
উমাশশী কর্মকার
জলি চক্রবর্তী শীল
‘উমাশশী কর্মকার আছে তো?’
ফড়িং এবার মাথা চুলকায়| এ বাড়িতে উমশশী বলে কেউ আছে নাকি?
‘খোকা এই জন্য বললাম বাড়ির বড় কাউকে ডাক?’ ভোটার লিস্ট কারেকশন করতে আসা লোকটি মৃদু বিরক্তি নিয়ে ফড়িংকে বলে|
ফড়িং দুপুরবেলা একা একাই খেলছিল| এই সময় বাড়ির সবাই একটু বিশ্রাম নেয়| আর এই সময়টাতে ফড়িং এ বাড়ির সর্বেসর্বা| তাই কর্মীটি আসতেই সেই বলেছিল‚ তার সাথেই কথা বলতে‚ এখন কাউকে ডাকা যাবে না| অগত্যা কি আর করার আছে‚ বড় কাউকে তো ডাকতেই হবে| ফড়িং ভিতরে চলে যায়| কুঁজি ঠাম্মি তো জেগেই থাকে|
কুঁজি তখন বসে বসে ঝিমোচ্ছিল| একটু পরেই রাস্তাকলে জল আসবে| লাইন পড়বে| তার আগেই তাকে গিয়ে লাইন দিতে হবে|
‘ও কুঁজি ঠাম্মি‚ উমাশশী কর্মকারকে চেনো?’
ঝিমুনি টুটে গেলেও তখুনি কুঁজি বুঝে উঠতে পারে না‚ ফড়িং কি জানতে চাইছে|
‘কি বললি?’
‘বলছি উমাশশী কার নাম তুমি কি জান?’
‘তাকে তোর কি দরকার শুনি?’
‘ঐ যে একটা লোক এসেছে সে সবার নাম ধরে ধরে আছে কিনা জিজ্ঞাসা করছে| সবার নাম তো আমি জানি| তাই তারা আছে বলেছি| কিন্তু এই উমাশশী কার নাম তাই তো জানি না| তাই তোমার কাছে জানতে এলাম তুমি চেনো কিনা?’
‘চ দেখি কে এসব জানতে চাইছে?’ বলে কুঁজি উঠে পরে তার ছোট্ট কুঁজো শরীরটা নিয়ে| কুঁজের জন্য কোনকালেই সে সোজা হয়ে হাঁটতে পারল না| এখন তো বয়সের ভারে আরই শরীর ন্যুব্জ|
একরাশ বিরক্তি নিয়ে কর্মীটি তখনও দাঁড়িয়ে| আজকালকার এই পাকা বাচ্চাগুলোর পাকামির আর শেষ নেই| আগেই ডেকে আনলে এতক্ষণে পরের বাড়িটাও সারা হয়ে যেত|
‘এই যে বাছা উমাশশীকে খুঁজছ কেন?’ কুঁজি প্রশ্ন করে|
‘ভোটার লিস্ট কারেকশন হচ্ছে দিদিমা| তাই উনি বেঁচে আছেন কিনা জানতে চাইছিলাম|’ কর্মীটি বলে|
‘আছে বাবা‚ তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে|’ কুঁজি উত্তর দেয়|
‘ঠিক আছে|’ বলে কর্মীটি কাগজে দাগ দিয়ে নিয়ে চলে যায়|
‘ঠাম্মি তোমার নাম উমাশশী?’ ফড়িং বেশ অবাক হয়েই প্রশ্নটা করে| এই কুঁজি ঠাম্মিরও যে একটা ভালো নাম আছে বা থাকতে পারে তা তার ছোট্ট মাথায় কিছুতেই ঢুকতে চায় না|
‘অনেক কাজ আমার এখন| তোর সাথে বকলে চলবে?’
