Shadow

অন্তর ও বাহির – অমরেন্দ্র কালাপাহাড়

ছবিঃ- ব্রতী ঘোষ
অন্তর বাহির

অমরেন্দ্র কালাপাহাড়

যাদের জন্য নিজে না খেয়ে দেয়ে ভবিষ্যতের জন্য সযত্নে গুছিয়ে রেখে তিল তিল করে তিলোত্তমা করা তারা যদি বাস্তব না বোঝে  তবে সে কেন  এমন কৃচ্ছসাধন করবে ! ভাবতে থাকে জগমোহন,না অনেক হয়েছে আর না ! পাড়ায় বেরোলে কান পাতা দায়। তার নাম নাকি নিলে তাদের সারাদিনটা বৃথা যাবে! জগমোহন ভাবে যারা ওই উল্টোপাল্টা বলছে নানান গল্প বানিয়ে আসলে ওরা হলো এক একটা চার্বাকের শিষ্য। খেয়েদেয়ে ফুর্তি করে জীবনটা কাটিয়ে যায়। আরে বুঝলি না এমন একটা দিন অনেক সময় আসে যখন সত্যি কোন কিছু করার উপায় থাকে না তখন ওই গচ্ছিত ধন তো স্বর্গের চাঁদ আনে, তাই কিনা! একথা বলেছিল সে সৌদামিনীকে।

 জগমোহন বারবার বলে ওইসব হাভাতেদের কথা বলো না, তার প্রচন্ড দুর্দিনে কি ওরা তোমাকে খাওয়াবে না পরাবে? তবে অত বড়ো বড়ো কথা বলা কেন ? কিপ্টেমি করেছি বেশ করেছি। আমি তো কারো পাকা ধানে মই দিইনি ? আমি আমার আয়ের কিছু অংশ না খেয়ে দেয়ে আমার ছেলে নাতি নাতনিদের জন্য রেখে যাচ্ছি তাতে পাড়া পড়শির কি যায় আসে!

 আসলে জগমোহনের কৃপণতা নিয়ে বাজারে রসালো আলোচনা স্ত্রী সৌদামিনীরও ভালো লাগে না। কদিন ধরে কলেজে পড়া একমাত্র সন্তান হৃদয়হরণ একটা স্মার্টফোনের জন্য বারবার তাগাদা লাগাচ্ছে কিন্তু জগমোহন কথাটি কানে তুলছে না। বলছিল সৌদামিনীকে,‘স্মার্ট ফোন কিনে দেওয়া মানে মাসে মাসে একগাদা টাকা খসানো! তার চেয়ে বরং ওকে একটা লুডুর কোর্ট কিনে দেবো বেশ মজাসে খেলবে,পয়সা খরচ হবে না,মনও ভালো থাকবে।’ 

ফোনের কথা হৃদয়হরণ মা সৌদামিনীকে বলেছিল। জানতো তার বাবা কোনদিন অহেতুক খরচ করবে না !

কিন্তু তার সহপাঠীরা জানে সে বিশাল ধনীর ছেলে অথচ তার কিনা একটা স্মার্টফোন নেই !লুডুর কোর্টের কথা কলেজ পড়ুয়া সন্তান হৃদয়হরণকে বলতে পারেনি সৌদামিনী। বলেছিল,‘বাবার একটু টাকার সমস্যা আছে,তাছাড়া তোর পড়ার জন্য কতো গন্ডা গন্ডা টাকা যাচ্ছে বলতো? যদি না শুনিস আমার গলার হারটা বন্ধক রেখে একটা কিনে নিস।’  

হৃদয় বলেছিল তা হয় না মা,তোমার শখের জিনিস। সে কিছুতেই বন্ধক দিতে পারবে না। তাছাড়া সে কিভাবে ওটা ছাড়িয়ে দেবে!আর বাবা জানলে আস্ত রাখবে না। হৃদয় মাকে বলেছিল,‘জানো মা তার এই স্মার্টফোন নেই বলে সবাই খুব হাসাহাসি করে! খুবই খারাপ লাগে।সৌদামিনী বলে,‘দেখি তোর মামাকে বলব যদি ভাগ্নের জন্য একটা ফোন কিনে দেয় কিনা!’ 

