Shadow

মৈনাক – জলি চক্রবর্তী শীল

PC: facebook
মৈনাক


জলি চক্রবর্তী শীল

চিত্র ১
….
মৈনাক নিজের ছোট দোকানে একটা বাইকের সার্ভিসিং  আর একটা সাইকেলের মেরামতি করতে ব্যস্ত ছিল |  আজই দুটো ডেলিভারী দিতে হবে | সদ্য সে দোকানটা খুলেছে | মন দিয়ে কাজ না করতে পারলে দাঁড়াবে কি করে ? বাবার  বয়স হচ্ছে যদিও বাবা কোনকালেই তার ওপর নির্ভরশীল হবেন না সেটা সে জানে ‚ তবু বয়সটাকে অস্বীকার করা যায় না |  লেখাপড়া তেমন তার ভালো লাগেনি‚ শেখার প্রয়োজনও মনে হয়নি | হিসাব নিকাশটা ভালোমত রপ্ত করেছে  | কাজ শিখেছে মোটর মেকানিকের |  বাবা কিছু পুঁজি দিয়েছিলেন তাই দিয়েই দোকানটা খেটেখুটে দাঁড় করানোর চেষ্টায় আছে সে | ঠিক সেইসময় কোথা থেকে ছুটতে ছুটতে এল কাৎলা |

‘এই মিনু সর্বনাশ হয়ে গেছে‘

মৈনাকের বন্ধুরা মৈনাককে মিনু বলেই ডাকে | মৈনাকের মধ্যে একটু মেয়েলি ধরণ আছে বলে বন্ধুরা সেই ছোট থেকেই তাকে মিনু বলে ডেকে আসছে  | এই কাৎলাও মৈনাকের ছোটবেলার বন্ধু | এক পাড়াতেই বাস |  মৈনাকের অবশ্য মিনু ডাকটা বেশ ভালো লাগে | একদম আনকমন একটা সম্বোধন | যদিও সে পুরোমাত্রায় পুরুষ  | হাতের কাজ থামিয়ে কাৎলার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে যেন জানতে চায় ‘কি সর্বনাশ্‘ ?

‘মিনু সর্বনাশ হয়ে গেছে| তোর বাবা  |”

বাকিটা শোনার আগেই মৈনাক কাজ ছেড়ে এসে কাৎলাকে চেপে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে‚‘ বাবা‚ কি হয়েছে বাবার ?’

রোগা পাতলা কাৎলা মৈনাকের ঝাঁকুনিতে কেঁপে যায় | এই রোগা চিংড়িমাছের মত চেহারার ছেলের নাম কাৎলা কেন সে এক গবেষণার বিষয়  |

‘আরে তুই তো আমায় মেরে ফেলবি ভাই  |’ কাৎলা কঁকিয়ে ওঠে |

‘বাবার কি হয়েছে কাৎলা ? সিরিয়াস কিছু  ? উদ্বেগের কন্ঠে এক নিঃশ্বাসে প্রশ্নগুলো করে যায় মৈনাক|

‘আরে না‚ সেসব কিছু না‘ |

‘তবে ? এবার বিরক্তি ঝরে পড়ে মৈনাকের গলা দিয়ে‚ ‘ কাজের মাঝে   তুই কি ইয়ার্কি করতে এসেছিস ?’

‘তুই বুঝতে পারছিস না ‚ কি সর্বনাশ হল তোদের | ‘‚ কাৎলা করুণ কন্ঠে বলে ওঠে | বন্ধুকে নিয়ে সে খুবই ভাবিত‚ অথচ ঠিক কি ভাবে কথাটা বলবে সেটাই সে গুছিয়ে উঠতে পারছে না | মৈনাকের বোন তানিয়া তাকে  আজকের বাজারটা একটু করে দিতে বলেছিল‚ সকাল থেকে সময় পায়নি সে‚ তাই একটু বেলার দিকে বাজার করে দিতে গিয়েই শুনে এসেছে ঘটনাটা  |

