা ফোন করলে পিসিকে দিয়ে বলিয়েছে যে,সে ব্যস্ত আছে,পরীক্ষার পর কথা বলবে। এরইমধ্যে,হায়দ্রাবাদে এক কাকার সাথে কথা বলে,কিছু ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেছে,এমনভাবে যে খুব তাড়াতাড়ি যেন পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে চলে যেতে পারে। বাড়িতে বলেছে যে রুকসাকে কোনওভাবে কোনও কথা যেন না বলা হয়।
এদিকে পরীক্ষার শেষে,ক্রমাগত ফোনে না পেয়ে বাবুলের বাড়িতে ছুটে এসেছে রুকসা। পিসি বলেন,বাবুল হঠাৎ কোথায় চলে গেছে,তারা জানেনা । এসব নিয়ে বাড়ির লোকজন তাই খুবই বিধ্বস্ত এখন মানসিকভাবে। রুকসা যেন আর তাদের বাড়িতে এখন না আসে। খোঁজ পেলে জানাবে। মুখ কালো করে কোনওমতে সেদিন বাড়ি ফিরেছে রুকসা ।
না,তারপর থেকে পাগলের মত খুঁজেও বাবুলের কোনও খোঁজ পায়নি রুকসা। তারপর থেকেই ক্রমশ মেয়ে একেবারে চুপ করে গেছে। মোবাইলে সারাক্ষণ বাবুলের ছবি দেখে আর বিড়বিড় করে কি যেন বলে! সীমা ডাকলে উত্তর দেয় না,তাকায় না কোনদিকে। বিপন্ন হয়ে চিকিৎসকের সাহায্য নেয় সীমা। রুকসার মানসিক অবস্থা ক্রমশ পাগলামির রূপ নেয়।
মানসিক হাসপাতাল ‘বৈকুন্ঠ’ তে এখন রুকসার চিকিৎসা চলছে। রুকসার অ্যাটেন্ডেন্ট নার্স মাঝে মাঝেই ওকে সামলাতে পারে না। কোনও মাঝরাতে হঠাৎ চিৎকার শোনা যায়-
“কোথায় চলে গেলি,বাবুল,ফিরে আয়,ফিরে আয় একবার এই আদি,অনন্ত অকৃত্রিম ভালোবাসার বুকে! একবার এসে দ্যাখ আমি তোকে কোনদিনও ছাড়ব না,কখনও না,আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না” –
সারারাত উন্মাদিনীর সেই আর্তনাদ হাসপাতালের দেওয়ালে,ছাদে,পাখায় ছড়িয়ে ছড়িয়ে ঘুরতে থাকে।
*************************

নবনীতা চক্রবর্তী কলকাতার সল্টলেকের বাসিন্দা। ২০১৭ সাল থেকে কিছু লেখালেখি শুরু করেন। ছোট-গল্প থেকে কবিতা সংগ্রহে আছে কিছু। কিছু ওয়েব ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। একটি নিজের প্রকাশিত কবিতার বই আছে।

গল্পটি মন ছুঁয়ে গেল। এরকম আরও অনেক গল্প পড়তে চাই।