
রোশনি
মধুমিতা মিত্র
সামনের দোতলা লাল বাড়ি থেকে হুড়মুড়িয়ে বেশ লাবণ্যময়ী গাবলুগুবলু ফর্সা, মিষ্টি একটি অল্পবয়সী বৌ চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে হাতে ততোধিক মিষ্টি একটা ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে বেরোলো।বাড়ির সামনেই পার্ক করা তাদের লাল চার চাকার দরজা খুলে“অভ্যু অভ্যু–জলদি জলদি –স্কুলে দেরী হয়ে যাচ্ছে “বলে ঠেলে বাচ্চাটিকে তুলে নিজেও উঠলো।
সেই সকাল সাড়ে সাতটায় মৈত্রীর তখন চা–বেলা,ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপটি নিয়ে মৈত্রী অলস মনে সকালের মৌতাত নিচ্ছিল।বিয়ের পর থেকেই স্বামীর কর্মস্থলে নানান গঞ্জ, স্যাটেলাইট–অনু শহরে দিন কাটিয়ে জীবনের এই গোধূলি বেলায় তাদের এখন নীড়ে ফেরার পালা।মৈত্রীদের আধাখ্যাঁচড়া বাড়ি সম্পূর্ণ করতেই কোয়াটার্সের প্রবাস জীবন ছেড়ে সাময়িক ভাবে স্হিত সে শাশুড়ি –আলয়ে।আসলে মৈত্রীর অকাল বিধবা শাশুড়ি প্রতিমা দেবী তাঁর প্রয়াত স্বামীর কেনা জমিতে মাথাগোঁজার একটি ঠাঁই বানিয়ে রয়েছেন সেই আজ কবে থেকে। বস্তুত মাথাগোঁজার এই ঠাঁইটির অর্থসংস্থান কিন্তু প্রতিমা দেবীর একটিমাত্র সন্তান, মৈত্রীর স্বামী অনির্বাণের সৌজন্যে । কিন্তু বাড়ীটি যেহেতু প্রতিমা দেবীর নামে সেহেতু সদর্পে বাড়ির মালকিন হবার অহঙ্কারে তিনি পাড়া ,পরিজনকে দাপিয়ে বেড়াতে এবং বাড়ি যে শুধু মাত্র তাঁর–তাঁর বাবার নয়,শ্বশুরের নয়,স্বামীর নয়, এমনকি ছেলেরও নয় একথা সদম্ভে প্রচার করতে বিন্দুমাত্র সংকোচ করেন না।তাই প্রতিমাদেবীর চরিত্রের কপটতা– বিশ্লেষণ নিরপেক্ষ।
প্রতিমা দেবী মৈত্রী কে নিজেই পছন্দ করে তাঁর একমাত্র সন্তান অনির্বাণের সঙ্গে বিবাহ দেন। আজকের মৈত্রী যখন ফিরে দেখে সেই দিনটিকে ,সে দেখতে পায় বাস্তববাদী, ন্যায়পরায়ণ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে সে–ই মৈত্রীকে যে বিবাহোত্তর জীবনে সবার সাথে মানিয়ে চলার শিক্ষা নিয়েই নতুন জীবনে প্রবেশ করেছিল।প্রথম প্রথম অনেক কিছুই বেমানান লাগলেও নিজগুণে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নিজের কাছেই অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল সে।‘”আমারই তো শ্বশুরবাড়ি, আমারই শাশুড়ি” এভাবেই self councelling করে যেত নিজেকে সে। অবনমিত, অশিক্ষিত,অসংস্কৃত শ্বশুরবাড়ি থেকে তার অবশ্যই মুক্তির একটা জায়গা ছিল –তা হ‘লো তার স্বামীর কর্মক্ষেত্র।যত প্রত্যন্ত বনবাসই হোক না কেন তাদের শোবার চৌকির ওপর তার পছন্দমতো সুরুচি সম্পন্ন চাদরখানা পরিপাটি করে বিছানোর মধ্যে,সামান্য আলু সেদ্ধ ডাল ভাত সুন্দর করে সুপরিবেশনে খাওয়া এবং খাওয়ানোর মধ্যেই সে তৃপ্তি, শান্তি, স্বাধীনতা খুঁজে নিত এবং তাইতেই সে নিজেকে আনন্দে রাখতো।