
অপরাহ্নের মিঠে আলো
জলি চক্রবর্তী শীল
ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ চা না হলে ঠিক ঘুমের রেশটা কাটতে চায় না দীর্ঘইয়ের | কিন্তু আজ ছন্দপতন | ঘড়ির কাঁটা আটটার ঘর ছুঁই ছুঁই | জানলার কাঁচ থেকে সূর্যের আলো প্রতিবিম্বিত হয়ে চোখে পড়ছে | ঘুমটা তাই আগেই ভেঙে গেছে | তবু বিছানা কামড়ে পড়ে আছে সে‚চা’টা খেয়েই একেবারে স্নান করতে ঢুকবে বলে | কিন্তু আজ আর কেউ চা দিতে আসে না দেখে নিজেই বিছানা ছেড়ে নেমে আসে সে | চিৎকার-চেঁচামেচি করে কথা বলা কোনকালেই দীর্ঘই পছন্দ করে না | তাই সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ে | ছোট ভাইয়ের বউ নিভা চা নিয়ে উপরেই আসছে |
‘আজ একটু দেরী হয়ে গেল ছোড়দি |’ নিভা কৈফিয়ত দেয়ার চেষ্টা করে |
দীর্ঘই চা’টা নিয়ে নিজের ঘরে চলে যায় কোন কথা না বলেই | পারতপক্ষে সে কম কথার মানুষ | চা খেয়েই টয়লেটে চলে যায় সে | বেশ কিছুটা সময় এখন সে নিজের জন্য ব্যয় করবে | যৌথ বাড়িতে যদিও সবার জন্য একটাই টয়লেট‚তবে বেশ কিছুদিন আগে ঘরের লাগোয়া বারান্দাটার একটা দিকে একটা টয়লেট নিজের জন্য আলাদা করে তৈরি করিয়ে নিয়েছে দীর্ঘই | দেওয়ালজোড়া একটা আয়নায় নিজেকে সে অনাবৃত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে | দেখতে দেখতে পাঁচ দশক কেটে গেল | অন্যদের পেটে যেমন তিন পরত মাংসের দলা তেমনটা তার এখনো নেই | নিপাট পাতা পেট | দেহের চামড়ায় নেই তেমন শিথিলতা|অবশ্য সময়ের আর্জি মেনে গাল ঈষৎ ভেঙেছে‚ মাথায় চওড়া হয়েছে সিঁথি‚পাতলা হয়েছে চুলের গোছ | তবু এখনো যা আছে বেশ বড় খোঁপা বাঁধা যায় | দেখতে দেখতে মন ভারী হয়ে ওঠে দীর্ঘই-এর | সব মিলিয়ে এখনো বেশ সুন্দর সে | এই শরীর যাকে সে যত্ন করে তা আজও অনাঘ্রাতা | আর পাঁচটা মেয়ের মত সংসার করার স্বপ্ন সেও দেখেছিল | কিন্তু বাস্তব হয়নি | কেউ কোনদিন তার সুগন্ধী চুলে মুখ ডোবায়নি‚কেউ কখনও তার বক্ষবিভাজিকায় নাক ঘষেনি | নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস মোচিত হয় | বয়স পেরিয়ে গেছে তবু খুব ইচ্ছে করে একটিবার সংসার করতে | সৌরাংশু যদি আর কটা বছর অপেক্ষা করতে পারত !
