Shadow

আমরা মায়ের মা আমাদের – রূপা মুখোপাধ্যায়

PC Sangbad Pratidin

আমরা মায়ের মা আমাদের 

রূপা মুখোপাধ্যায়

 খুব নগন্য এক মানুষের নিজস্ব অনুভব–    

মানুষ তার জৈবিক বা মানসিকভাবে সারা জীবন ব্যস্ত থাকে। ছোট থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া অবধি একরকম তাগিদ। সাংসারিক জীবনে অন্যরকম ব্যস্ততা। সংসারের চাপে পড়ে তার নিজস্ব ভাললাগা–মন্দলাগা কোথায় হারিয়ে যায় অপূর্ণ রয়ে যায় ছোটছোট আশা আকাঙ্ক্ষা। কেজো জীবনে যা কেবল মূল্যহীন ও হাস্যকর। তার মধ্যে দিয়েই এগিয়ে যায় সামনের কান্না–হাসি দোলদোলানো দিনগুলিতে । শিশু, বালিকা, কিশোরী, যুবতী থেকে বৃদ্ধা বয়সের দ্বারে পৌঁছে খানিক চিন্তা ভাবনার সময় পায়। চারিপাশের গতির কাছে খানিক স্থবির খানিক বেমানান। তখন তৈরী হয় এক নিজস্ব জগত, একান্ত নিরিবিলি, শ্রবণ–মননের চেতনের স্থান। জাগতিক থেকে আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ বা উত্তরণের কাল। পুরাতন সম্পর্ক থেকে খানিক তফাতে সমমনস্ক জগত গড়ে ওঠে। অন্তিম পর্যায়ে এসে অন্য এক মাধুরী খুঁজে পায়। মন থেকে অন্য কিছু কর্ম করার তাগিদ অনুভব করে। তাতে মানসিক শান্তি ও আনন্দের পথ প্রশস্ত হয়। (কলম–চি রূপা) 

যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে–

শান্ত আনন্দময় জীবনে একসময় আসে বিপদের তুফান। যেদিকে তাকায় মন– দুর্যোগের ঘনঘটা। বিপদ কেবল একদিক থেকে নয় আসে চারিদিক থেকে।তখন বোঝা যায় নিয়তির হাতের পুতুল সবাই। যুদ্ধ চলে ঘরে–বাইরে সকলখানে। কিছুদিন পর নিয়তির অমোঘ নিয়মে সে যুদ্ধ থামে। তুফান আসে আবার থামেও তবে নিয়ে যায় অনেক কিছু।যেমন অথৈ জলের বন্যার পর রয়ে যায় কাদা প্যাচপ্যাচে মাটি। কিছু ভাঙা ঘর ভাঙা হাঁড়ি কুড়ি।ছিন্নমূল মানুষ ভাগ্যের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। রন ক্লান্ত সৈনিকের প্রেত রণক্ষেত্রে হতাশার বিলাপ। আপনও বড় দূরের মানুষ মনে হয়। পরিবেশের ক্লিন্নতায় মলিন ক্লান্ত মন। হতাশায় দুঃখে  নিজের মধ্যে নিজে কেঁদে ফেরে বাইরে থাকে কঠিন কঠোর বর্ম আত্মসম্মান রক্ষায়। কোনও কষ্ট যেন তাকে ছুঁয়ে যায় না। সন্তানরা কর্মসূত্রে দূরদেশে সেখানে বেশিদিন মন টেঁকেনা।হতাশ মন ভাবতে বাধ্য হয় বেঁচে থাকা বড়ো অপ্রয়োজনীয়। 

((কলম–চি রূপা)) 


তুমি ডাক দিয়েছ কোন্ সকালে –

কোনো এক পরিচিত মাধ্যমে পাওয়া গেল এক আলোর ঠিকানা শান্তির আশ্রয়। খুব বড় বাড়ি নয় অথবা খুব সাজান গোছানো বৈভব নাই আছে এক নির্মল শান্তির পরিবেশ। আমাদের শ্রীশ্রী মা সারদা সংঘ যেন এক আনন্দ নিকেতন। শ্বেত পাথরের বড় হলঘরে মা –আমাদের মা বসে আছেন তার মহিমান্বিত রূপে। তাঁর ডানপাশে স্মিত মুখে ঠাকুর বামপাশে প্রিয় পুত্র স্বামীজী। সুন্দর করে থালায় সাজানো কিছু প্রসাদ। 