কোনো বিলাস দূরস্থান, স্বাভাবিক জীবন যাপনের ন্যূনতম জিনিসের অভাব সত্ত্বেও সে মহানগরীর জীবনের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্ৰহীই ছিল না ,আকৃষ্ট তো মোটেই নয়– কারণ তার শ্বশুর বাড়ি কি এক অদ্ভুত নিম্নমানের হতশ্রী যাপনের , চিন্তাধারার, কথাবার্তার, খাদ্যাভাসের,পোষাক পরিচ্ছদের, মানুষের প্রতি মনোভাবের.. সব মিলিয়ে ঐ শ্বশুরবাড়ি তাকে গলাধাক্কা দিয়ে হাওড়া স্টেশনের ওপারে ছুঁড়ে ফেলতে চাইত।তাই সেই মৈত্রী তার নির্বাসিত, প্রত্যন্ত প্রবাস জীবনকেই আঁকড়ে ধ‘রে, তাকেই সুষমা মন্ডিত করে তোলার প্রয়াসে ব্রতী ছিল।সেই সেদিনের মৈত্রীর চোখে স্বপ্ন ছিল আজকের এই রোশনির মতো এমন পরিপাটি ,সুন্দর, ফ্যাশনেবল এক জীবনের।
সুন্দর গৃহকোণ রচনার ব্রত পালনে নানান কৃচ্ছ সাধনের মধ্যে কেটে যাচ্ছিল মৈত্রীর গার্হস্থ্য জীবন,একটু একটু করে সাকার হয়ে উঠছিল স্বপ্ন গুলি।বছরে দু–চারবার কলকাতায় আসা,দু বাড়ি মিলিয়ে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দেওয়া।বাবা মা যতদিন ছিলেন ততদিন ব্যাপারটা অতটা কষ্টদায়ক হত না কারণ অর্ধেক সময়ে কষ্টেসৃষ্টে এ‘বাড়িতে ভালো বউ সেজে কোনোরকমে কাটিয়ে মার কাছে গিয়ে পরিপূর্ণ দম ফেলার আনন্দ পাওয়া যেত। কিন্তু মুশকিল হল মা বাবা প্রায় বিনা নোটিশে একেবারে পিঠোপিঠিই গত হলেন।এবারে কলকাতা মানেই তো শুধুমাত্র শাশুড়ি আলয়!যাই হোক তবুও মানিয়ে গুছিয়ে কলকাতার ক্ষণস্থায়ী সময়টুকুনি কোনোরকমে দাঁতে দাঁত চেপে অথচ মুখে হাসি মেখে বছরের পর বছর পার হচ্ছিল।এবার মুশকিল হল কন্যার স্কুল পর্বের অন্তিমে পতি দেবতাটি যখন ঘোষণা করলেন যে মৈত্রী কে তাঁদের কলকাতা স্থিত অসম্পূর্ণ বাড়িকে সম্পূর্ণ করে বৃদ্ধা মায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে কলকাতাতেই নোঙর ফেলতে হবে এবং সে পর্বে মৈত্রী তার স্বামী কে সাথে পাবে না কারণ স্বামী দেবতাটি তাঁর কর্মসূত্রে থাকবেন দূরে।হাত পা বাঁধা মৈত্রীর,এবার কলকাতায় ডেরা বাঁধা ছাড়া আর কোনো উপায় আর রইল না।বৃদ্ধা শাশুড়ি‘র দায়িত্ব নিতে, অসম্পূর্ণ বাড়ি সম্পূর্ণ করতে স্বর্গ–সম কোয়াটার্স জীবন পেছনে ফেলে; বৌদ্ধ দর্শনের “আত্ম দীপ ভব“এই মন্ত্রে নিজেকে উজ্জীবিত করে মৈত্রী পা বাড়ালো কলকাতায় অসীম নৈরাশ্যের পথে।
বৃদ্ধা শাশুড়ি বয়ঃক্রমে বৃদ্ধা হলেও মনে, প্রবৃত্তিতে এবং শারীরিক শক্তিতে একেবারেই মধ্যবয়স্কা। বার্ধক্যের উদারতা,ত্যাগ,বৈরাগ্য সব কিছুই তাঁর চরিত্রে তীব্র ভাবে অনুপস্থিত। ছাড়াতে নয় বরঞ্চ আঁকড়ে ধরা,আগলে রাখাতেই তাঁর আনন্দ। মিতব্যয়িতার অজুহাতে কর্তৃত্ব হস্তান্তর করতে নারাজ ছিলেন শ্বশ্রুমাতা।মৈত্রী তাই কর্মহীন ভাবে ঘুরে বেড়ায় আর বাড়ি তৈরীর তদারকি করে।মনের মতো করে বাড়ি সে বানায় বটে কিন্তু বুঝতে পারে যে এই কলকাতায় এসে এই সংসার সাম্রাজ্যে সে শুধুমাত্রই একজন কেয়ারটেকার।