‘চল‚ যা ভাগ এখান থেকে‚ যখন ঝেড়ে কাশতে পারবি তখন এসে বলবি | আমার এখন একটুও সময় নেই  |’‚ বলে কাৎলাকে দোকান থেকে বার করে দেয়  | তারপর যথারীতি নিজের কাজে ডুবে যায়  | দুপুর পেরিয়ে বিকেল হতে চলল‚ পেটের মধ্যে ইঁদুর গর্ত করে ফেলল‚ কিন্তু বাড়ি থেকে তো ডাক আসলনা  | অন্যদিন তো বোন না যাওয়া অবধি ফোন করে করে উত্ত্যক্ত করে দেয় |  বাড়িতে কি কিছু হল ! সকালে কাৎলার কথা ভুলেই গেছে সে | বোনকে কল করল বটে কিন্তু বোন ফোনটা তুলল না |  মৈনাকের মনে কু ডাকল | সকালে বলা কাৎলার কথাটা মনে পড়ল এতক্ষণে  | কি সর্বনাশের কথা বলছিল ছেলেটা  ?

মোটরবাইকটা ডেলিভারী দিয়েই সে দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে বাড়ির পথ ধরল  | বিকেলের মরা রোদে তেমন কিছু পরিবর্তন তো বাড়ির দরজায় এসেও চোখে পড়ল না মৈনাকের | রোজকার দিনের মতই শান্ত নিঃস্তব্ধ বাড়ি  | বেল বাজাবার আগেই দরজাটা খুলে গেল  | তানি‚ মৈনাকের একমাত্র বোন দরজাটা খুলে দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল  |

‘কতবার তোকে ফোন করলাম ‚ ফোনটা ধরলি না কেন ?’

‘ঘরে আয় দাদা‚ কথা আছে‘‚ বলে তানি নিজের ঘরের দিকে যেতে যায় |

‘কিন্তু আমার যে বড্ড ক্ষিধে পেয়েছে | তুই ভাতটা বাড়‚ আমি হাত–মুখটা ধুয়ে‚ জামাটা বদলে আসছি  |’ বলেই মৈনাক লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে যায়  |

তানি ভাত বেড়ে অপেক্ষা করে দাদার জন্য |

মৈনাক এসে খেতে বসে যায় | লক্ষ্য করে না‚ হাঁড়ির ভাত আজ তলানিতে নেই‚ ডালের বাটিতে ডাল এখনো ভর্তি‚ বড় থালায় গোল গোল আলুভাতেগুলো পাশাপাশি রাখা | সেই কোন সকালে বেরিয়েছে সে‚ পেটে যেন রাক্ষসের ক্ষিধে  | গ্রোগাসে গিলতে থাকে সে  |  ক্ষিধের বোধটা কিছুটা উপশম হলে বলে‚ ‘সকালে কাৎলা দোকানে গেছিল‚ কিসব সর্বনাশের কথা বলে এল‚ কিন্তু আমি তো কোন সর্বনাশের কিছুই দেখছি না | কি হয়েছে বল দেখি  |’

‘বাবা বিয়ে করেছে |’ বলেই তানি চোখ ঢাকে |

‘কি?’ কথাটা শুনে এতটাই অবাক হয় মৈনাক যে গ্রাস করে মুখে ঢোকানো ভাতটা গিলতেই ভুলে যায়  |

‘কাকে জানিস ? তোর জন্য যে মেয়েকে দেখতে গিয়েছিল তাকে |’

ভীষন জোরে বিষম খায় মৈনাক |

‘বিন্দু !!!’

