
।। সত্যেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যাপীঠ ।।
সৌমিক কার্ফা
সুবিমল স্যার ক্লাস নাইন-এর ঘরে ঢুকতেই ধেয়ে এলো একটাই অনুরোধ—
“স্যার, আজকে একটা গল্প বলুন, আজ আমরা পড়ব না।”
সুবিমল বসু, হুগলি জেলার হরিপুর গ্রামের “সত্যেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যাপীঠ”-এর গণিত শিক্ষক। স্বল্পভাষী, মধ্যবয়স্ক, রাশভারী এই শিক্ষককে ছাত্ররা যেমন সমীহ করে, তেমনই ভালোবাসে। ভালোবাসার কারণ দুটো।
প্রথমত, তিনি যখন ক্লাসে এসে অঙ্ক করান, তখন ছাত্রছাত্রীদের মনে হয়—অঙ্কের মতো সহজ বিষয় আর কিছু নেই। আর দ্বিতীয় কারণ, তাঁর অফুরন্ত গল্পের ভান্ডার।
কোনও কোনও অলস দিনে, যখন পড়ার চাপ খুব বেশি থাকে না, তখন সুযোগ মেলে সেইসব মজার, রোমাঞ্চকর গল্প শোনার। আজ তেমনই একদিন। কাল থেকে গরমের ছুটি। ইউনিট পরীক্ষাও শেষ। রেজাল্ট বেরোবে সেই ছুটির পর।
এমন দিনে কারই বা পড়তে ইচ্ছে করে?
স্যারেরও আজ মনমেজাজ বেশ ভালো। চক আর ডাস্টার টেবিলে রেখে আরাম করে কাঠের চেয়ারটিতে বসলেন সুবিমল বাবু।
তার সামনে ৩১-দ্বিগুণে ৬২টি উৎসুক কান অপেক্ষা করছে গল্প শোনার জন্য।
সামনের বেঞ্চে বসে থাকা চন্দনের দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন—
“বলতো চন্দন, ২০০১ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল কারা পেয়েছিলেন?”
চন্দনের পাশেই বসে থাকা মিনি হাত তুলল—
“আমি জানি স্যার।”
২০০১ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডোর Eric A. Cornell, Wolfgang Ketterle এবং Carl E. Wieman।
মিনি নিয়মিত কুইজ প্র্যাকটিস করে।
স্যার খুশি হয়ে বললেন—
“বাহ! একদম ঠিক।”
“কিন্তু কেন নোবেল পেয়েছিলেন, সেটা কি জানিস?”
“জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে অনেকটা সময়। এই ধর প্রায় আটানব্বই বছর।”
সালটা ১৯২৪। জার্মানির বার্লিন শহর।
বছর পঁয়তাল্লিশের এক মেধাবী, গভীর চিন্তাশীল, শান্ত ভদ্রলোক বসে আছেন তাঁর কাজের ঘরে। সাদা কাগজের উপর পেন্সিল চালিয়ে লিখে চলেছেন একের পর এক জটিল গাণিতিক সমীকরণ।
তিনি কিন্তু সাধারণ কেউ নন। সেই সময়ের প্রায় সমগ্র বিজ্ঞানীমহল স্বীকার করেছে—মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা তিনি।
এই ব্যক্তি আর কেউ নন—স্বয়ং স্যার অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।
তিনি মগ্ন হয়ে একের পর এক গাণিতিক হিসাব লিখছেন, আবার কেটে দিচ্ছেন। কিছুতেই যেন মনমতো হচ্ছে না।
হঠাৎই তাঁর কাজের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটল একটি ডাকে—
“Dad! You have a letter…”
তাঁর মেয়ে ইলসা এসেছে একটি চিঠি নিয়ে। লম্বা সাদা খাম। ঠিকানা লেখা সুদূর ভারতবর্ষের।
সেই সময় আইনস্টাইন কাজ করছিলেন কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে।
“স্যার, কোয়ান্টাম ফিজিক্স কী?”— ক্লাস এর পেছন দিক থেকে ভেসে এলো প্রশ্ন টা।
সুবিমল স্যার গল্পে এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে প্রশ্নে একটু চমকে উঠলেন। তারপর আবার শান্ত স্বরে বলতে শুরু করলেন—
“এই যে তোরা পদার্থবিদ্যার বইয়ে বিভিন্ন নিয়মকানুন বা ফর্মুলা পড়িস—যেমন একটা গাড়ি কীভাবে চলে, কোনো বস্তু ওপরে ছুঁড়লে আবার নিচে নেমে আসে কেন—এইসবের ব্যাখ্যা দেয় ক্লাসিক্যাল ফিজিক্স।”
“কিন্তু অণু পরমাণু বা তারও ছোট কণাগুলোর গতিবিধি কীরকম হয়—সেগুলোর ব্যাখ্যা দেয় কোয়ান্টাম ফিজিক্স।”
“বুঝেছিস?”