তাদের সংসারের সম্রাজ্ঞী তো আসলে এই অশতীপরবৃদ্ধা!তাতে তার আপত্তি থাকতো না যদি এই বৃদ্ধার মধ্যে জীবনযাপনে জীবন –বোধের,অভিজ্ঞতার সৌন্দর্য বোধ,মর্যাদাবোধ,রুচিশীলতায় সাধারণ কেও অসাধারণ করে তোলার মানসিকতা ও প্রচেষ্টা থাকত এবং সেই প্রজ্ঞার ছটায় উদ্দীপ্ত হতে পারতো সংসারের আর অন্যেরা। কিন্তু তা তো হবার নয়! ক্রমশঃ এই কদর্যতা, বুদ্ধিহীনতা, অশিক্ষা অথচ উন্নাসিকতা,দর্প, মানুষের প্রতি অবিশ্বাস,অ–ভালোবাসার সঙ্গে সহবাস করতে করতে মৈত্রীর মনের ভিতরকার সৌন্দর্য–বোধ, মানবিকতা,আত্ম বিশ্বাসের যে প্রদীপ খানি জ্বালা ছিল তা নিভু নিভু হতে শুরু করলো,আর একটু একটু অন্ধকার তার মনের মধ্যে থাবা বসাতে শুরু করলো।ঠিক এমন সময়তেই ,যখন তার পাশে একটিও আপনার লোক নেই,তাকে বুঝবার,মূল্য দেবার কেউ নেই,শুধু আছে স্থূলতা,অসততা,মিথ্যার সঙ্গে সহবাস আর সংঘর্ষ ,তেমনই সময়ে ঝলমলে ঐ রোশনিকে সে দেখতে পেল সমস্ত দৃষ্টি পথের ঝলমলে রোশনাই তে।
মৈত্রীর দিনমানটি কাটতো গৃহ নির্মাণের তদারকিতে–খাওয়ার মেনুতে ও যেমন তার পছন্দের অধিকার নেই–তেমনি রান্নাঘরে ও রন্ধন ক্ষেত্রে তার প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ কারণ মিতব্যয়িতা।অতএব গৃহ কর্মহীন মৈত্রীর গৃহ নির্মাণ তদারকির ফাঁকে ফাঁকে যা চোখে পড়তো তার হল বাড়ির চারিদিকের প্রতিবেশীদের জীবন–চর্চা।বাকী অন্য প্রতিবেশীরা ছিল ভীষনই মামুলি কিন্তু উল্টো দিকের বাড়ির এই অল্প বয়সী রোশনি বউটির দিনযাপন কী যে আকর্ষণ করতো মৈত্রী কে তা বলে বোঝাবার নয়।আসলে ঐ রোশনিরা এ‘পাড়াতে একেবারেই নব্য,তাই এদের সম্পর্কে সে কিছুই জানে না,তবু শাশুড়ি বললেন যে এরা নাকি মূলত প্রবাসী,এই হালে কলকাতায় এসে বাড়ি ঘর দোর করে স্হিত হয়েছে।এই বাড়ির ঐ অল্প বয়সী বউটিকে মৈত্রী দে‘খে সারাদিন কর্মব্যস্ত থাকতে,ঘড়ির কাঁটার সাথে তার সব কিছু বাঁধা।ছটফটে প্রাণবন্ত হাসিখুশি সুন্দরী বউটি সারাদিন ঘরকন্নার ফাঁকে নিজেকে সুন্দর করে,বাচ্চাটিকে সুন্দর করে রাখে–শাশুড়িও তার পটের বিবি, স্বামীর সঙ্গে যত না বেড়ানো–খেলানো, শাশুড়ির সঙ্গে তার ওঠা বসা সে তুলনায় অনেক বেশী।সব সময়তেই শাশুড়ির সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া,বাজারে যাওয়া লেগেই থাকে–কালে কস্মিনে স্বামী সহচরী হয়ে সে বেরোয় আর শিশু পুত্র টিকে সে–ই সর্বক্ষণ আগলে রেখেছে। একদিকে বাড়ির প্রায় সমস্ত সাংসারিক কর্ম,অন্যদিকে ঘড়ি ধরে সবার সেবা সে করেই চলেছে।বউটি বিকেল বেলা ছাড়া অন্য সময়ে যখনই বেরোয় হয় বাড়ির গাড়ী নয়তো রিক্সায় ,পায়ে হেঁটে কখনো ই তাকে চলতে দেখা যায় না,শুদ্ধু মাত্র বিকেল বেলাতেই শিশুপুত্র টিকে নিয়ে বাইরে খেলাতে যায়। মৈত্রীর যেহেতু বিনোদন, মনোরঞ্জনের আর কোনো ক্ষেত্র নেই এবং আবিল গৃহ বাতাবরণে মৈত্রী ক্লান্ত বিধ্বস্ত,তার জীবনীশক্তিও ক্রমক্ষয়মান–ঐ প্রতিবেশী সংসারের স্বাস্থ্যকর আবহ দর্শন সুখে মৈত্রী কে বেঁচে থাকার অনেকটাই খোরাক দেয়।