
তুমি রবে নীরবে
অজন্তা প্রবাহিতা
(খোলা চিঠি )
ঠিকানা
নীলিমা সান্যাল
অমরাবতী
আকাশবাড়ি
১৪/৪/২০২৬
প্রিয় নীলিমা,
আজ পয়লা বৈশাখ। মেঘ পিয়নের হাতে এই চিঠিখানি পাঠালাম তোমার ঠিকানায়। জানি, ও ঠিক খুঁজে নেবে তোমার সেই মেঘের সাদা বাড়ি। শুভ নববর্ষ ।
অনেকদিন কথা হয় না। কাজের চাপে, জগৎ–সংসারের দায় মেলাতে গিয়ে মাঝে মাঝে মাথা তোলার সময় পাই না। রাগ করো না! তুমি তো জানো, আমার এই জীর্ণ কাঁধে কত মানুষের দায়িত্ব। সেই পাহাড়প্রমাণ ভার অস্বীকার করার সাধ্য আমার নেই।
মনে পড়ে, সেই যে অনেকটা পথ একসাথে হাঁটব বলে হাতটা ধরেছিলাম? মাঝপথে তুমি হঠাৎ আঙুলগুলো আলগা করে দিলে। আমি একা রয়ে গেলাম এই জনসমুদ্রে। তোমার যাওয়ার পর শুধু এই বাড়িটাই নিস্তব্ধ হয়নি, আমার ভেতরটাও যেন এক গভীর অরণ্যের মতো নির্জন হয়ে গেছে। অনেকেই আসে সহমর্মিতার প্রলেপ দিতে, কিন্তু তারা কি জানে—আমার মনের আলমারির চাবিটা তুমি তোমার আঁচলে বেঁধে নিয়ে গেছ? সেই হৃদয়ের পাসওয়ার্ড হ্যাক করার সাধ্য আর কারোর নেই।
সারাদিন অফিসে বকবক করে যখন দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে চোখ বুজি, তখন দেখি তুমি সামনে দাঁড়িয়ে বলছো— “ব্যস, আর কথা নয়, এবার নিজেকে একটু বিশ্রাম দাও।”
আমার কি বিশ্রামের সুখ আছে নীলিমা? সংসারের যেদিকেই তাকাই, শুধু ‘নাই‘ আর ‘নাই‘-এর হাহাকার। কিন্তু এই সহস্র অভাবের মাঝেও একটি মাত্র ‘আছে’ আমার পরম প্রাপ্তি—আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে তোমার অস্তিত্ব। আমি জানি তুমি আছো, এখানেই আছো। তাই তো আজ গড়িয়াহাটের মোড়ে সেই নীল শাড়িটার দিকে চোখ পড়তেই শুনতে পেলাম তোমার সেই চেনা কণ্ঠস্বর— “, নববর্ষে সোমা–রূপা আর নাতনিদের জন্য এবার কেনাকাটা করলে না?”
“তুমি কী নেবে?”—এই প্রশ্নে তুমি বরাবরের মতোই নীরব। শুধু দু’টি হাত বাড়িয়ে দিলে। জানি বন্ধু, জানি, তোমার ওই হাত দু–খানিই আমার চিরকালের আশ্রয়। ওই স্পর্শেই আমি সব জাগতিক ব্যথা–বেদনা ভুলে থাকি। নিঃশব্দতার মধ্যেও যে এক গভীর সংগীত আছে, সেই সুর আমার কান ছুঁয়ে মনপ্রাণ জুড়িয়ে দেয়।
দেখা আমাদের হবেই। হয়তো নীল দিগন্তের ওপারে, নয়তো শরতের সবুজ ঘাসে ভোরের শিশির বিন্দু হয়ে। সেদিন আমার সেই প্রিয় ডায়েরিটা আমি সাথে করে নিয়ে আসব—কথা দিলাম।
এক আকাশ ভালোবাসা নিও। ভালো থেকো নীলিমা।
ইতি,
তোমার দেব
—————————————————–

অজন্তা প্রবাহিতাঃ
লেখক পরিচিতিঃ আসামের ডিব্রুগড় শহরে জন্ম। স্কুলিং আসামের তৈলনগরী ডিগবয়ে। উচ্চমাধ্যমিকের পরে উচ্চশিক্ষার জন্য স্বপ্নের শান্তিনিকেতনে পাড়ি। সেখান থেকে অর্থনীতি নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী। বিভিন্ন পত্রিকা ও সংকলনে লেখালেখি করেন। বন্যপ্রাণী ও পাখী সংরক্ষণের চেষ্টায় নিকটতম বন্ধুদের সাথে www.lensinwoods com নামে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংরক্ষণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। জীবনের লক্ষ্য,নিজের কাজের সাহায্যে যেন পৃথিবীর বুকে নিজের একটা আঁচড় কেটে যেতে পারেন।