 সৌদামিনী  স্বামীকে বলে সে খোকা আজ বাপের বাড়ি যাবে,সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরবে। জগমোহন বলে তার একার জন্য আবার রান্নাবান্না? দরকার নেই সেও তাদের সঙ্গে যাবে,অন্তত একবেলা রান্নার খরচ তো বেঁচে যাবে ! আর শ্বশুর বাড়িতে একটু তৃপ্তি ভরে নানা পদ খেয়ে আসতে পারবে। সৌদামিনী বলে,‘তুমি গেলে কিন্তু কিছু মিষ্টি নিয়ে যেতে হয়,তাতেও তো খরচ আছে?’ 

জগমোহন বলে,‘মিষ্টির খরচা না করে তুমি বাড়ির কিছু সব্জি নিয়ে নাওসৌদামিনী বলে কিছু নিতে হবে না,সে একটা কিছু বলে ম্যানেজ করবে।

শ্বশুরবাড়ির হরেক পদের খাবারে বেজায় খুশি জগমোহন। ইচ্ছে করছিল কয়েকদিন কাটিয়ে যায়। কিন্তু সৌদামিনী তাড়া দেয় খোকার কলেজ আছে,অগত্যা বেরিয়ে পড়া। সৌদামিনীর বড় ভাই ভাগ্নেকে বলে সে পুরো দশ হাজার টাকা দিচ্ছে একটা ভালো দেখে মোবাইল কিনে নিস। পড়ার ফাঁকি দিচ্ছিস শুনলে মোবাইল নিয়ে চলে আসব। দশ হাজার টাকার মোবাইল ফোন শুনে জগমোহনের চক্ষু চড়কগাছ! কি বলে রে? ওই টাকায় পাঁচ বিঘা জমি আগাম নেওয়া যায়,গ্রামের চারপাঁচ কাঠা জমি কেনা যায়! জগমোহন হৃদয়কে বলে টাকাটা তাকে দিতে। পুজোর অফার এলে কম টাকায় তার ভালো মোবাইল কিনে দেবে। এই কটা মাস ওই টাকাটা সুদের কারবারে খাটালে মোবাইল রিচার্জের কিছু টাকা হয়ে যাবে একথা শুনে হৃদয়ের মামা বলে তোমরা যা করার করবে একটা মোবাইল দেওয়ার কথা ছিল সে সেটা দিয়ে দিল।

শাশুড়ি ঠাকুরণ বেশ কিছু কাঁচকলা এক ব্যাগ আনাজ দেয় সঙ্গে কয়েকটি নারকেলও। বাড়ি ফিরতে ফিরতে জগমোহন বলে তোমরা বাড়ি যাও সে একটু হাট হয়ে যাবে। অত সবজি আনাজ কি এই মাগ্গিগন্ডার বাজারে খাওয়া যায়! পাইকারিকে বিক্রি করে বাড়ি ফিরবে। বেশ কিছু টাকাও রোজগার হবে। সৌদামিনী হৃদয় হেসেই খুন! বলে তোমার যা ইচ্ছে তাই করো! সৌদামিনীর খুব খারাপ লাগে যখন আত্মীয় পরিজন এলে বা মাঝে মাঝে নিজের পুকুরে বড় মাছটা ধরলে ভয়ে ওকে দেওয়া যায় না! না জানি জেনে ফেলে তা ঘর পুকুর থেকে ধরা হয়েছে! তাই প্রায় দিন তাকে খেতে দেওয়া একলা,যাতে নতুন ঝামেলা না হয়!