ঐ অল্প বয়সী বৌটি মৈত্রীর থেকে অনেক ছোট তবুও তাকে দূর থেকে দেখেও মৈত্রী সঞ্জীবিত হয়—মনে মনে আফশোস করে আহা তার নিজের সংসার টিও যদি এমনটাই সুন্দর হত! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় একটাই এত কাছে থেকেও, এমনভাবে নিরীক্ষণ করেও বাক্যলাপের কোনো উৎসাহই কোনো তরফেরই নেই।মৈত্রীর মনোভাব-“আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি/আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি“।সে যাই হোক একদিন একেবারে আকস্মিকভাবেই দুজনের মধ্যে পরিচয় আর ঘনিষ্ঠতার একটা অদ্ভুত সুযোগ এসে গেলো।
মৈত্রীর শাশুড়ি মানুষটি যেমনই হোক মৈত্রীর সততা এবং শুদ্ধতা সম্পর্কে তিনি যে সচেতন তা উঠে এল একটি ঘটনাতে।উল্টো দিকের বাড়ির সেই নন্দিনী ‘র সঙ্গে মৈত্রীর পরিচয়ের পাট না থাকলেও মৈত্রীর শাশুড়ি‘র সঙ্গে কিন্তু রোশনির এবং তার শাশুড়ি মায়ের ভালোই বাক্যালাপ ছিল।মৈত্রী তার শ্বশ্রুমাতা‘র কাছেই শুনেছিল এ বৌটির নাম যে রোশনি তা – তার হিন্দি বলয়ে জন্ম এবং বেড়ে ওঠার জন্যই ।তো যাই হোক, এই রোশনির কোনো একটা ছোটখাটো অপারেশন হবে, তার জন্য তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে, কিন্তু রোশনির স্বামী অফিস থেকে ছুটি পাচ্ছে না এবং রোশনির শাশুড়িকে তার বাচ্চাটিকে দেখাশোনা করার জন্য শিশুটিকে নিয়ে বাড়িতেই থাকতে হবে,তাই রোশনির শাশুড়ি ও হাসপাতালে রোশনির সঙ্গী হতে পারবেন না।এবার অপারেশনের সময় এবং পরে রোশনির কাছে থাকার মতো কেউ নেই,রোশনি পড়েছে খুব মুশকিলে।মৈত্রীর শাশুড়ি সে কথা শুনে রোশনিকে আশ্বাস দিলেন “তুমি চিন্তা কোরো না–আমার বৌমা খুব ভালো,সে থাকবে তোমার সঙ্গে“।ব্যাস সেই যে পরিচয়ের সুযোগ হল, মৈত্রী নিমেষে হয়ে উঠল রোশনির দিদি ।
অচিরেই মৈত্রী বুঝতে পারলো বাইরে থেকে সদা প্রফুল্ল রোশনিকে খানিক দেমাকী দেখালেও অন্তরে সে ঝরঝরে এক বালিকার মতোই উজ্জ্বল। মৈত্রীর সঙ্গে বয়সে রোশনির প্রায় উনিশ কুড়ি বছরের তফাৎ হলেও তারা দুজনে কেমন সহজেই খুব প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠলো।রোশনির মা,রোশনি যখন M.Com ক্লাসের ছাত্রী তখনই ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।রোশনির বাবা আর দিদি থাকে ছত্তিশগড়ে।রোশনির ব্যক্তিগত পরিসর মৈত্রীকে রোশনি সম্বন্ধে আরও কোমল আর আরও শ্রদ্ধাশীল করে তুলল। যাইহোক ঘটনাচক্রে রোশনীর সঙ্গে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা হয়ে মৈত্রী কলকাতায় এসে এমন একজনকে পাশে পেল–যাকে মনের ব্যথা বেদনা খুলে দেখানো যায়, কিন্তু মৈত্রী তখনও বুঝতেই পারে নি –মৈত্রীর জন্য কি অপার বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে!
