
মনের হদিশ
ব্রতী ঘোষ
আজকাল এক একটা রাত ভারী পাথর হয়ে নেমে আসে বুকের মাঝে । সে চাপ সহ্য করা বড় কঠিন হয়ে পড়ে – দীপালি ভাবে । আজ সেরকমই একটা রাত | কিছুতেই যেন দুচোখের পাতা এক করতে পারছে না দীপালি | ঘড়ির কাঁটার টিক্ টিক্ শব্দ রাত্রির অন্ধকারকে খান্ খান্ করে দিয়ে কেবলই জানান দিচ্ছে – তুমি একা ! তুমি নিঃসঙ্গ !! নিদ্রাহীন রাতের যে কষ্ট সেটা যে না অনুভব করেছে সে ঠিক বুঝতে পারবে না | দীপালি ভাবে সারাদিন তো ও যথেষ্ট পরিশ্রম করে | সকালে উঠে ছাদে হাঁটা,গাছে জল দেওয়া, রান্নাবান্না করা , আরো কত কি ! এত পরিশ্রমের পরও কেন যে ঘুম আসে না ! আজকাল একা রান্না করে খেতেও আর ভালো লাগে না | একা একা যে খেতে ভালো লাগে না সেটা ঋক্ বুঝলে তবে তো !
লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে ঋক্ দুটো বছর বাড়িতে থেকেই কাজ করেছে | দীপালি রিটায়ার করলো আর লকডাউন শুরু হল। মা ছেলেতে বেশ ছিল | দুটো বছর কোথা দিয়ে চলে গেল ছন্দে, আনন্দে, টেরই পায়নি দীপালি | তবে ও ভালোভাবেই জানত যে এই আনন্দে দিন কাটবে না | ভেবেছিল যখন যেমন সময় আসবে তাকে মানিয়ে নেবে | কিন্তু বুঝতে পারেনি যে এত কঠিন হবে তাকে মানিয়ে নেওয়া | বছর দুয়েক পরে ঋক্ চলে গেল হায়দ্রাবাদে | তারপর থেকেই এই নিদ্রাহীন রাতের সূচনা | অথচ এমন নয় যে ঋক্ মায়ের খোঁজ নেয় না, যত্ন নেয় না | কিন্তু ওর এই একাকীত্বের যন্ত্রণা ভাগ করে নেবার কেউ নেই | দীপালি সারাদিন গান শুনে,গান করে, বাগান করে, টিভি দেখে, ফেসবুক করে ~ নিজেকে ভালো রাখার অবিরাম চেষ্টা করে | ওর ভাইবোনেরা, বাড়ির কাজের মেয়ে, উমা – এরা সবাই জানে যে দীপালির মতো সুখী মানুষ আর নেই | কিন্তু ওর এই নিঃসঙ্গ মনের খবর যে কেউ জানতে পারে না !
ভোর হয়ে এসেছে, আজ আর বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না ওর | তবুও সারা রাতের ক্লান্ত অবসন্ন শরীরটাকে টেনে তুলতেই হল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে | আজ আবার উমা আসবে না বলে গেছে | এই রে ! দুধ তো একদম নেই | উমা রোজ দুটো করে দুধ এনে দেয় । একটু বেরিয়ে দুধ আর ফুলটা নিয়ে আসি | এই ভেবে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে রাস্তায় বেরোয় দীপালি |
‘ ম্যাডাম শুনছেন ? ‘
‘আমাকে বলছেন? ‘
‘হ্যাঁ হ্যাঁ | ‘
‘কি ব্যাপার ? ‘
‘ আরে আপনি দুধের দোকান থেকে ফেরত পয়সাটা না নিয়েই চলে এলেন ? গোপাল তো কতবার ডাকল আপনি শুনতেই পেলেন না ‘
গলাটা বড্ড চেনা মনে হয় |
ভদ্রলোকের মুখের দিকে দীপালি ভালো করে চেয়ে দেখে | এক মাথা সাদা চুল আর চোখের ভারি চশমা যেন অনেক যুগ আগের কোন এক ঝক্ঝকে প্রাণচঞ্চল ছেলেকে মনে করিয়ে দিচ্ছে |
‘আচ্ছা ! আমি যদি খুব ভুল না করে থাকি আপনি – তুই – অপূর্ব না ? ‘
‘হ্যাঁ মানে ! আপনি ? আরে দীপালি যে ! ‘
দুই বন্ধুর বহু কাল আগের হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত্ত যেন এক লহমায় ফিরে এসে পরস্পরকে হৃদয়ের খুব কাছাকাছি এনে দেয় |
‘ তুই ? কেমন আছিস দীপু? কোথায় চলে গেলি তুই ? তোর ছেলে মেয়ে ? তারা কোথায় ? ‘
