
**শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি**
কঙ্কনা সেন
ঘন কালো মেঘের আস্তরণ সরিয়ে স্বচ্ছ নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসিয়ে প্রকৃতি রানী এখন শরত–শোভায় সেজে ওঠে। মাঠের ধারে ,নদী তীরে আপনা আপনিই ফুটে ওঠে কাশফুল।সকালে ঘাসের আগায় শিশির বিন্দু ,ঝরে পড়া শিউলি,শালুক,পদ্ম যেন বলে ওঠে–“এসেছে শরৎ /হিমের পরশ/লেগেছে হাওয়ার পরে,,,,,,”সে ছবি তো আপামর বাঙালির মনের পটে চিরস্থায়ী করে রেখেছেন রবীন্দ্রনাথ।আর শারদ প্রকৃতির মনোহরণ এই রূপের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদোৎসব দুর্গাপুজো।
মা যে আসছেন সবার আগে প্রকৃতি –মা জানান দেন।পথের দুধারে বিস্তীর্ণ ভূমি জুড়ে আলো করা কাশ প্রকৃত অর্থে পরিপূর্ণ প্রকাশ বা বিকাশ।আমাদের অন্তরের সব গ্লানি ,ক্ষুদ্রতা ধুয়ে মুছে পবিত্র শুচি শুভ্রতায় ফুটিয়ে তোলাই মানব জীবনের সার্থকতা।শিউলি তার গৈরিক বৃন্তে প্রস্ফুটিত শুভ্রতায় সেই শিক্ষায় দেয় নীরবে।
তাই শুধুমাত্র বাহ্যিক আড়ম্বর নয়,অন্তর–ভূমিকে জাগ্রত করতে হবে।চিদাকাশের বেদীতলে তার আরাধনা।মুন্ডক উপনিষদে (২|২|১১)আছে “ব্রহ্মৈবেদং বিশ্বমিদং বরিষ্ঠম“—এই জগৎ শ্রেষ্ঠতম ব্রহ্ম।পূজার আসন শুদ্ধির মন্ত্রে পৃথিবী দেবীরূপে সম্বোধিতা।দেবী সূক্তের শেষে আছে যে ব্রহ্মময়ী দেবী পৃথিবী ও আকাশের অতীত হলেও পরিদৃশ্যমান বিশ্বরূপ ধারণ করে আছেন।
একদিকে তিনি অসুর দলনী চন্ডী যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে খড়্গ তোলেন আবার তিনিই মমতাময়ী মা যিনি আঁচল দিয়ে আমাদের সব দুঃখ কষ্ট মুছে দেন।মহালয়ার ভোরে সুরের আবাহনেই তার আসার সুরটি গ্রথিত হয়ে যায়।পিতৃপক্ষের সমাপনে দেবীপক্ষ আমাদের একত্রিত হতে শেখায়।মালিন্য ,সঙ্কীর্ণতা মুছে অন্তর্জগত জাগরিত করে।
“”দেহি সৌভাগ্যমারোগ্যম দেহি দেবি পরং সুখম্
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি“—-রূপ বলতে শুধুমাত্র বাহ্যিক নশ্বর রূপ নয়।মনের সাত্ত্বিক ও নির্মল রূপের কামনা।কান্ত কবির নিবেদনে–“তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে“।
ধনং দেহি—ফিক্স ডিপোজিট বা ব্যাঙ্ক ব্যালান্স নয়।ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মতে বিবেক বৈরাগ্য আর সচ্চিদানন্দ– ই হল আসল ধন।
যশো দেহি—লোকের সস্তা স্তুতি ,করতালি নয়।আমি মায়ের সন্তান ,এই পরিচয়ই শ্রেষ্ঠ যশ।পৃথিবীতে এসে আমি কী করলাম মানুষ তথা সমাজের জন্য?