‘বলো না কুঁজি ঠাম্মি তোমার নাম উমাশশী? তোমার এই নাম কে রেখেছিল? উমাশশী মানে কি?’ একরাশ প্রশ্ন নিয়ে ফড়িং যেন ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়|
‘বললাম না আমার এখন অনেক কাজ| একদম বিরক্ত করবি না| যা যা পালা দেখি|’ কুঁজি খেঁদিয়ে দেয় ফড়িংকে| তারপর দুটো বালতি নিয়ে রাস্তাকলে জল ধরতে চলে যায়|
রাস্তাকলে আজ লাইন তেমন পড়েনি| চারটে বেজে গেছে তবু এখনও কলে জল আসেনি| বাড়িতে অবশ্য ট্যাঙ্কের জল আছে, তাতেই সব হয়। শুধু খাবার জলটুকু রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যায় কুঁজি| ঐ বড় বড় বোতলের জল কিনতে অনেকগুলো করে টাকা লাগে| আর ঐ জলে তেমন স্বাদও নেই| হাবাদের বাড়ির দরজার পটিতে গিয়ে বসে সে| পরণের ফ্রকটা গুটিয়ে নেয়|
উমাশশী, কতকাল পরে নামটা শুনল সে| বাবা বাদ দিয়ে কেউই নামটা ধরে ডাকত না| বাবা সবসময় ‘উমা, মা আমার’ বলেই ডাকত| বাকি সবার কাছেই সে কুঁজি| পিঠে একটা বড় কুঁজ নিয়ে জন্মেছিল সে| কুঁজের জন্যই শরীরটা নির্দিষ্ট আকারে বাড়তে পারেনি| আড়াই ফুট শরীরে কুঁজটা কিন্তু বেড়েছে| আর তার বাড়ার ফলেই শরীরের অনেক হরমোন বিকশিত হতে পারেনি| কিন্তু এই কুঁজ নিয়েই সে যে দ্রুতহারে হাঁটতে পারে তা অনেকেই পারে না এই বয়সে এসেও| খাটতেও পারে না তার মত| বাবা বলতেন, ‘ভগবান বুঝি সব কাড়ে না, কিছু ক্ষমতাও দেন|’ ভাগ্যিস দিয়েছিলেন ভগবান তাই এখনও কুঁজি হেঁটে-চলে-দৌড়ে বেড়াচ্ছে| খুঁটে খেতে হয়, না হলে যে না খেতে পেয়ে ভাইদের-ভাইপোদের সংসারে মরতে হত|
অথচ আর পাঁচটা মেয়ের মতই কত সাধ ছিল মনে মনে| মুখে কখনও প্রকাশ করেনি| ছোটবোনটার বিয়ের দিনকে মনটা বড় উচাট্ন হয়েছিলও মন একখানা লাল বেনারসী পরার জন্য, কপালে চন্দন, গলায় গোড়ের রজনীগন্ধা মালা, হাতে কাজললতা| সত্যি কি খুব অসম্ভব ছিল মনের ইচ্ছাটাকে সত্যি করাটা| তারই মত এমন কাউকে কি খুঁজে পাওয়া যেত না, যেত হয়ত, কিন্তু খুঁজবে কে? আর কুঁজি চলে গেলে এ সংসারে ফাও খাটবে কে?
বারো ঘর এক উঠোন বাড়িতে সবারই ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো যে কুঁজি| বাপের অবস্থা ভালো ছিল না| তায় মদ খেয়ে খেয়ে লিভরটার বারোটা বাজিয়েছিল| শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিল| সংসার চালাতে মা ঠোঙা বানাতো, দু বাড়ি রান্নার কাজ| আর সংসার সামলাত কুঁজি| বাড়ির কারও অবস্থাই তেমন একটা ভালো ছিল না| তবু তাদের থেকে কিছুটা ভালো| ওদের ডাকে কুঁজি ওদের কাজ করে দিলে কাকীমা-জেঠিমারা খেতেও দিত| ঘরের খাবার তো বাঁচত| এর মাঝেই ছোট বোনটা ফিরে এলো শ্বশুর বাড়ি থেকে|
খোঁজ-খবর করেই বিয়েটা দিয়েছিল কুঁজির বাপ-মা| তবু মাস ঘুরতে না ঘুরতেই ফিরে এল বোনটা| পাড়ার ক্লাব, পার্টি অফিস, চেনা পরিচিত লোকজনের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে বিয়েটা হয়েছিল ছোটবোনটার| কিন্তু ঘর করতে পারল না| স্বামীর তার বৌদির সাথে অবৈধ সম্পর্ক| জেনেশুনে ওপক্ষের এমন বিয়েটা দেওয়া উচিত হয়নি| ছোটবোনটা খুব কেঁদেছিল কটা দিন| কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছিল কুঁজি|তার কুঁজটা নিয়ে খেলত বোনটা| যত্ন করে মুছিয়ে দিত বোনটার চোখের জল আর মনে মনে বলত, ‘ভাবিস না, আমি তো আছি, দুবোনে সুখে-দুখে কাটিয়ে দেব জীবনটা’। মুখে বলার সাহস হইনি| কে জানে, ওর আবার যদি বিয়ে দেয়| আশঙ্কা সত্যি করেই ডিভোর্স পাওয়ার পর পরই সে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসল| এবারের বিয়েটা হল টেঁকসই| এখন তো সে-ভরভরন্ত গিন্নী| ছেলে-বৌ, নাতি-নাতনী নিয়ে ভরভরন্ত সংসার| আর কুঁজি সেই ভাঙা কুলো|
কিন্তু আজও মনে প্রশ্ন জাগে সত্যি কি তাদের মত কুঁজিদের বিয়ে হয় না, নিজের ঘর হয় না, সমাজ-সংসারে মান থাকে না? নাহলে তারও তো কিছু ছিল| একরাশ চুল শরীর ছাপিয়ে লুটাতো| বিনুনী বাঁধলে যেন মনে হত একটা মস্ত মোচাফুল, এক ইঞ্চি কপাল, দুধে আলতা রঙ না হলেও, মোটের উপর ফর্সাই বলা চলে| কেউ চেষ্টাই করল না| বাড়িভর্তি নাতি-নাতনী-পুতি-পুতনীগুলোর মধ্যে আজ হয়ত তারও একটা অংশ ঘুরে বেড়াতো|
ফরফর করে কলে জল আসার একটা শব্দ হয়। কুঁজি কলের কাছে এসে দাঁড়ায়| উমাশশী নামটা যেন সবকিছু ওলট-পালট করে দিল| কতবছর তো হয়ে গেলে ভোট দিতেই যায় না সে। তবু ভোটার লিস্টে জ্বলজ্বল করা নামটার প্রতি বড় মায়া লাগে| কুঁজি নয় সে উমাশশী|
‘কি হল গো কুঁজিঠাম্মা? কলের জল যে পড়ে বয়ে যাচ্ছে, বালটি পাতো’| রাস্তাকলে লাইন দেওয়া জনৈকা মহিলা বলে| বিকেলে দুঘন্টা জল| এই অঞ্চলে জলের সমস্যা বরাবর| বাড়ির কলে জল সরু পড়ে, যাদের পাম্পমোটর আছে তাদের রেহাই। বাকি অনেকেই এই কল থেকেই তিনবেলা জল বয়ে নিয়ে যায়|
কুঁজি সম্বিত ফিরে পায় ‘হ্যাঁ, এই পাতি|’ বলে বালতিগুলো ধুয়ে একটা বালতি পেতে দেয়| ‘আজ যে বড় অন্যমনস্ক তুমি, কিছু কি ঘটেছে?’