এদিকে মৈত্রীর শ্বশুরবাড়ির অদ্ভুত মলিন,নৈরাশ্যব্যঞ্জক–হতশ্রী বিশ্রী পরিবেশ,কিম্ভুত রক্ষণশীল , পিছিয়ে পড়া–নীচ মানসিকতা মৈত্রী কে কেমন জানি নিষ্প্রভ করে তুলছিল।আসলে অনির্বাণ অতিরিক্ত দায়িত্ব পরায়ণ,তার কলকাতায় আসার সময়ই নেই ,আর কলকাতার বাড়ীর অসংস্কৃত, অশিক্ষিত পরিবেশ,খাওয়া দাওয়া, কথাবার্তা–টীকা টিপ্পনী,আলাপ আলোচনায় সব সময়ই এক অদ্ভুত অসহযোগিতা, অসহনীয়তা,কদর্যতা, মৈত্রীর প্রতি বক্র আচরণ আস্তে আস্তে মাত্রা ছাড়াতে লাগলো।মৈত্রী নিজেকে খুলতে পারে একমাত্র রোশনির কাছে।রোশনি তাকে আশ্রয় দেয়,বুদ্ধি দেয়,সাহস দেয়–আর বলে “দিদি,চিন্তা কোরো না, তোমার সব রকম সমস্যায় আমি তোমার পাশে আছি,সবার বিরুদ্ধে গিয়েও আমি তোমার হয়ে লড়াই করবো, তুমি একদম চিন্তা কোরো না,ভেবো না“।মৈত্রী সবচেয়ে ভয় পায় তার ভেতরের শক্তি ,ভেতরের আশার নির্বাপন কে, কিন্তু রোশনি তার হাত শক্ত করে ধরে তাকে সাহস যোগায়,ভরসায় ভরিয়ে তোলে।
ইতিমধ্যে হল কি মৈত্রী একদিন তাদের এলাকার বাইরে গেছে, হঠাৎ রোশনি র ফোন–“দিদি তুমি কোথায়?-এরা আমাকে মেরে ফেললো“!মৈত্রী তো চমকে ওঠে রোশনির আর্তনাদে!কারা মেরে ফেললো! রোশনি বলে চলে“আমি এতদিন কারুকে বলি নি,আমার মরা মায়ের নেকলেস আমার এই শাশুড়ি চুরি করে সেটা ভাঙিয়ে নিজের অন্য হার বানিয়ে ফেলছে, আমার স্বামী ইন্টারনেটে অন্য অন্য মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করে–আমি হাতে নাতে ধরেছি বলে শাশুড়ির দোষারোপ ; আমারই কারণে সে নাকি অন্য মেয়ে খুঁজে বেড়ায়,আমিই আমার স্বামীকে প্রেমে মোহে বেঁধে রাখতে পারি নি, শ্বশুর রোজ সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি বসেই ড্রিংক ক‘রে–আমি ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকি,এত ভাবে এদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েও আজ আমার ছেলের বন্ধুদের মায়েদের ডেকে সামান্য চা, মিষ্টি ,শিঙারা কচুরি খাইয়ে আমোদ করেছি বলেই মা,বাবা ,ছেলে মিলে আমার সঙ্গে কি অশান্তি করছে!!! এই ছুতোয় কত না মারধোর করছে আমায়! তুমি এক্ষুণি এসো দিদি,আমি এদের পুলিশে দেব“—মৈত্রী তো স্তম্ভিত !যে রোশনি এত সুন্দর করে,এমন নিষ্ঠা ভরে সংসার করে!যার সংসারের সৌন্দর্যে মৈত্রী অভিভূত ,আবার দুঃখিতও যে তার নিজের এমন একটা সংসার হল না বলে—সেই রোশনির অন্তর কাহিনী এমন নির্মম ! রোশনিই তার ভুবন আলো করে দিয়েছে আর রোশনির প্রদীপের তলায় এমন অন্ধকার!!!