সময় নিয়ে স্নান সেরে শাড়িটা পড়ে নেয় | ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে হালকা মেকাপ করে | বেশ লাগছে দেখতে নিজেকে | অফিসের অনন্যা ঠিকই বলে,‘নিজের জন্য সাজবে দীর্ঘইদি | নিজেকে ভালোবাসবে |’ সেই চেষ্টাই করছে দীর্ঘই | নিজেকে ভালোবাসতেই চায় সে | সাংসারিক বিপাকে পড়ে নিজের দিকেই তাকানো হয়নি দীর্ঘদিন | নিজের অস্তিত্ব ভাই-বোনদের মানুষ করতে করতে কখন যে ভুলে গেছে | কিন্তু আর না‚ যে আত্মত্যাগ সে করেছে তার মূল্য তার পরিবার দেয়নি | তাই জীবনটাকেই সে এখন বদলে নিতে চায় | নিজের মত করে বাঁচতে চায় |
‘ছোড়দি ভাত বেড়েছি খেতে এসো’‚নীচ থেকে নিভা চেঁচায় |
এই বউটার সাথে বেশি কথা না বললেও নিভা মেয়েটা কিন্তু খাঁটি | সবাই যখন স্বার্থ নিয়ে মাতামাতি করছিল এই মেয়েটা তখন কিন্তু স্পষ্টভাষায় বলেছিল‚‘ছোড়দিরও নিজের মত করে বাঁচার অধিকার আছে |’
দীর্ঘই নিচে নেমে এসে টেবিলে বসে | ধোঁয়া ওঠা ভাতের গন্ধে ক্ষিধেটা চাগিয়ে ওঠে | কিন্তু আজ খুব দেরী হয়ে গেছে | অল্প খেয়েই সে বেরিয়ে পড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে |
‘ছোড়দি সাবধানে যেও | দুগ্গা দুগ্গা’ বলে নিভা কপালে হাত ঠেকায় |
মায়ের কথা খুব মনে পড়ে দীর্ঘই-এর | পিছন ফিরে তাকায় নিভার দিকে | ঠিক এইভাবে মা রোজ বের হবার সময় বলতেন | খুব ইচ্ছে করে নিভার থুতনিটা নেড়ে দিতে | মেয়েটা ভালোবাসা কেড়ে নিতে জানে |
‘খুব ননদের মন যোগাতে শিখেছিস তো ছোট| ঢেলে উপড়ে দিচ্ছে বুঝি ?’ রান্নাঘরের দিক থেকে উড়ে আসা শব্দগুলো মনটাকে তিক্ত করে দেয় | ক্ষণিক আগের স্মৃতিমেদুরতা কর্পূরের মত উবে গিয়ে একটা চাপা কান্না যেন চোখের কোলটাকে আর্দ্র করে দেয় |
অফিসে পৌঁছেও মনটা ভালো হয় না দীর্ঘই-এর | চুপচাপ কাজের মধ্যে ঢুকে যায় সে | একমাত্র কাজেই মুক্তি | একটা সময় বাবা যখন হঠাৎ করেই চলে গেলেন‚ তখন তিন ছোট ভাই আর এক বোন আর মাকে নিয়ে অকূল পাথারে | ভাগ্যিস কোম্পানী চাকুরীটা তাকে অফার করেছিল তাই পরিবারটাকে বাঁচাতে পেরেছিল সে | সবেমাত্র উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছিল সে | তাই বাবার পদে নিয়োগ পায়নি | নিচুতলার পদে নিযুক্তি পেয়েছিল | টেনেটুনে চলত সংসার | নুন আনতে পান্তা ফুরোনো সংসারে কাজ করে‚অফিস করে নিজের পড়াশোনাটা চালিয়ে গিয়েছিল সে | শেষ করেছিল নিজের স্নাতকস্তরের পড়াশোনা | তারপর নিয়েছিল কম্পিউটারে প্রশিক্ষণ | তারও বেশ কয়েকবছর পরে সে ধাপে ধাপে উন্নতি করেছিল নিজের কেরিয়ারে | ভাই বোনগুলোর পড়াও চালিয়ে নিয়ে গেছে | ভেবেছিল ভাইরা ভালো চাকুরী পেলে‚সে নিজের জীবনে সেটল হবে | সৌরাংশও অপেক্ষা করছিল তার জন্য | কিন্তু সময় চলে যাচ্ছিল‚ভাইরা স্নাতক হয়েও তেমনভাবে চাকুরীর সুবিধা করে উঠতে পারছিল না | মা মুখ ফুটে কিছু বলেননি‚কিন্তু সে বুঝেছিল এই মাঝপথে সে ফেলে চলে যেতে পারে না | সবকটা মুখ তখন তার দিকে তাকিয়ে | অনুচ্চারিত কিছু শব্দ থেকেই যায়‚যার ভার ফেলে এগিয়ে যাওয়া সহজ নয় | সৌরাংশুও একদিন অপেক্ষা করা থেকে অব্যাহ্তি চাইল | প্রেমও তো পরিণতি চায় | একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীর্ঘই | সৌরাংশুকে ভুলে যেত পারল কই ! আজও মনের ভিতরে একটা তিরতিরে অভিমান বয়ে চলে অন্তঃসলিলা নদীর মত | সত্যি কি অপেক্ষা করা যেত না !
