Shadow

দেবী – অঞ্জন নন্দী

pc.-আত্মার-বাণী
দেবী

অঞ্জন নন্দী

এয়ার ইন্ডিয়ার এয়ারবাসের চাকা যখন রানওয়ে স্পর্শ করল, ব্যাঙ্গালুরুর আকাশে তখন রাত নেমেছে।

বিমানের দরজা খোলার আগেই কিছু অসভ্য যাত্রী ওভারহেড লাগেজ নামিয়ে হুড়োহুড়ি শুরু করল, ঠিক তখুনি মিলুর কানে এলো অস্ফুট ক্রন্দন

বাবা…  বাবাগো….

দুসিট সামনে নজরে এলো এক কিশোরীর যন্ত্রণাময় মুখ, এক হাত ধরে আছে পাশের ভদ্রলোকের হাত, আরেকটি হাত বুকের ওপর চেপে বসা। ভদ্রলোক নিশ্চয় তার বাবা, অসহায় ভাবে মেয়ের মাথায় হাত বুলাচ্ছেন।

এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে টোল রোড ধরে বুমাসান্ড্রা এলাকায় NH complex এর পাশে একটা লজে উঠলো মিলু। লজগুলো মধ্যবিত্তের প্রবাসী সংসার বলা যায়।

পরদিন সকাল থেকে কার্ডিয়াক হাসপাতালে ছোটাছুটি কতো যে পরীক্ষারক্ত,ইসিজি,ইকো। সন্ধ্যায় কেবিনে ভর্তি হলো। পরের সকালে ক্যাথ ল্যাব এনজিওগ্রাম। ছোট্টখাট্টো নার্সগুলো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে,বেশকটা সুঁ এর খোঁচা দিলো। এক তরুণ ডাক্তার এসেই বললেন,গুড ইভিনিং। সবকিছু চেক করার পর এলেন ডাক্তার শ্রীকান্ত। মিলুকে দেখেই হাসলেন

এই নিয়ে কবার হলো মি. নন্দী?’ তারপর মিলুর সাথে গল্প করতে করতে হাতের রগ কেটে কাজ শুরু করে দিলেন। অপটিকাল ফাইবারের কব্জি থেকে হাত বেয়ে উপরে উঠে যাওয়া,হার্টে ওষুধের ক্রিয়া,মিলু সবই টের পাচ্ছিলো। এটা তার জীবনে চতুর্থ এনজিওগ্রাম,তাই তেমন ভয় পায় না বরং ফিজিক্সের ছাত্র বলে মনিটরে নিজের হার্টের কর্মকাণ্ড দেখতে ভালোই লাগে। ডাঃ শ্রীকান্তের চিন্তিত মুখ বলে দিচ্ছিল, রিপোর্ট ভালো হবে না। কাজ শেষ, চাদরে মুড়িয়ে স্ট্রেচার ঠেলে করিডোরে এনে রাখলো মিলুকে, নিজেকে লাশ মনে হলো ওর। করিডোরে আরেকটা স্ট্রেচার রাখা। সেখানে সফেদ চাদরের চেয়েও সাদা, বিমানের সেই কিশোরীর মুখ। হাত বাড়ালেই তার হাত ছোঁয়া যায়, মন বাড়ালে মন পাওয়া যায় কি?

দুদিন পর, ডাঃ শেঠির ওয়েটিং রুমে আবার দেখা। কয়েকজন রুগী তীর্থের কাকের মতো বসে আছে,কখন ডাক আসে। সহকারী এসে ডাকলো, ‘পেশেন্ট দেবী সেন

আজ তার নামটা জানা হলো

প্রায় কুড়ি মিনিট পর চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলো দেবী। বিষন্নতার প্রতিমুখ। আরও কিছু সময় পরে ওর বাবা বেরোলেন। চোখের জলে তার গাল ভেজা। 

ডাক্তার শেঠির চেম্বারে মিলুর ডাক পড়লো, ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পেলো, নার্স কাউকে ফিসফিস করে বলছে

‘Not more than a year, her condition is critical. ‘

মিলু আজ ফিরে যাচ্ছে নিজ শহরে, আপাতত চিকিৎসা শেষ। হাসপাতালের আনাচেকানাচে  অনেক খুঁজেও, সে দেবীর দর্শন পেলো না।
——————————————

লেখক: শিক্ষাবিদ কথাসাহিত্যিক।
বর্তমান ঠিকানা : ডালাস, আমেরিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!