‘হ্যাঁ দাদা বিন্দু‚ যে বিন্দুর ফটো দেখিয়ে বাবা তোকে বিয়েতে রাজী করিয়েছিল দিন কয়েক আগে‚ সেই বিন্দুকেই বাবা বিয়ে করে আনছে  |’

‘মানে ? আমি কিছু বুঝতে পারছি না |’

‘আমরাও কিছু বুঝতে পারিনি | বাবা বাইরে থেকে ফিরে একটাই কথা বললেন যে , “তোদের নতুন মাকে নিয়ে আসব‚ নিজেদের তৈরী রাখিস |”

আজ সকালে বাবা ঘটকের সাথে গিয়েছিল বিন্দুদের বাড়িতে পাকা কথা বলতে | সেখানে তো মৈনাকের সাথে বিন্দুর বিয়ের কথাই হওয়ার কথা ছিল‚ সেখানে কি করে এসব হল মৈনাক কিছুতেই বুঝতে পারে না   | খাবার ফেলে সে হাত ধুয়ে উঠে যায় বাবার ঘরে  | ভেজানো দরজা হাট করে খুলে দেয় সে  | মৈনাকের বাবা তৈরী হয়েই বসেছিলেন  |

‘এসো তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি  | নিশ্চয় খবর পেয়েছো যে বিন্দুকে আমি বিয়ে করছি  | বিয়ের দিনক্ষণ সব ঠিক করেই ফিরেছি আমি  | এবার তোমার প্রশ্ন‚ বিন্দুকে তো আমি তোমার জন্য পছন্দ করেছিলাম‚ তাহলে আমি কেন তাকে বিয়ে করছি   ? তার কারণ তারিণিবাবু তাঁর মেয়ের বিয়ে তোমার সাথে না দিতে চেয়ে আমার সাথে দিয়ে চেয়েছেন  | পঞ্চাশ বছর বয়সেও যে আমি মেয়েদের বাপের কাছে ঈপ্সিত পাত্র এটা জেনে যেমন পুলক বোধ করেছি তেমনি মেয়েটিকে দেখে মুগ্ধ হয়েছি আর বুঝেছি ও মেয়ের জন্য তুমি সঠিক পাত্র নয়  | দেখ  তারিণিবাবুর মতে তুমি সবে মাত্র তোমার কেরিয়ার শুরু করেছ‚ এখনি তুমি দাঁড়াতে পারবে না‚ কিছুটা সময় লাগবে  | তোমাকে সব অবস্থায় আমার ওপরে নির্ভর করতে হবে  | তাই তিনি চান ভায়া মিডিয়া নয়‚ বিন্দু সরাসরি আমার ওপরেই নির্ভরশীল হোক | আর তোমাকে এটাও জানাই তারিণীবাবুর এই সিদ্ধান্তে বিন্দুর কোন আপত্তি নেই  | তোমাদের মাকে যখন আমি হারাই তখন আমি বয়সে তরুণ‚ তবু তোমাদের মুখ চেয়ে বিয়ের কথা ভাবিনি  | তারিণীবাবু বলার আগে পর্যন্তও আমি ভাবিনি  | কিন্তু এখন ভেবে দেখছি তুমি একটা সময় নিজের পায়ে ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে‚ বিয়ে–থা দিয়ে তোমার সংসার হলে সে সংসারে আমি একজন বাড়তি মানুষ  | তোমার বোনের একটা ভালো বিয়ে দেব আমি‚  তারপর আমার জীবনটা ফক্কা  | আমার জীবনে আমি শেষ কিছুদিন অন্তত ভালো ভাবে বেঁচে নিতে চাই  |  তোমাদের কোন অসুবিধে হবে না  | তোমার বোনের বিয়ে দিয়ে তোমার ব্যবস্থা করেই আমি বিয়ের পিঁড়িতে বসব  | শেষ কটা বছর আমাকে আমার মত করে বাঁচতে দাও মৈনাক  |’