‘আরে আজ তো আমাদের দীর্ঘই-দিকে অপুর্ব লাগছে’‚হৈ হৈ করে জড়িয়ে ধরে অনন্যা |
মৃদু হাসে দীর্ঘই |
‘তুই তো বললি সেদিন‚যে জীবনটাকে বাঁচো | সত্যি রে বাঁচতেই ভুলে গেছিলাম |’
‘হুম‚নিজের মত করে বাঁচো | ঘুরতে যেতে ইচ্ছে হলে ঘোরো‚খেতে যেতে ইচ্ছে হলে খেতে যাও আর হ্যাঁ ট্রীট দিতে ইচ্ছে হলে ট্রীট দিও আমাকে | মাঝে মাঝে ডেটে যাও |’ অনন্যা কলকল করে ওঠে |
‘মারব এক থাপ্পর | বুড়ো বয়সে কার সাথে ডেটে যাব শুনি ?’
‘উফ তুমি সেই মান্ধাতা আমলেই রয়ে গেলে দিদি | সময়টা অনেক এগিয়েছে | পাত্র পাত্রীর বিজ্ঞাপনগুলো দেখো না নিশ্চয় | উল্টে দেখো অনেক কিছু পাল্টে গেছে |’
‘সে পাল্টাক‚আমি আর পাল্টাতে পারব না | তুই যে অবধি পাল্টেছিস তাতেই বাড়িতে মোটামুটি একটা বিপ্লব ঘটে গেছে |’
‘ঘটতেই হবে | দেখ দীর্ঘইদি অনেক আত্মত্যাগ তো করলে‚তোমার ভায়েরা যখন বেকার অবস্থায় বিয়ে করে নিয়ে চলে এল তোমার ভরসায় তখন তুমি তাদের দেখেছ | এখন তারা যাইহোক কিছু করছে‚সংসার চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে আশা রাখি | সেখানে তুমি কেন তোমার জীবনে সেটল হবে না ? সৌরাংশুদা কি সেটল হয়নি ?’
‘বছর কয়েক আগের কথা অনন্যা‚আমার ছোট ভাইয়ের বৌ নিভা বলেছিল কথাটা | বড় ভাজ-ভাই বলেছিল‚ও চলে গেলে আমাদের চলবে কোথা থেকে | ও হচ্ছে দুধেল গাই | তাই তো এত যত্নে রেখেছি | আমার মায়ের পেটের ভাই মুখের ওপর কথাটা বলেছিল |’
‘হুম শুনেছি তোমার মুখে আগেও | আমি জানি তোমার খুব কষ্ট হয়েছিল | তাই তো বলছি‚দীর্ঘইদি নিজের মত করে বাঁচো | চলার পথে কেউ যদি তেমন মেলে তখন কিন্তু তাকে ফিরিয়ে না দিয়ে একটু ভেবো | বয়স চলে গেল তো কি ? পাশাপাশি বসে দুজনের সুখ-দুঃখগুলো ভাগ করে নেবে সেটাই বা কম কি ?’