‘ ওহ ! সব প্রশ্ন একেবারে করে ফেলবি ? চল্ চল্ ! আমার বাড়ি চল | চা খেতে খেতে সব জানতে পারবি | ‘
অপূর্ব আর না বলতে পারেনা |
‘আচ্ছা ! দীপু ! সেই যে বিয়ে হয়ে ভূপাল চলে গেলি তারপর একটা যোগাযোগ রাখলি না তুই ? ‘
‘ নারে ! আর হয়ে ওঠে নি ! পিনাকী যে বড় তাড়াতাড়ি চলে গেল আমাদের ছেড়ে |’
চায়ে একটা চুমুক দিয়ে অপূর্ব গান ধরেন – ” পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায় ও সেই — ”
‘ ওহ ! এখনও সেই বেসুরো ই রয়ে গেলি অপূর্ব !’ হেসে উঠে দীপালি ওর সাথে গলা মেলালো ।
‘আবার কবে আসবি বল ? আমি রান্না করবো | এখানে খাবি ‘- দীপালি বলে |
‘ বেশ তাহলে আগামীকাল চলে আসি | ‘
‘বাহ্ ! সে তো খুব ভালো কথা । ‘
এখন মাঝে মাঝেই সান্ধ্য আড্ডায় দীপালি আর অপূর্ব সেই পুরোন দিনের মতো হাসি, গল্পে, গানে ,পলিটিক্সে র চর্চায় মেতে ওঠে | ফিরে পায় হারিয়ে যাওয়া প্রাণের অস্তিত্ব | অপূর্ব যে সারা জীবন বিয়েই করল না, এ কথা জেনে দীপালির খারাপ লাগলেও মনের কোথায় একটা যেন শান্তির প্রলেপ লাগে | অপূর্ব সর্বক্ষণ যে ‘ দীপু দীপু‘ করতো সেটা তো দীপালি জানতো | কিন্তু তবুও মুখ ফুটে না অপূর্ব না দীপালি কারুরই একে অন্যকে কিছু বলা হয়ে ওঠেনি | যাক্ ! এখন আর এসব ভেবে কি লাভ ? দীপালি ভাবে |
ঋক্ আজ অফিস থেকে যখন বাড়ি ফিরল তখন প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা। ওর ফ্ল্যাটটা থেকে অফিস যেতে গাড়িতে প্রায় ঘন্টা দুয়েক লাগে | অফিস আসা যাওয়া মিলিয়ে প্রায় ঘন্টা চারেক গাড়ি চালিয়ে আর সারাদিন অফিসের পর ওর শরীর পুরোপুরি ছেড়ে দেয় । ক্লান্ত অবসন্ন শরীর আর মনটাকে বিছানায় যখন ছুঁড়ে ফেলে ও, তখন আর কিছুই ভালো লাগে না । তবে ঘুমাবার আগে মাকে রুটিনমাফিক ফোন করতেই হবে একথা মনে পড়ে | পরদিন সকাল থেকেই আবার দৌড় | উইক এন্ডটার জন্য সপ্তাহের পাঁচটা দিন অপেক্ষা করে থাকে এখানকার সবাই | শনি রবিবার এই দুটো দিন এলেনা ওর ফ্ল্যাটে আসে। মাস ছয়েক হলো এলেনার সঙ্গে ঋক্ রিলেশনশিপে আছে। আলাপ ওই টিন্ডারে | এলেনা এই দুদিন ঋকের ফ্ল্যাটে এসে থাকে | নিজের হাতে রান্না করে | লাঞ্চটা করেই ওরা বেরিয়ে পড়ে নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে | ঋক্ মাকে এখনো বলে উঠতে পারেনি এলেনার কথা । কারণ মার পছন্দ তো জানে ও | এলেনাকে মার কিছুতেই পছন্দ হবে না | তবে মার সারাদিনের এই একাকীত্ব ভালই বুঝতে পারে ঋক্ | কিন্তু ওরই বা উপায় কি ? আই টি ফার্মে চাকরির ঝক্কিটা তো মা জানে তবুও কিছুতেই বুঝতে চাইবে না | রাতে ফোন করলেই হাজারো অনুযোগ | ‘ কেন সময় খাওয়া–দাওয়া করিস না ? সারাদিনে কি আর মার কথা একবারও মনে পড়ে না ? এত কষ্ট করে তোকে মানুষ করেছি তুই সব ভুলে গেলি ? ‘
মা – মা – মা – তুমি কবে বুঝবে ? ঋকের বুকের হাহাকার উঠে আসে | নিজের সঙ্গে কথা চলে অবিরাম | আমারও একটা জীবন আছে , নিজের কাজের ঝুঁকি আছে , চাকরি নিরাপত্তাহীনতা আছে , এলেনা আছে , তারও মন রেখে চলতে হয়। এগুলো তো তোমার বোঝা উচিত মা ! মানছি তুমি এখন একা – একেবারে একা । তোমাকে তো কতবার বলেছি, আমার কাছে এসে থাকো , তাও শুনবেনা | আমার কি করার আছে ? বলো ?