সব কথাই বলা হয়ে গেছে‚ আর কি বা শোনার আছে কি বা বলার আছে মৈনাক ভেবে পায় না  | পায়ে পায়ে নিজের ঘরে চলে আসে  | মোবাইল ফোন বেজে যায়‚ কিন্তু ধরার তাগিদ অনুভব করে না মৈনাক  | সমস্ত ক্ষোভ অচেনা ‚ অজানা ছবির বিন্দুর ওপর গিয়ে পড়ে |  মৈনাকের মনে কি একটু একটু করে মেয়েটি নিজের জায়গা করে নিচ্ছিল? তা না হলে মৈনাকের এত রাগ কেন হচ্ছে মেয়েটার ওপর ? কিম্বা নিরেট ক্ষোভ ‚ সেখানে মেয়েটি উপলক্ষ্য মাত্র| দুচোখ অসহায় জলে ভরে ওঠে  | কেন কিছু বাবার বিরুদ্ধে বলতে পারল না সে | কেন নয়? কেন সারাটা জীবন মাথা নিচু করে বাবার কথাকেই শুনে গেল ? আসলে ছোট থেকেই একটা বিশ্বাসে বড় হয়েছে সে‚ বাবা কোন অন্যায় করতে পারেন না  |

চিত্র ২
……….
বস্তা বস্তা আলু‚ ঝাঁকা ঝাঁকা মাছ‚ টন টন ঘি–তেল আসছে | বাড়িটা সেজে উঠেছে নববধূর মত | সামনের মাঠে ব্যবস্থা হয়েছে খাওয়া দাওয়ার  | সেখানেও সাজগোজের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি | মাঠের ঠিক উল্টোদিকের সেন বাড়িটাও সেজে উঠেছে  |  দুদিকের দুই বাড়িতেই থেকে থেকে উঠছে উলুধ্বনি‚ শঙ্খধ্বনি‚ গায়ে হলুদ ‚ নাহ্নীমুখের সাথে  আত্মীয়–স্বজনদের টুকরো –টাকরা কথা–হাসি–কৌতুক–সমালচনা–প্রশংসা  | যেকোন বিয়েবাড়ির এটাই তো স্বাভাবিক দৃশ্য  |

আজ তানিয়ার বিয়ে | এখুনি বিয়েটা না হলেও হত‚ তানি সবেমাত্র বিএ প্রথমবর্ষের ছাত্রী  | বিয়েটা করার তেমন কোন ইচ্ছেও যে তার ছিল তা নয়‚ কিন্তু কথায় আছে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম  | এখানে বিনায়কবাবু হলেন কর্তা‚ সুতরাং তার ইচ্ছেতেই কর্ম  | পাত্র তিনপুরুষের  পুনেনিবাসী‚ ব্যাঙ্কে কর্মরত  | পারিবারিক ধন–সম্পত্তিও কিছু কম না                                                                                                                                                                                                                                                                                            | ছোট পরিবার‚ সংস্কৃতিবান পরিবার‚ তানি সেখানে সুখী থাকবে এতটাই যে ভবিষ্যতে বাবার বাড়িতে ফেরার তেমন কোন প্রয়োজন পড়বে  না |  হিসেব কষেই‚ সমস্ত কিছু খতিয়ে দেখেই এই বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিনায়কবাবু  | তাছাড়া মেয়ের নামে একটা মোটা টাকা তিনি ফিক্সড ডিপোজিটও করে রেখেছেন‚ সময় মত দিয়ে দেবেন  |