‘কি ব্যাপার বলত ? কদিন ধরেই তুই আমায় ঠারে ঠোরে কিছু যেন বলার চেষ্টা করছিস | কি বলতে চাইছিস অনন্যা খুলে বল | আমি আবার এত ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বুঝত পারি না |”
‘আগে বল তুমি রাগ করবে না‚তাহলেই আমি তোমায় বলব |’
‘বেশ করব না | বল তুই |’
‘তুমি একদিন আমায় কথায় কথায় বলেছিলে‚সংসার করতে বড় লোভ হয় তোমার | ঠিক তো ?’
‘হ্যাঁ লোভ হয় রে‚খুব লোভ হয় |’
‘আমার এক দাদা আছে | তোমার একটা ফটো দেখিয়ে একদিন গল্প করছিলাম | তো সেই দাদাই বলল যে যদি তুমি রাজী থাকো তাহলে উনি একবার তোমার সাথে দেখা করে তোমার সাথে কথা বলতে চান | আমার দাদা বলে বলছিনা‚তুমি আলাপ করে দেখো‚ মানুষটা খুব ভালো | আমি খুব খুশী হব‚যদি সেই আলাপচারিতা একটা পরিণতি পায় |
‘কি সাংঘাতিক মেয়ে রে তুই!!!’ দীর্ঘই সবিস্ময়ে কথাটা বলে |
‘সাংঘাতিকের কি আছে ? দাদাও বিয়ে করেননি | মানে প্রথম জীবনে নিজের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থেকেছেন যে বিয়ের কথা মনে হয়নি | এখন আমাদের বিয়ে থা দেখে ওঁর যদি বিয়ের শখ জাগে সেটা অন্যায় কোথায় ? আর প্রয়োজনটাকেও তুমি অগ্রাহ্য করতে পারো না | আমার মনে হয় দীর্ঘইদি‚একান্ত আপন একজন মানুষের জীবনে থাকা খুব দরকার |’
‘অনন্যা তুই তো সব জানিস‚তাহলে কেন এসব বলছিস ?’
‘জানি বলেই বলছি | সৌরাংশুদাকে হয়ত তুমি আজও ভালোবাসো | কিন্তু সেই মানুষটা আজ আর তোমার একান্ত নেই | তাহলে আমার দাদাকে কি একবার সুযোগ দিয়ে দেখবে না ?’
‘তুই কিসব বলছিস অনন্যা ? বুঝে বলছিস‚নাকি যা মনে আসছে বলে চলেছিস ?’
‘বুঝেই বলছি‚ঐ যে বললাম উল্টে দেখো‚সমাজটা কোথাও কোথাও কিন্তু অনেকটাই পাল্টেছে | একবার দেখাই করো না দাদার সাথে | খুব বেশি কি আর হবে তোমার তাকে পছন্দ হবে না আবার উল্টোদিক থেকে তারও তোমাকে দেখে হয়ত ভালো লাগল না‚ছবিতে ভালো লাগলেই কি আর বাস্তবে ভালো লাগবে ?’