“বুঝেছি স্যার।”
স্যার আবার গল্পে ফিরে এলেন।
“তো, সেই সময় আইনস্টাইন এই কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়েই কাজ করছিলেন। এই বিষয়ে প্রথম ধারণা দেন জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্ক, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে। এরপর আইনস্টাইন এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান।”
“তিনি বিশ্বকে জানান আলোর দ্বৈত প্রকৃতি—wave particle duality।”
এর আগে আমরা আলোকে কেবল তরঙ্গ হিসেবেই ভাবতাম। আইনস্টাইন দেখালেন, আলো কখনও কখনও কণার মতোও আচরণ করে। সেই কণার নাম দিলেন —‘ফোটন’|
কিন্তু এখানেই একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিল। অনেকগুলো ফোটন একসাথে থাকলে তারা কীভাবে আচরণ করে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ব্যস্ত ছিলেন আইনস্টাইন।
অন্যমনস্কভাবে তিনি চিঠির খামটি খুলে পড়তে শুরু করলেন।
কিছুক্ষণ পরেই তাঁর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভ্রূ কুঁচকে গেল বিস্ময়ে।
এ যেন অবিশ্বাস্য!
এতদিন যে সমস্যার সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না, সেই সমাধানই যেন লেখা আছে এই চিঠিতে।
একটি সমীকরণ—যা দিয়ে বোঝানো যায় অনেকগুলো ফোটন একসাথে কীভাবে একটি “সুপার অ্যাটম”-এর মতো আচরণ করতে পারে।
আইনস্টাইন আর স্থির থাকতে পারলেন না। উত্তেজনায় ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করলেন। তিনি বুঝলেন—এ এক যুগান্তকারী ধারণা।এই চিঠি র বক্তব্য তিনি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করবেন।
তিনি পুনরোদ্দম এ শুরু করলেন তাঁর কাজ। যুগান্তকারী এক তত্ত্বের জন্ম দিলেন। যার প্রয়োগ এ বর্তমান যুগে কম্পিউটার, মোবাইল থেকে শুরু করে MRI মেশিন এইসব উন্নত প্রযুক্তির বাস্তবায়ন এর মঞ্চ প্রস্তুত হলো।
আর এই তত্ত্বের ব্যবহারিক ব্যাখ্যা দিয়ে ২০০১ সালে অর্থাৎ প্রায় ৮০ বছর পর নোবেল বিজয়ী হলেন কর্নেল , উইমান এবং কেটারলে।
এতটুকু বলে থামলেন সুবিমল স্যার।
তিনি মিটি মিটি হেসে ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“কি, অনেক প্রশ্ন জাগছে তো মনে?”
“হ্যাঁ স্যার!”
“চিঠিটা কে পাঠিয়েছিল?”
স্যার একটু থেমে বললেন—
“এই তো গল্পের আসল জায়গা।”
“আমাদের আজকের গল্পের নায়ক কিন্তু আইনস্টাইন নন।”
“গল্পের নায়ক— বছর তিরিশের এক বাঙালি যুবক।”
“জন্ম কলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলে, বসু পরিবারে।”
“বাবা সুরেন্দ্রনাথ বসু, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া রেলওয়েজের কর্মচারী।”
ছোটবেলাতেই ছেলের অসাধারণ মেধার পরিচয় পেয়েছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বাবু। অফিসের জটিল হিসাবপত্র ছোট্ট ছেলেটি সহজেই করে ফেলত।
একবার স্কুলের একটি গণিত পরীক্ষায় একটি প্রশ্ন ছেলেটি তিন-চারটি ভিন্ন উপায়ে সমাধান করে দেখিয়েছিল।
পরীক্ষক এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে ছাত্রটিকে ১০০-তে ১১০ নম্বর দিয়েছিলেন।
পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত অনার্স পড়ার সময় যে নম্বর তিনি পান, তা আজও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অমর কীর্তি।
প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর শিক্ষক ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব।
এরপর করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাথমেটিক্সে মাস্টার্স।
তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে কর্মরত। সেইসময় থেকেই নিজের আগ্রহ শুরু করেছিলেন কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে গবেষণা।
একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দিতে গিয়ে তাঁর মনে হলো—বর্তমান তত্ত্বগুলো কোয়ান্টাম স্তরে পুরোপুরি কাজ করছে না। তাত্ত্বিক ফলাফল আর পরীক্ষাগারের ফলাফল মিলছে না।
ঠিক সেই সময় সহপাঠী মেঘনাদ সাহার সাথে তাঁর আলোচনা হয়।
হ্যাঁ, সেই বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা।
সাহা তাঁকে কিছু জার্মান গবেষণাপত্র পড়তে দেন। সেগুলো পড়ে তাঁর সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়—গণনায় কোথাও একটা ভুল রয়েছে।
এই ভাবনা থেকেই তিনি তৈরি করলেন নিজের একটি সমীকরণ।
সব হিসাব সুন্দরভাবে মিলে গেল।
তিনি তাঁর গবেষণাপত্র পাঠিয়ে দিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ জার্নাল Philosophical Magazine-এ।
কিন্তু এক অজানা ভারতীয় অধ্যাপকের কাজ কে আর গুরুত্ব দেয়!