সবে শ্বশুর বাড়ির আনাজ নারকেল বেচে বাড়িতে হাজির জগমোহন হঠাৎ পাঁচ ছজন ক্লাবের ছেলে পুজোর চাঁদার জন্য বিল নিয়ে হাজির। হাজার টাকার বিল চায় তারা পুজোর জন্য। কিন্তু উনি দশ টাকার বেশি দিতে নারাজ। রেগে ছেলেরা চলে যেতে উদ্যত হলে শেষ পর্যন্ত একশো টাকায় দিতে সম্মত হয় কিন্তু ছেলেরা না নিয়ে হুমকি দিয়ে চলে যায়। অগত্যা সৌদামিনী স্বামীর হাতে পায়ে ধরে সেই এক হাজার টাকা ক্লাবে দিয়ে আসে। রাতে ঘুম আসছিল না জগমোহনের! মনে ভাবে এমন এক উটকো ঝামেলায় কড়কড়ে এক হাজার টাকা জলে চলে গেল! চিন্তায় শরীর খুব খারাপ হলে পর অগত্যা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হ্যাঁ, একটি মিনি স্টোক হয়ে গেছে জগমোহনের! যাত্রায় বেঁচে গেলেও তার চিকিৎসার জন্য বোম্বে কিংবা ব্যাঙ্গালোরে নিয়ে যাওয়া খুবই প্রয়োজন। ছেলে হৃদয় স্ত্রী সৌদামিনী বলে তোমার টাকার অভাব নেই নিজের জীবন বাঁচাতে কেন কিপ্টেমি করছো? অবিলম্বে চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়া হোক। জগমোহন বলে তাহলে তার মরার আগে এই জগৎ থেকেই পটল তুলবে! তাই হসপিটালের মেলা ঔষধে রোগ সারাতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা! রেগেমেগে ওকে হসপিটালে রেখে বাড়ি চলে আসে ওরা। কয়েকদিন আর যোগাযোগ করেনি। হঠাৎ খুবই সকালে হসপিটাল থেকে খবর আসে জগমোহনের ব্রেন ডেথ হয়ে গেছে। দ্রুত তাদেরকে হসপিটালে যোগাযোগ করতে বলা হয়। তবে আনুষাঙ্গিক মৃত্যু ঘোষণা করতে কয়েক ঘন্টা বাকি। জানতে পারে হসপিটাল সুপারের কাছে উনি একটি বন্ডে সই করে দিয়ে গেছেন। ওর মৃত্যুর পর যেন ওর দেহটি না পুড়িয়ে হসপিটালে দান করা হয়,যাতে ওর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অন্যদের কাজে লাগে। এজন্য নিকট আত্মীয়ের সম্মতি এক্ষেত্রে খুবই দরকার। ইতিমধ্যেই উনি একটি উইল করে হাসপাতাল সুপারের কাছেও রেখে গেছেন। উইল পড়ে ছেলে হৃদয় স্ত্রী সৌদামিনী হতবাক! তার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য নাকি তিনকোটি! যার অর্ধেক ছেলে স্ত্রী সমান ভাগে পাবে বাকি অর্ধেক যাবে গ্রামের একটি নব বিদ্যালয় নির্মাণ অনাথ আশ্রম নির্মাণে। তার দেহের দুটি চোখ দুজন দৃষ্টি পাবে,হৃৎপিণ্ড কিডনি অন্যদের কাজে লাগবে। বাকি দেহটা ডাক্তারি শাস্ত্রে কাজে লাগবে। শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের জন্য একটা পয়সাও যেন খরচ না করা হয়! তাহলে তার আত্মা অতৃপ্ত থাকবে! চুক্তিপত্রে সই করে দেহ হাসপাতালে দান করে মা ছেলে বাড়ি ফিরে আসে। ভাবতে থাকে একজন রক্তমাংসের কৃপণ মানুষের হৃদয় এমন হতে পারে! তার সারা জীবনের তিল তিল করে গড়ে তোলা এত অমূল্য সম্পদ কেমন করে সহজেই সবাইকে সুন্দর করে বন্টন করে দিয়ে জগতের মায়া ত্যাগ করে চলে গেল! ভাবছিল ওরা,সত্যিই কৃপণের মতো দাতা বোধ হয় এই পৃথিবীতে হয় না!
***************************************
অমরেন্দ্র কালাপাহাড়

কবি ও গল্পকার অমরেন্দ্র কালাপাহাড় পরিচিতি: ১৩৬৬ বঙ্গাব্দের ১০ই আশ্বিন দক্ষিণ ২৪পরগনা জেলার কুলপি থানার তারাচাঁদপুর গ্ৰামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম। অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক,এম এ বিএড। শৈশবে টুকিটাকি লেখা হলেও ২০১৮ থেকে পঞ্চাশের বেশি সাহিত্য পত্রিকা ও ফেসবুকে নিয়মিত লেখালেখি। বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ-খোলা আকাশ (২০২০)।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!