‘মোক্ষম ডোজটা দিলি তাহলে ?’ রাগতে গিয়েও হেসে ফেলে দীর্ঘই | পুরুষের কাছে ভালো লাগবে না ব্যাপারটা মেয়েদের কাছে বেশ অসহনীয় | সুতরাং দীর্ঘই দেখা করবেই এটা বললে সেটা বুঝেই কথাগুলো বলেছে অনন্যা |
আজ বাড়িতে একটা জমায়েত ডেকেছে দীর্ঘই | সেখানেই সে ঘোষণা করেছে‚সে বিয়ে করতে চলেছে আর কিছুদিনের মধ্যেই |
‘কাকে বিয়ে করতে চলেছিস ছোড়দি ?’ ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে বড় ভাইয়ের গলা দিয়ে |
‘একজন এলিজেবেল ব্যাচেলরকেই বিয়েটা করব |’
‘এই বয়সে ?’ আশ্চর্য হয়ে প্রশ্নটা করে বড় ভাইজি |
‘ছোড়দি তোমার কি মাথাখারাপ হয়েছে ?’ বড় ভাজ বলে |
‘ছোড়দি পাড়ার লোকজন নিন্দে করবে ?’ বড় ভাই আকুল হয়ে ওঠে |
‘আমরা কি তোকে খারাপ রেখেছি ছোড়দি ?’ ছোটভাই বলে |
‘ওদের কথা শুনো না ছোড়দি | এতদিনে একটা ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত নিয়েছ ছোড়দি’ বলে ওঠে নিভা |
মেজভাই আর মেজভাই-য়ের বউ চুপচাপ বসে থাকে | কপালের ভাঁজে চিন্তার রেখা | সবার আগে বেকার অবস্থাতেই বিয়ে করে এসেছিল এই মেজভাই | তাই এর মেয়েই সবার বড় | বিয়ে স্থির হয়েছে | কিন্তু নির্ভর সেই দীর্ঘই | এখনও যে খুব ভালো কিছু করে তা নয় | সংসারটা এক আছে দীর্ঘই-এর জন্য | দীর্ঘই না থাকলে সংসার টুকরো হতে সময় লাগবে না | তখন কি হবে ?
‘তোরা দুজনে কিছু বলবি না ?’
‘বলে কি লাভ কিছু হবে? তুই তো সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিস | সামনেই মেয়েটার বিয়ে | তুই তো সবই জানিস | তোকেই সব করতে হবে | আমার তো তেমন টাকাকড়ি নেই | তোর ওপর নির্ভর করে বিয়েটা দেব জানতাম | কিন্তু এখন দেখছি’ কথা শেষ করে না মেজভাই |
‘সারাজীবন তো তোদের ভার বয়েই এলাম | এখনও বয়ে দেব | ভাবিস না | তবে যেটা নিয়ে তোরা এত কথা বলছিস‚সেটা কিন্তু আমি করছি | মানে বিয়েটা আমি করছি | লোকে কি বলবে ওসব নিয়ে তোরা মাথা ঘামা | নিভা তুই কিন্তু আমার সাথে বিকালে বের হবি |’
‘যাবো ছোড়দি’ |
সবার সব ওজোড়-আপত্তিকে সরিয়ে নিভাকে নিয়ে বিকেল বিকেল বেরিয়ে যায় দীর্ঘই | নিভা আনন্দে ফুটছে | কলকল করে কত কথাই বলে চলেছে | দীর্ঘই হেসে উত্তর দিছে বা দিচ্ছে না | আসলে দিনকয় আগে অনন্যার কথাতেই দেখা করেছিল ওর দাদা তুষারের সাথে | ভদ্রলোক ভীষণ অমায়িক | ভদ্রলোককে ঠিক হাটিয়ে দেবে ভেবেই অনন্যার কথাতেই রাজী হয়েছিল | কিন্তু বাস্তবে কখন যেন মনে হল‚এই মানুষটাকে সে ভীষণভাবে চেনে | না সৌরাংশুর সাথে কোন মিল নেই | তবু একটু একটু করে বুঝছিল‚সে প্রবলভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে তুষার নাম্নী লোকটির প্রতি | এই কয়দিনে বারকয়েক কথাও হয়ে গেছে | একটা ঘোর লেগে আছে যেন | পঞ্চাশের পর এমন মনের অবস্থা হয় নাকি ? জানা ছিল না | কিন্তু এখন জানছে | আসলে ভালো লাগার কোনো বয়স হয় না | আর ভালো লাগা থেকে প্রেম হতেও বুঝি সময় বেশি লাগে না | তাই একসাথে বাকি দিনগুলো কাটানোর সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগেনি | বাকিটা আনুষ্ঠানিক |
‘এখনও বললে না‚আমরা কোথায় যাচ্ছি ছোড়দি?’
