
অলিভার
মণি ফকির
আজ আরেকটা পার্টি এসেছে। চট করে রেজিস্টার টা দেখে নিল গদাই। পরক্ষণেই মন টা খারাপ হয়ে গেল । না আজও হলনা। আদৌ কি কখনো হবে ?
গেট খোলা। দারোয়ান কোথাও গায়েব। এই সুযোগে টুক করে বেড়িয়ে পড়ল সে। কয়েক পা এগোলেই নদী। কি একটা বেশ নাম? অত ছাই মনেও নেই। ও একেকদিন ইচ্ছে মত একটা নতুন নাম দিয়ে দেয়। আজ নদীর নাম রাবেয়া। ওর দিদির নাম। বড্ড ভালোবাসত। সে বার প্রচণ্ড ঝড় এল, তারপর আর…যাক গে।
আম গাছ তলায় টুক করে বসে পড়ল সে। বর্ষার সময়; হাবু দা পই পই করে এদিকটায় আসতে মানা করেছে। যত সাপ খোপের আড্ডা। আর তাছাড়া নদী ফুলে ফেঁপে ওঠে। ওর অবশ্য সে ভয় নেই। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেয় পার্টি বেরোলো কিনা। গেট বন্ধ হওয়ার আগেই ঢুকতে হবে।
দূর থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। আজ ঈদ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ওর ভালো নাম আলমগীর। কাউকে আর বলেনা। কায়দা করে গদাই করে নিয়েছে। আসলে কেউ কাফের ঘরে তুলতে চায়না তো।
বর্ষার সময় এই নদীপাড়ে অদ্ভুত জংলী একটা ফুল ফোটে। হলুদ কালো মেশানো। কেউ নাম জানেনা। অযত্নে বড় হয়, মিষ্টি গন্ধে ভরিয়ে রাখে। ও নাম দিয়েছে অলিভার।
দীপু সার একবার গল্প বলেছিলেন অলিভার এর। এক অনাথ আশ্রমে বড় হয়ে ওঠা মানুষের লড়াইয়ের গল্প। সেই থেকে অলিভার ওর হিরো। আচ্ছা ও কি পারেনা, একজন অলিভার হয়ে উঠতে। সবাই এসে খালি ছোট বাচ্চা খোঁজে। ওর আর কি দোষ। একটু বড় বলে কি একটা বাড়ি, পরিবার পেতে নেই। অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে।
হাঁটতে হাঁটতে নদীর খুব কাছে চলে এসেছে। সেবার মেলায় এক পীর বাবা এসেছিলেন। তার মুখে শুনেছিল মানুষ মরে গিয়ে আবার জন্মায়। তাহলে তো একটা চান্স আছে। ছোট বাচ্চা হলে তো ঠিক কেউ এসে নেবেই। নদীর দিকে অনেকটা এগিয়ে গেসল। হঠাৎ পায়ের নীচের মাটি সরে গেল। আর তারপর পানি তে তলিয়ে যেতে যেতে দিদি রাবেয়া কে দেখতে পেল,হাসি হাসি মুখে। ওর আর ভয় করছেনা। আব্বু আম্মি ও কাছেই হবে কোথাও।
..…..………………………….
দিন দুয়েক পর কাগজে ছোট্ট করে বেরল,উমেদপুর গাঁয়ের অনাথ আশ্রম থেকে একটি বছর দশেক এর বাচ্চা নিখোঁজ। শেষ যখন দেখা যায়,পরনে ছিল হলুদ কালো জামা।
…………………….
এর পর অনেক দিন কেটে গেছে। বছর পেরিয়ে ফের বর্ষা এসেছে। কেউ জানেনা আলমগীর,নদীপাড়ে “অলিভার” হয়ে ফুটে আছে। হলুদ কালো ওর বড় প্রিয় রঙ ছিল যে। এবারে বর্ষায় নদীর নাম আমিনা। ওর মায়ের নাম।
……………………………………………………………

মণি ফকিরের জন্ম শিল্পনগরী বার্ণপুরে। সাহিত চর্চার অভ্যাস ছাত্র জীবন থেকেই। অনুপ্রেরণা মা ও মামার কাছ থেকে। প্রথম কবিতার বই *মণি ফকিরের পদাবলী* প্রকাশিত হয় ২০১৮ পূজোয়। গল্পকারের মূল বৈশিষ্ট্য তার গল্প বোনার ও বলার সাবলীল ধরন। গল্পের শেষে কিছু না বলা কথার প্রচ্ছন্ন ঈঙ্গিত মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।।