হাসে কুঁজি, ‘আমার জীবনে এখন একটাই ঘটনা-পটল তোলা| তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকল, দেখা-শোনা সব তো সাঙ্গ হল, এবার পরপাড়ের ডাক এলেই হল’|
‘কিসব বলছ গো তোমার শরীর ঠিক আছে তো? এই গতদিনে আরুণির মা যখন তোমাকে এই কথাটাই ঝগড়ার মাথায় বলল তুমি তো তাকে চারকথা শোনাতে ছাড়লে না আর আজ যে উল্টো কথা|’
রহস্যময় হাসি হাসে কুঁজি ‘সে তো তোদের কুঁজিঠাম্মা কাউকে রেয়াত করে না কিন্তু উমাশশী কর্মকার রেয়াত করবে| ভরা বালতি রইল, দেখিস আমি একটা বালতি রেখে আসি|’
‘ও কুঁজিঠাম্মা কে এই উমাশশী কর্মকার?’
‘এই যে আমি তোদের কুঁজিঠাম্মা, আমার নামই তো উমাশশী কর্মকার|’
জলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই শব্দ করে হেসে ওঠে| ‘কথায় আছে না কুঁজোরও চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, তোমার দেখছি সেই সাধ| উমা আবার শশী কে রেখেছিল গো তোমার নামখানা? বাহারের শরীর নয়, বাহারের নাম| উমাশ-শী” টেনে টেনে উচ্চারণ করে আরুণির মা| সবাই শব্দ করে হেসে ওঠে| কুঁজি দ্রুত পা চালায় বাড়ির দিকে, মিলিত হাসির ছররা যেন ধেয়ে আসে| কুঁজির চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, ভারী বালতিখানা নিয়ে উঠতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গড়িয়ে যায় সিঁড়ির কোনায়| একটা কচিকন্ঠ চিৎকার করে ওঠে ‘কুঁজিঠাম্মা’|
শ্রাদ্ধ শেষ| সাদা থান দিয়ে সুদৃশ্য গেট তৈরি হয়েছে| ছাদে সাদা থানের প্যান্ডেলে লোকজন আদর-আপ্যায়িত| শুধু ফড়িং একাকী মনমরা| তার কুঁজিঠাম্মার আজ কাজ| উমাশশী কর্মকারের আজ শ্রাদ্ধ| নামটা কেমন যেন কুৎসিত লাগছে উচ্চারণ করতে| শ্রাদ্ধবাসরে একাকী কুঁজিঠাম্মার মালা-চন্দন পড়া একখানা ফটো| আশেপাশে কেউ নেই| ফড়িং ধীর পায়ে এগিয়ে যায়। তারপর বলে। ‘উমাশশী না, তুমি আমার কুঁজিঠাম্মাই ঠিক ছিলে| কি দরকার ছিল সবাইকে জানাতে যাওয়ার যে তোমার নাম উমাশশী? “আর কিছু বলতে পারে না ফড়িং, ঝরঝর করে চোখ দিয়ে তার জল ঝরে|
*********************************************

জলি চক্রবর্তী শীল পরিচিতিঃ
পেশাগতভাবে একজন কম্পিউটার অপারেটর একটি সওদাগরী আপিসে। নেশা বই পড়া এবং কিছু লিখতে চেষ্টা করা। জলির লিখতে ভালো লাগে সেইসব প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে, জীবন যাদের কাছে প্রাত্যহিক লড়াইয়ের নাম। এক টুকরো রুটি বা এক থালা ভাতের কদর যেখানে সবচেয়ে বেশি সেইসব মানুষদের সুখ-দুঃখ-বেদনা-ভালোবাসার দৈনন্দিন গাঁথাই জলির লেখার উপজীব্য।