মাকে কল্ করে ঋক্ | ফোনটা বেজে বেজে বন্ধ হয়ে যায় | মাত্র রাত সাড়ে এগারোটা – এর মধ্যেই মা ঘুমিয়ে পড়লো ?
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুকে মায়ের একটা পোস্ট দেখতে পায় যা মা রাত্রে বেলা করেছে । ঋক্ বুঝতে পারে মা সারারাত ঘুমোয়নি। সকালবেলাতেই ওর মনটা খারাপ হয়ে যায় । মা তাহলে গতকাল অভিমান করে ওর ফোনটা ধরেনি । কল লিস্টটা খুলে দেখে মা গতকাল দুপুরবেলা ফোন করেছিল | ওহো!! ওতো ফোনটা সাইলেন্ট করে দিয়েছিল সেই সময় । মিস্টার হোসেনের ঘরে তখন ছিল | মার তো বোঝা উচিত যে ও নিশ্চয়ই ব্যস্ত ছিল | এক এক সময় বড় বিরক্তি লাগে | কিন্তু যেই ওর মনে পড়ে যে মা সারারাত জেগে ছিল তখনই বুকটা ব্যথায় ভরে যায় | মাকে কল করবে বলে ফোনটা হাতে নেয় আর ঠিক সেই সময়ই এলেনার কলটা আসে । মাকে আর কল করা হয় না |
আজ অপুর সঙ্গে সিনেমা যাওয়ার কথা | তাই সকাল থেকেই দীপালির মেজাজ একদম ফুরফুরে | অনেকদিন বাদে আবার চুলে মেহেন্দি করল ও | গত বছরের পুজোয় ঋকের দেওয়া হাল্কা নীল জামদানি শাড়িটা আজ পড়েছে ও | অ্যাক্রোপোলিস মলে পৌঁছে গিয়েছে সময়ের আগেই | অপূর্ব যে কেন এত দেরি করে সব সময় ? ডানদিকে মাথা ঘোরাতেই অপূর্বকে দেখতে পায় |
‘ কিরে দীপু ? তুই আজ এত সেজেছিস ? ‘ দীপালি একটু লজ্জা পেয়ে মুখ নীচু করে বলে – ‘ কি যে বলিস ? ‘
মুখ তুলেই দীপালির চোখ পড়ে এক সৌম্য কান্তি প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দিকে । মুখটা ভীষণ চেনা লাগছে | অপূর্বর দিকে তাকিয়ে দেখে ও মিটিমিটি হাসছে।
‘ চিনতে পারলি না তো? ‘
‘ না মানে ? ‘
‘ আমাদের কিরীটি !’ হাসতে হাসতে অপূর্ব বলে |
‘ মানে ? কিটি ?’ বিস্ময়ে দুহাত মুখে জড়ো করে দীপালি লাফিয়ে ওঠে |
‘ হ্যাঁ কিটি !: দীপালির হাত দুটো জড়িয়ে ধরেছে কিরীটি |
‘ তিরিশটা বছর কোথা দিয়ে চলে গেল রে দীপু ? ‘
চোখের কোণটা ততক্ষণে চকচক করছে দীপালির |
‘ দাঁড়া দেখ ! কাকে সাথে করে এনেছি ? ‘ ‘ মিতুল !!!’ দীপালি জড়িয়ে ধরে মিতুলকে। ‘ তোদের বিয়েতে আসতে পারিনি রে – ‘ দীপালি র আক্ষেপ ঝরে পড়ে গলায় | ও হঠাৎ তাকিয়ে দেখে ঠিক সেই কলেজজীবনের মতো পপকর্ন কিনে নিয়ে হাসতে হাসতে আসছে অপূর্ব |
‘ তুই আমাকে আগে বলিস নি কেন ?’ আগেকার মতোই পিঠে চাপড় মেরে দীপালি অপূর্বকে জিজ্ঞাসা করে |
‘ এদের কথা আগে বললে তোর এতো আনন্দ হতো ? ‘
চারজনই হাসিতে ফেটে পড়ে |
কোথা দিয়ে সারা সন্ধ্যাটা কেটে যায় ওরা টের পায় না |