জার্নালটি সেই পেপারটি প্রত্যাখ্যান করল।
কিন্তু তিনি দমে যাওয়ার মানুষ নন।
তিনি লিখলেন একটি চিঠি— স্বয়ং অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে।
তিনি লিখলেন,
Respected Sir,
I have ventured to send you the accompanying article for your perusal and opinion. I am anxious to know what you think of it. You will see that I have tried to deduce the coefficient 8π ν2/c3 in Planck’s Law independent of classical electrodynamics, only assuming that the ultimate elementary region in the phase-space has the content h3. I do not know sufficient German to translate the paper. If you think the paper worth publication I shall be grateful if you arrange for its publication in Zeitschrift für Physik. Though a complete stranger to you, I do not feel any hesitation in making such a request. Because we are all your pupils though profiting only by your teachings through your writings. I do not know whether you still remember that somebody from Calcutta asked your permission to translate your paper in theory of Relativity in English. You acceded to the request. The book has since been published. I was the one who translated your paper on Generalised Relativity.
- Satyendra Nath Bose, Calcutta, India.
হ্যাঁ আমাদের আজকের গল্পের নায়ক, সত্যেন্দ্রনাথ বোস। তিনি আইনস্টাইন কে লিখছেন “একথা আমার জানা আছে যে, আমি আপনার কাছে অচেনা এক মানুষ। তবুও এটা বলতে দ্বিধা বোধ করছি না যে, আপনি আমাদের মতো বিজ্ঞান অনুরাগীদের কাছে একজন শিক্ষক । আমরা আপনার কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হই। আমি জার্মান ভাষা ভালো জানিনা আপনি আমার এই গবেষণাপত্র পরে যদি মনে করেন এই কাজ ছাপার যোগ্য তবে দয়া করে একে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে ছাপানোর ব্যবস্থা করবেন।
হ্যাঁ তাই করলেন স্যার অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, তিনি নিজে বোস এর সেই গবেষণাপত্র অনুবাদ করলেন জার্মান ভাষায়। সেই অনুবাদ প্রকাশিত হলো Zeitschrift für Physik পত্রিকায় । তৈরি হলো নতুন এক তত্ত্ব- Bose- Einstein Statistics.
এরপর আইনস্টাইন এ বিষয়ে আরও অগ্রসর হন এবং পদার্থের পঞ্চম দশা – Bose Einstein Condensate আবিষ্কার করেন।
এতটুকু বলে একটু থামলেন সুবিমল স্যার তারপর আবার বলতে শুরু করলেন,
বাঙালির এই মহান প্রতিমূর্তি উঠে এসেছিলেন তোদের মতোই এই রাজ্যেরই এক ছোট স্কুলের ছোট্ট একটা ক্লাস রুম থেকে। তিনি তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে নিজের নাম জুড়ে দিয়ে গেছেন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এর সাথে । এই বাঙালি জাতি বিশ্বকে যা দিয়েছে তার তুলনা হয় না। আমি জানি তোদের মধ্যেও লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ এর রবি, সুভাষ, নরেনরা। তোরা সবাই আজ মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা কর, প্রতিমুহূর্তে এই ভেবে গর্ব বোধ করবি যে “এমন এক মহান দেশে, এক মহান জাতির প্রতিনিধি হিসাবে আমরা জন্ম নিয়েছি, এই ঐতিহ্য কে বয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই।”
স্যার এর চোখের কোণ টা একটু ভিজে ভিজে দেখাচ্ছে । ক্লাস এ বসে থাকা চন্দন, মিনি, সুশান্ত, মৈনাক রা জানে এর কারণ। তাদের মনেরও তো একই অবস্থা। পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ কিন্তু সকলে একটাই কথা আওড়াচ্ছে মনে মনে “ আমি গর্বিত, আমি বাঙালি “ ।
———————————————