সেদিন দৌড়ে এসেও রোশনিকে ঐ শয়তানদের কবল থেকে উদ্ধার করতে পারল না মৈত্রী।রোশনির আত্মীয়রা দূরদেশে আর পাড়া প্রতিবেশী? তারা মিছে ঝামেলার মধ্যে ঢুকবে না, দূরের থেকে খালি সমালোচনাই করতে লাগলো।মৈত্রীর নিজের পায়ের তলার মাটিই টলোমলো সে কেমন করে রুখবে এত বড়ো অপরাধ!তবুও সে রুখলো, পরের দিন যখন পুলিশ এল সব্বাইকে তুচ্ছ করে একা দাঁড়িয়ে রোশনির স্বামী, শ্বশুর বাড়ির সব অত্যাচারের কথা সোচ্চারে বলে এদের প্রত্যেকের কোমড়ে দড়ি পড়াবার ব্যবস্হা করলো।রোশনিই তো মৈত্রীর ঘনায়মান অন্ধকার জীবনে আলোর রোশনাই ছিল..সেই রোশনাই‘ই তো মৈত্রী কে আবার করে সাহস যোগালো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর,সে আলো খালি রোশনির প্রতি ঘটা অন্যায়কে প্রতিহত করা নয়,মৈত্রীর বিরুদ্ধেও যত অন্যায় তার বিবাহিত জীবনে হয়েছে সেই সব অন্যায়ের পাহাড় ফুঁড়ে উঠে দাঁড়ানো,সে শক্তি ও সে পেল ঐ রোশনির কাছ থেকেই।রোশনির ওপর ঘটা অত্যাচারের সঠিক প্রতিরোধ এবং তীব্র প্রতিবাদে তার নিজের জীবনের হারিয়ে যাওয়া আত্ম বিশ্বাস সে ফিরে পেল তাতে রোশনির চরম ক্ষতি অবশ্য সে আটকাতে পারল না, তবুও শয়তানদের চিহ্নিতকরণ তো হলো এবং ঐ শয়তানগুলো তো শাস্তি পেল!
আজও রোশনির ওপর ঘটা সেই নিষ্ঠুরতার জন্য মৈত্রীর মন যখনই বেদনায় টনটন করে তখন একটা কথাই বারে বারে ঘুরে ফিরে মনে বাজে– প্রবাসজীবনকে পিছনে ফেলে নগরজীবনে প্রবেশ করার সময়ে যে মন্ত্র মৈত্রীর জপ মন্ত্র ছিল নিরন্তর “আত্ম দীপ ভব“.. রোশনি, মৈত্রীর অন্তরের সেই প্রায় নিভে আসা আত্ম–দীপকে নতুন ভাবে প্রজ্জ্বলিত করে নিজেকে সার্থকনামা প্রতিপন্ন করে তুললো,রোশনি আজ তার পাশে নেই বটে, কিন্তু রোশনির জ্বালানো সে দীপ মৈত্রী আর কোনো দমকা হাওয়ায় নিভতে দেবে না। এমনি করেই রোশনির প্রতি তার ভালোবাসা,মমতা, কৃতজ্ঞতার অঞ্জলি সারা জীবন ধরে দিয়ে যাবে….
——————————————–

মধুমিতা মিত্র পরিচিতি
পেশা–স্বপ্ন দর্শন, স্বপ্ন গুলোই বাঁচিয়ে রাখে,
নেশা–আনন্দ চয়ন, জীবন পথের সমস্ত জঞ্জাল, বোঝা, দুঃখ সব দূর করে ফেলে দিয়ে আনন্দ কুড়িয়ে বেড়ানো,
প্রেম-রবীন্দ্রনাথ, উদয়শঙ্কর, উত্তমকুমার। সাম্প্রতিকতম প্রেম শ্রীকৃষ্ণ ..