‘গেলেই দেখতে পাবি’ | দীর্ঘই অভ্যাসমত সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় |
দুটো ট্রেন পাল্টে ওরা পৌঁছে যায় তুষারদের বাড়ি | তুষারের বাড়িতে আজ নিমন্ত্রণ দীর্ঘইয়ের | নিভা বাড়িটা দেখেই বুঝে যায় এটাই তুষারদার বাড়ি | ছিমছাম সাজানো বাড়িতে তুষারের উষ্ণ অভ্যর্থনায় নিভা খুব খুশি হয় | মেয়েটা কলকল করে ওঠে তুষারের সাথে | অনন্যাও আছে আজকে | তিনজনে মিলে যায় |
দীর্ঘই বরাবরের মত চুপচাপ ওদের কথা শোনে |
খাবার টেবলে তিনজনের আলাপচারিতা‚গল্প‚খুনসুটি বেশ উপভোগ করে দীর্ঘই |
‘তাহলে শালাজ তুমিই তবে আমাকে পারমিট দেবে তোমাদের বাড়ির জামাই হবার |’ তুষার মৃদু হেসে প্রশ্ন করে |
‘কি আর করা যাবে | আমিই তো সবার বড় | বাকি ভাই‚ভাই বৌদের তেমন একটা মত নেই | এক এই মেয়েটাই প্রথম থেকে চেয়ে এসেছে আমার বিয়ে হোক‚সংসার হোক | তাই আমার মনে হল‚আমার তরফ থেকে ঐ সব দেখে শুনে নিক’ উত্তরটা দেয় দীর্ঘই |
‘একদম ! আমি সব দেখেশুনে তারপর হ্যাঁ করব ছোড়দি | কিন্তু আমার কোন কিছু অপছন্দ হলে কিন্তু তোমাকে রিজেক্ট করে দেব তুষারদা | কি ঠিক আছে তো ছোড়দি ?’ নিভা ত্বরিতে দীর্ঘইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসে | মুখটা ফ্যাকাশে | ছোড়দি এতদিন পর বিয়ে করতে চলেছে‚অপরাহ্নের এই মিঠে নরম আলোতে ছোড়দি আর তুষারদার জীবনটা সেজে উঠুক | অন্তকরণ থেকে সে সেটাই চায় |
টেবিলেই দিন স্থির হয় | অনাড়ম্বর আয়োজনে বিয়েটা হবে | তারপর দুজনেই শুরু করবে তাদের নতুন জীবন |
অনাড়্ম্বরভাবেই বিয়েটা সারবে ভেবেছিল দীর্ঘই আর তুষার | তবে একটু আয়োজন তো করতেই হয় | দুজনের জনাকয় বন্ধুবান্ধব‚অফিস কলিগদের নিয়ে একটা ছোটোখাটো ভোজসভায় সবাই মেতে উঠল |
নিভা আর অনন্যা সুন্দর করে ফুলশয্যার খাট সাজিয়ে দিয়ে গেছে | অদ্ভুত এক লজ্জা এসে ভর করেছে দীর্ঘইয়ের ওপর | তুষারের গায়ের সাথে লেপ্টে বসে দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক |
‘এত সুখ সইবে আমার তুষার?’
‘সইবে’ দীর্ঘইয়ের খোলা চুলে মুখ ডুবিয়ে তুষার গুনগুনিয়ে ওঠে ‘ভালোবেসে সখি নিভৃতে যতনে/আমার নামটি লিখো-তোমার মনের মন্দিরে |’
*************************

জলি চক্রবর্তী শীল পরিচিতিঃ
পেশাগতভাবে একজন কম্পিউটার অপারেটর একটি সওদাগরী আপিসে। নেশা বই পড়া এবং কিছু লিখতে চেষ্টা করা। জলির লিখতে ভালো লাগে সেইসব প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে,জীবন যাদের কাছে প্রাত্যহিক লড়াইয়ের নাম। এক টুকরো রুটি বা এক থালা ভাতের কদর যেখানে সবচেয়ে বেশি সেইসব মানুষদের সুখ-দুঃখ-বেদনা-ভালোবাসার দৈনন্দিন গাঁথাই জলির লেখার উপজীব্য।