দ্বিষো জহি—শত্রু বলতে আমরা শুধু চারপাশের অপছন্দের চরিত্রগুলোকেই বুঝি।তাই না?কিন্তু তা মোটেই নয়।পরম শত্রু বসে আছে নিজেরই অন্তরে লোকচক্ষুর অন্তরালে।কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্য।দুর্গাপুজোয় এই অসুরগুলোকেই বধ করতে হয়।মহিষাসুর তো রূপক মাত্র।গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন“উদ্ধরেদাত্মনাত্মানন্ নাত্মানমবসাদয়েৎ/আত্মৈব হ্যাত্মনো বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ“(৬/৫)।মানুষ নিজেই নিজের বন্ধু আবার নিজেই নিজের শত্রু।তাহলে শত্রুকে বাইরে খুঁজতে যাওয়া কেন??
অর্গলা স্তোত্রে “রূপং দেহি“ধ্রুবপদটি মোট চব্বিশবার ফিরে ফিরে এসেছে।অর্গল অর্থাৎ যা রোধ করে।চন্ডীপাঠের আগে এই স্তোত্র পড়লে দেবী মাহাত্ম্যের রুদ্ধ দরজা খুলে যায়।তাই মায়ের কাছে জাগতিক বা বাহ্যিক প্রতিপত্তি নয়,অন্তরের সম্পদ প্রার্থনা করব।কামনা যখন প্রার্থনা হয়ে ওঠে তখনই তা সুন্দর সাত্ত্বিকতার প্রতিমূর্তি হয় যায়।
মা দুর্গা সুখদা মোক্ষদা সদা।তিনি আমাদের সুখ দুঃখ নিদ্রা জাগরণ শ্রদ্ধা বুদ্ধি শক্তি সৃষ্টি লজ্জা ভয় শান্তি স্বস্তি সবকিছু।তাই উদার কণ্ঠে বলি— “দেবিপ্রপন্নার্তি হরে প্রসীদ
প্রসীদ মাতর্জগতোখিলস্য।
প্রসীদ বিশ্বেশ্বরি পাহি বিশ্বং
তমীশ্বরী দেবি চরাচরস্য“।।
হে আশ্রিতের দুঃখহারিণী দেবি,প্রসন্না হও।নিখিল জগতের মা তুমি প্রসন্না হয়ে বিশ্বকে পালন করো।
তুমি নিখিল জগতের স্থাবর জঙ্গম সকলের ঈশ্বরী।
তাহলে আর দ্বিধা করব কেন? নিখিলের অধীশ্বরী যে মা তাঁর আদরে ,আঁচলের ছত্রছায়ায় থেকে আমরা প্রত্যেকেই তো নতুন করে মানবিকতা,সাত্ত্বিকতার জাগরণ ঘটাতেই পারি।বেদান্ত বলছেন তোমার মধ্যেই অসীম শক্তি লুকিয়ে আছে।আমরা সেই অসীম শক্তিকে ভালোবাসা ,সেবা ,শুভবুদ্ধি দিয়ে এই সুন্দর পৃথিবীটাকে আরো আরো সুন্দর করতে পারি।
শুভমস্তু।
———————————————————————————————————————————
**আজ মহালয়া**
কঙ্কনা সেন
ভোর হল রোজকার মতোই আজও
তবু এ যেন অন্য ভোর।
বীরেন ভদ্রের জলদ গম্ভীর কণ্ঠস্বর যে ফিরিয়ে দেয়
শিউলি-শৈশব।
মায়ের বুকের ওম মেখে শুনেছি স্তোত্র পাঠ
শিখেছি দেবীপক্ষের উদ্বোধনী।
পিতৃপুরুষের শুধু নিবিড় আকাঙ্ক্ষা
উত্তর পুরুষের হাতে জলটুকু পাওয়া
পঞ্চভূতেই সৃষ্টি আর তাতেই যে লয়।
অপ্রয়োজন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আর
সাবেকি ধারণার বিরোধে
আধুনিকতার কচকচি
যাঁদের রক্ত বয়ে চলেছি ধমনীতে
তাঁরা থাকুক লোকচক্ষুর অন্তরালে
এভাবেই বহমান
শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসায় থাকুক চির স্মরণ।
—————————————————-

কঙ্কনা সেন পরিচিতি
রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম এ। ছোট থেকেই কবিতার প্রতি ভালোবাসা। বিশ্বাস মানবতায়। পেশা – শিক্ষকতা।