ঋক্ আজও কল করে মাকে পায় না | বুঝতে পারে মায়ের অভিমানের গভীরতা | ছবিটা পাল্টে যায় | ঋক্ মার ফোন কলের প্রতীক্ষায় থাকে। কিন্তু ফোন আসে না | অভিমানের পাল্লাটা এবার ঋকের দিকে ঝুঁকে পড়ে | মা একবারও বুঝবে না ? সারাদিন আমি কতটা ব্যস্ততায় থাকি ! একবার ফোন ধরিনি বলে এত রাগ ?
আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল মার সাথে ঋকের কথা হয়নি। অথচ মা ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছে , হোয়াটসঅ্যাপে অনলাইন থাকছে , তার মানে সুস্থ আছে | আর অসুস্থ হলে উমাদি নিশ্চয়ই ফোন করতো ।
ঋকের বুকে অভিমান ছড়িয়ে পড়ে | অনুমান করে মা নিশ্চয়ই নিজের আনন্দ খুঁজে পেয়েছে ।
আরো সাত দিন পরের কথা –
দুপুর দুটোর কলকাতা গামী ফ্লাইটে বসে ঋক্ বেশ নিশ্চিন্ত । মিস্টার হোসেন যে ওকে এক কথায় ছুটি টা দেবেন ও ভাবতেও পারেনি । অবশ্য একটু মিথ্যা কথা ও বলেছে যে মায়ের শরীর খারাপ | তাই ছুটিটা সহজে পেয়েছে | মার জন্য এলেনা পছন্দ করে হায়দ্রাবাদী মুক্তোর একটা খুব সুন্দর নেকলেস কিনে দিয়েছে । ঋক্ আজ মার জন্মদিনে একদম তাক লাগিয়ে দেবে মাকে । কেকটা আগেই অর্ডার দিয়ে রেখেছে | কি করে মা এর পরেও ওর ওপর অভিমান করে থাকে ও দেখবে ! ফুসফুস ভর্ত্তি আনন্দ আর মাকে চমক লাগাবার উৎকণ্ঠায় দারুণ উত্তেজিত ঋক্ |
আজ সকাল থেকেই দীপালির বাড়িতে হই হই | অপূর্ব নিজের হাতে বাজার করে এনেছে আজ | রান্নাও করেছে একা হাতে। কিরীটি মিতুল ও একটু পরেই এসে পড়বে। আজ চার বন্ধু মিলে সারাটা দিন হই হই করে কাটাবে | কিন্তু এত আনন্দের মাঝেও সময় সময় যেন ছন্দ কেটে যাচ্ছে দীপালির | ঋক্ আজ একবারও ফোন করল না ? মার অভিমানটা ও একবারও বুঝলো না ? আপনা থেকেই দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে – সারাটা জীবন কষ্ট করে মানুষ করার পর এটাই বোধহয় পাওনা ছিল ।
কিরীটি আর মিতুল বার্থডে কেকটা নিয়ে ঢুকে হইচই জুড়ে দিল। সারাটা দুপুর তুমুল আড্ডা আর খাওয়া দাওয়াতে অপূর্ব একদম জমিয়ে রাখল সবাইকে । ওরা তিনজন মিলে একটা সুন্দর তসরের শাড়ি উপহার দিয়েছে দীপালিকে। বিকেল গড়াতেই অপূর্ব কেকটা রেডি করে ফেলে কাটার জন্য | হঠাৎই গেটের সামনে একটা ক্যাব এসে দাঁড়ায় | সব্বাইকে অবাক করে দিয়ে ঋক্ নেমে আসে ক্যাব থেকে। দীপালি এতটা প্রত্যাশা করেনি । ঋক্ যে একেবারে কলকাতা চলে আসবে ওর মান ভাঙ্গাতে সেটা ভেবে বুকটা ধীরে ধীরে প্রশান্তিতে ভরে উঠতে থাকে | অপূর্ব , কিরীটি , মিতুল তিনজনই ঋককে কাছে টেনে নেয় | অপরদিকে ঋক্ বাড়ি ঢুকে এত লোকজন