বিয়েতে খরচও করছেন তিনি‚ কেউ বলতে পারবে না যে বিনায়কবাবু মেয়ের বিয়েতে কার্পণ্য করছেন  | সেন বাড়িটা ভাড়া নিয়েছেন পাত্রপক্ষের জন্য  | আত্মীয় –স্বজনে ভরপুর বাড়িতে মৈনাকও যথারীতি ব্যস্ত‚ একমাত্র বোনের বিয়ে বলে কথা  | তবে মনটা ভারাক্রান্ত  | এত দ্রুত ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে যে সে ঠিক তাল মেলাতে পারছে না  | বোনটাকে এত দূরে পাঠিয়ে দেওয়াটা মন থেকে মেনে নিতে পারছে না সে  | সেদিন কাৎলা ঠিকই বলেছিল তোদের সর্বনাশ হয়ে গেল |  ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি এমন একটা পরিস্থিতি আসতে পারে| আর টের পেলেও বা কি করত‚ মৈনাক কোনদিন বাবার বিরোধিতা করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না  |  তাও বিন্দু যদি তাকে সমর্থন করত তাও একটা ব্যাপার হত‚ কিন্তু না বিন্দুর সাথে তাকে কথা বলতে বিনায়কবাবুই পাঠিয়েছিলেন‚ সে মেয়ে পরিষ্কার বলে দিয়েছে ‚ ‘তার বাবা–মা যেটা স্থির করবে সেটাই হবে |’ অতএব যা ঘটছে তা ঘটতে দিতে বাধ্য সে  |

সন্ধের লগ্নে বিয়ে হয়ে গেল তানিয়ার  | বিয়ে হয়ে গেলেই মেয়েরা যেন কেমন পাল্টে যায়  | এই তানিকে কেন যেন ভীষণ অপরিচিত লাগছে  মৈনাকের  | গলার কাছে একটা কষ্ট আটকে আছে  | কাল থেকে আর কেউ দেরী হলে ফোন করে জ্বালাবে না |  ফিরলে ফেরো না হলে নয়‚ খেলে খাও‚ না হলে নয়  | ঘুড়ির সুতোর মত সম্পর্কের সুতোগুলো কেমন যেন একটু একটু করে আলগা হয়ে যাচ্ছে  | মৈনাক তখনও জানে না আরও কি অপেক্ষা করছে তার জন্য  |

পরদিন সকালে কন্যাকে বিদায় জানিয়ে বিনায়কবাবু ডেকে পাঠালো মৈনাককে  | বোন চলে যাবার পর সে কেঁদে ফেলতে পারলে ভালো হত‚ কিন্তু ছেলেদের বুক জ্বলে‚ চোখও জ্বলে কিন্তু চট করে সে জ্বলন থেকে ক্ষরণ হয় না‚ বরং ভিতরে ভিতরে গোঙরায়  | মৈনাকেরও তাই  | কিন্তু বাবার ডাক সে উপেক্ষা করতে পারে না‚ সেইভাবে যে তাকে তার বাবা মানুষ করেনি  |  আজ সম্পর্কটা বদলে যাবে তবু মৈনাক তো নিজেকে বদলে নিতে পরে না  | এতদিনের শিক্ষা সে কি এক নিমেষে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে  ! নীরবে গিয়ে দাঁড়ায়  |

‘মৈনাক তুমি আমার প্রথম সন্তান  | কথায় বলে বাবার জুতো যখন  ছেলের পায়ে ফিট হয়ে যায় তখন ছেলেকে বন্ধু করে নিতে হয়  | আমরা হয়ত সেইভাবে বন্ধু হয়ে উঠতে পারিনি‚ কিন্তু তুমি আর তানি আমার গর্ব   | আমার শিক্ষাকে কোনদিন তোমরা ব্যর্থ হতে দেবে না | কিন্তু আমি জানি বিন্দুকে আমার বিয়ে করাটা তোমার জন্য কতটা কষ্টের | তাই আমি চাই না‚ বিন্দু তোমার চোখের সামনে ঘুরে ফিরে বেড়াক | তাই আমার বহুবাজারের বাড়িটা আমি তোমায় লিখে দিয়েছি | দীর্ঘদিন ওপরের ঘরগুলো বন্ধ ছিল‚ সেগুলো খুলে সারিয়ে‚ রং করে দেওয়া হয়েছে | তোমার জন্য নতুন ফার্নিচার কিনে ঘর আমি সাজিয়ে দিয়েছি | নিচের তলায় যে ভাড়াটেরা আছে তাদের পুরো ভাড়াটাই তুমি পাবে  | তোমার গাড়ি সারাবার দোকানটার ভাড়া যতকাল আমি বেঁচে থাকব তুমি পাবে‚ তবে বাবা জানো তো বয়স হচ্ছে কোনদিন না কোনদিন  চলে যাই‚ তাই চেষ্টা করে যত তাড়াতাড়ি পারো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাও‚ আমিও একটা ভালো মেয়ে দেখে তোমার বিয়ে দি | নিশ্চিন্ত থাকো সেখানে বিন্দুর মত ব্যাপার ঘটবে না |’