দেখে বেশ বিরক্ত এবং হতাশ হয়ে যায় | যদিও মুখে তা প্রকাশ করে না | কেক কাটা হয়ে গেলে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে চলে আসে। মা আনন্দে আছে তার কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে একথা জানার পর থেকে ওর কেন এত কষ্ট হচ্ছে ? গলার কাছটা কেমন যেন দলা পাকিয়ে আছে ! কিছুই যেন ভালো লাগছে না | তবে কি ও চায় না মা ভালো থাকুক ? নাকি ও চায় মা শুধু ওকে নিয়েই ব্যস্ত থাকুক ?
মা ছেলের টানাপোড়েনের কথা কিরীটি ,মিতুল টের না পেলেও অপূর্ব সব বুঝতে পারে | কেক কাটার সময়ে ঋকের মুখের কালো ছায়া ওর চোখ এড়িয়ে যায় না | আর তাই সবার অলক্ষ্যে ঋকের ঘরে চলে আসে |
‘আসতে পারি ইয়ংম্যান ? ‘
‘আরে অপূর্ব আঙ্কেল তুমি ? এসো এসো !
‘একটা কথা তোমাকে বলতে এলাম ইয়ং ম্যান ! ‘
‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন | ‘
‘তোমার মন খারাপের কারণটা কিন্তু আমি বুঝতে পেরে গেছি। ‘
‘মন খারাপ ? কই না তো ? :
‘ দেখো ইয়াং ম্যান ! তোমাদের জেনারেশনকে বোঝা শক্ত আমি জানি কিন্তু মা ছেলের মান অভিমান বোঝা মোটেও শক্ত নয় | ‘
এবার অপূর্বর চোখে চোখ রেখে ঋক্ বলে – ‘ মা তো ভালোই আছে | এজন্যই আমাকে আর ফোন করে না | ‘
‘বোকা ছেলে, মার ভালো থাকাটা দেখলে? মার অভিমানটা বুঝলে না ? তুমি যখন বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করো মার কথা একবারও মনে পড়ে ? কিন্তু তোমার মা আজ সারাদিন তোমার কথাই ভেবেছে। তবে তুমিও যে মাকে কতটা ভালোবাসো সেটা বুঝিয়ে দিয়েছ । ঋক্! মাকে ভুল বুঝোনা | মনে রেখো মা ভালো থাকলেই তুমি ভালো থাকবে । এতদিন পরে মা নিজের মত করে ভালো থাকার একটা পথ খুঁজে পেয়েছেন | সেটাকে হারিয়ে যেতে দিও না | ‘
ঋক্ এগিয়ে এসে অপূর্বকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে একদম ছোট্ট ছেলের মত । ততক্ষণে দীপালিও পায়ে পায়ে চলে এসেছে এই ঘরে। ছেলেটা যে এখনো অভিমান করে আছে সেটা ও বেশ বুঝতে পারছে । দীপালিকে ঘরে ঢুকতে দেখে অপূর্ব ঋকের চোখটা মুছিয়ে দেয় । মা ছেলের অভিমানের মানের পালা সাঙ্গ করার জন্য অপূর্ব আস্তে আস্তে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে । এখানে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয় |
————————————————-

ব্রতী ঘোষঃ
জন্ম,পড়াশোনা সবই কলকাতায় ৷ তিরিশ বছর ধরে ভারতীয় জীবন বীমা নিগমে কর্মরতা। সঙ্গীত অনুরাগী মানুষটি এখন ভালোবাসেন লিখতে ৷ এই পত্রিকাতেই তার লেখার পথ চলার শুরু।