মৈনাকের চোখ জ্বালা করছে | পায়ের তলার মাটিটা ক্রমে সরে যাচ্ছে | এই বাড়িতে কেটেছে তার শৈশব–কৈশোর‚ যৌবনের কিছু দিন‚ সেখান থেকে তাকে কি সুন্দর উৎপাটিত করে দিচ্ছে তার বাবা |  অথচ কিছু করার নেই | কেন সে অগ্রাহ্য করতে পারছে না বাবার এই প্রস্তাবে ? কেন এত ভীরু সে ? কেন মুখের ওপর কথা বলার সাহস নেই | তবু সে জানতে চায়‚

‘আমাকে কি আজই চলে যেতে হবে ?’

‘আজ সন্ধের লগ্নে আমার বিয়ে‚ আমি চাই না তুমি সেই বিয়ের সাক্ষী হও | অতএব …’

বাকী কথা শোনার আর অবকাশ  রাখে না সে‚ সেই বস্ত্রেই বাড়ির কাগজ আর টুকিটাকি জিনিস নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে  |

চিত্র ৩
………
গঙ্গা এখন আগের থেকেও অনেক দূষিত | এতটা দূষণ সে এখানে থাকতে দেখেনি | অবশ্য মাঝখান থেকে বয়ে গেছে নয় বছর | কম সময় নয়‚ মৈনাক এখন এক ছেলের বাবা‚ গাড়ি সারাবার দোকান একটা ছেড়ে এখন তিনটে | সময় নেই বললেই চলে |  কিন্তু আজ তাকে সময় বের করে আসতে হয়েছে শ্মশানঘাটে | গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে বিন্দু ছোট ছোট দুটো ছেলেকে নিয়ে  ওরা তার ভাই‚ বিনায়কবাবুর এই পক্ষের সন্তান | একটু পরেই পরনের বাহারী শাড়ির রং পালটে নীল নরুণপাড়ের সাদা  শাড়ি হয়ে যাবে | চুল্লীতে পুড়তে বিনায়কবাবুর শরীরটা লাগবে পাক্কা পঁয়তাল্লিশ মিনিট | বিনায়কবাবুর শেষ যাত্রায় জনকয়েক লোক | বেশী লোক চায় নি মৈনাক | মৈনাক যা চাইছে বিন্দু তাই করছে | বিনায়কবাবু কি এমনটাই বলে গেছেন‚ জানে না মৈনাক | শেষ কয়েক বছর মৈনাক বাবার সাথে কোনরকম সম্পর্ক রাখেনি | খবর দু তরফেই পেত কিন্তু কোন তরফ অন্য তরফে নাক গলাতে আসেনি | মুখাগ্নি বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী মৈনাকই করেছে |  না করলেও পারত‚ অভিমান করে দূরে সরে যেত পারত ‚ কিন্তু পারেনি |  শেষ সুতোটাও ছিঁড়ে গেল |

‘মৈনাক‘|

কখন যে গঙ্গার ঘাট থেকে বিন্দু এসে পাশে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করে নি সে |

‘বল বৌমা‘|

হ্যাঁ‚ বাবার স্ত্রী মানেই তো তাদের মা‚  কিন্তু তার থেকে ছোট একটা মেয়েকে কি করে মা বলে‚ নাম ধরেও তো ডাকা যায় না এই সম্পর্ককে | তাই বৌমা|

‘মৈনাক তোমার বাবার বিষয়–সম্পত্তির একটা বন্দোবস্ত করতে হবে তোমাকেই |’

‘সদ্য বাবা মারা গেছে বৌমা‚ এর মধ্যেই তুমি..

কথা শেষ করতে দেয় না বিন্দু‚ ‘আমায়  ভুল বুঝো না | যে গেল সে তো চলে গেল‚ কিন্তু যারা রয়ে গেল তাদেরটা তো ভাবতে হবে | এটা বাস্তব | আর তুমি জানো আমি বাস্তবতাকে প্রাধান্য দি |’

‘ জানি বৈকি‚ চিরদিনই তো সেই ভেবেই চললে বৌমা | সেই ভেবেই তো আমার বাবাকে বিয়ে করা তোমার |’

বিন্দু চুপ করে থাকে|

‘বৌমা‚ বাবার বিষয়–সম্পত্তির কি ব্যবস্থা করে গেছেন আমি দেখে নেব |   আরও বলি‚ বাবা যা দিয়েছেন তার বাইরে আমার কোন প্রাপ্তি নেই | দাবীও  না| তাই তোমাদের জীবনে আমি কোনদিন আসব না | নিশ্চিন্ত থাক | ‘

বিন্দু সাড়া দেয় না | কিন্তু ভীষনভাবে তাকে নিশ্চিন্ত দেখায় |

নদীতে দেহভস্ম ভাসিয়ে দিয়ে  স্নান করে নতুন বস্ত্র পড়ে  মৈনাক এগিয়ে চলে গঙ্গার পাড়ের বাড়ির দিকে সাথে দুই ভাই আর বৌমাকে নিয়ে |  বাড়ির দরজায় তাদের পৌঁছে দিয়ে মৈনাক নিজের বাড়ির পথ ধরতে যায় |

পিছন থেকে ডাক দেয় বিন্দু‚ ‘যে কটা দিন কাজ না হচ্ছে সে কটা দিন বৌমা আর নাতিবাবুকে নিয়ে এ বাড়িতে থাকতে পারতে ‘|

‘না‚ বৌমা এ বাড়ির সাথে সব সম্পর্ক সেদিনই শেষ হয়ে গেছে | আর যে ক্ষীণ সুতোটা ছিল সেটাও তো ছিঁড়ে গেল | তোমরা সাবধানে থেকো | দরকার পড়লে বলবে আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব করার | চলি |’

মনে এখন শ্মশানবৈরাগ্য |  এখন কেন‚ বরাবরই তো তাই |
————————————————

জলি চক্রবর্তী শীল পরিচিতিঃ
পেশাগতভাবে একজন কম্পিউটার অপারেটর একটি  সওদাগরী আপিসে। নেশা বই পড়া এবং কিছু লিখতে চেষ্টা করা। জলির লিখতে ভালো লাগে সেইসব প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে,জীবন যাদের কাছে প্রাত্যহিক লড়াইয়ের নাম। এক টুকরো রুটি বা এক থালা ভাতের কদর যেখানে সবচেয়ে বেশি সেইসব মানুষদের সুখ-দুঃখ-বেদনা-ভালোবাসার দৈনন্দিন গাঁথাই জলির লেখার উপজীব্য।

 

 

 

2 Comments

  • মুনিয়া

    বেশ লাগল। একবারে পড়ে উঠলাম। নাটকিয়তার অভিঘাত বর্জিত সহজ সরল এক রেখায় বয়ে চলা গল্প।

  • Nina

    সুন্দর ঝরঝরে জীবন যাপনের গল্প – বেশ যেন ঝর্ণার মতন – তোর সিগনেচার স্টাইল রে জল খুব ভাল লাগল।

Comments are closed.

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!