  • সামনে সারি সারি চেয়ারে মহিলারা বসে মায়ের নাম–গান জপ ধ্যান করেন। শ্রী মা, ঠাকুর ও স্বামীজীর  বই থেকে পাঠ , কথামৃত ,ভাগবত,গীতা প্রভৃতি অল্প অল্প রোজ পাঠ হয়। শ্রী মা ঠাকুর ও স্বামীজীর গান হয় তারপর জয়ধ্বনি দিয়ে প্রত্যেকে প্রসাদ নিয়ে আপন গৃহের পথ ধরেন। সাথে নিয়ে চলে শ্রী মা, ঠাকুর ও স্বামীজীর আশীর্বাদ ও মনের প্রশান্তি। প্রত্যহ বৈকালিক ঐ সময়টুকু সারাদিনের আনন্দ সঞ্চয়ন।। বাকি সময় কাটে পরদিনের প্রত্যাশায়। আঁচল বাঁধা থাকে ঠাকুর শ্রী মা ও স্বামীজীর অপার করুণা যা জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
  • মাঝে মাঝে কোনও ভক্ত মাকে নতুন শাড়ি পড়িয়ে নাম–গান দেন তখন অনেক মহিলা ভক্ত আসেন। মায়ের নাম সংকীর্তনে সংঘ মুখরিত হয়ে ওঠে।  মাঝে মাঝে ধর্ম সভায় আসেন বেলুড় মঠের স্বামীজীরা, সারদা মঠের মাতাজীরা তাদের আধ্যাত্মিক বক্তব্য শোনার জন্য মহিলা–পুরুষেরা আসেন। হলে তিল ধারণের জায়গা নেই তবুও সবাই হাসি মুখে। কি অপার্থিব আনন্দে সবাই ডগমগ। বার্ষিক উৎসবে সারাদিন পূজা পাঠ ভক্তসেবা চলে। সাথে বেদান্ত সাহিত্য ও শিল্পের স্টল। বহু মানুষ আসেন বিভিন্ন ধরনের জিনিস কিনতে। মায়ের মেয়েদের ভারি আনন্দ সেদিন। হাতে হাত রেখে মিলন–যজ্ঞে সামিল। এছাড়া আরও অনেক অনুষ্ঠান সারা বছর চলে। বিভিন্ন মঠ–মিশনের ধর্মসভায় একসাথে যোগদান। কোথাও বস্ত্র ও নানা সামগ্রী বিতরন। এমন বহু কাজে মধ্যে যুক্ত হয়ে আপনাকে আপনি চেনার চেষ্টা চলে। মন কেবল অন্নময় কোষে বন্দী থাকতে চায়না। উত্তরণের পথ খোঁজে। ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে বেড়ায় মায়ের স্নেহাঞ্চল তলে। (কলম–চি রূপা) 
  • মাঝে মাঝে প্রানে তোমার পরশখানি দিও:
  •    জীবন তরঙ্গ বয়ে চলে নানা ওঠাপড়ায় মধ্যে দিয়ে। কখনো নির্মল আনন্দে কখনো বা দুশ্চিন্তার ঘনঘটায়। কখনো অজান্তে বিপদের করাল গ্রাসের কবল থেকে উদ্ধার পাই। এমনি একটি ছোট্ট ঘটনার কথা আজ বলি।আজ থেকে প্রায় বছর পঁচিশ আগের ঘটনা। একদিন আমার সেতারের গুরুমা বললেন তার সঙ্গে যেতে সেখানে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এক নামী শিল্পী বাজাবেন। মফস্বল ছোটো শহরে এমন ভালো সুযোগ পেয়ে  এককথায় রাজি হয়ে গেলাম।দুজনে মিলে রিক্সা করে সেখানে গেলাম বেশ অনেকটা দূর। নতুন জায়গা আমরা দুজনেই চিনিনা রিক্সাওয়ালা ঠিকানা শুনে নিয়ে গেল। আশেপাশের লোকজনকে জিঙ্গাসা করে সঠিক বাড়ি খুঁজে পেলাম। বাড়িতে উৎসবের সাজ, ঢুকেই একটা বড় হলঘরে শ্রীমা, ঠাকুর ও স্বামীজির বড় ছবি বেদিতে বসানো। ছবিতে এমন সুন্দর কাপড় পড়ানো মালা–চন্দনে সজ্জিত অপরূপ সাজে আগে কোনদিন দেখিনি তাই অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম ।পরে গৃহকর্ত্রী সাদরে আমাদের উপরে এক ঘরে বসালেন সেখানে পরিচিত স্থানীয় কিছু শিল্পী অনুষ্ঠান করবে বলে বসে আছেন। কিছু পরে অনুষ্ঠান শুরু হল আমরা দর্শক আসনে বসলাম।শীতকাল তাই বিকাল বেলা অনুষ্ঠান আরম্ভ হল সন্ধ্যার সময় ওস্তাদজী কলকাতা থেকে সদলবলে এলেন গুরুমার সাথে গিয়ে তাকে প্রনাম করে এলাম।কিছুক্ষণ বাদে বাজাতে বসলেন অপূর্ব বাজনা আমরা মোহিত হয়ে শুনতে শুনতে রাত বাড়তে লাগলো। তিনি একটু বিশ্রাম নিতেই আমরা বাড়ি ফেরার জন্য বিদায় জানিয়ে উঠে পড়লাম।শীতের রাতে আধা গ্রাম রাস্তায় কোন আলো নেই। উৎসব বাড়ির সামনেটুকু আলো বাকি নিকষ আঁধার। শীতের রাতে সব বাড়ির জানালা দরজা বন্ধ আমরা পথ ঠাওর করতে না পেরে অন্ধকারে কোথায় চলেছি বুঝতে পারছি না। হঠাৎ করে কোথা থেকে একটি খালি রিক্সা সামনে এসে বললো ভাড়া যাবেন। আমরা দুজনে হাতে চাঁদ পাওয়ার মত তাতে চড়ে বসলাম। রিক্সায় বসার পর দেখলাম সামনে আর একটু এগোলেই গভীর পুকুরে পড়ে যেতাম। বলাবাহুল্য আমরা দুজনেই সাঁতার জানিনা সেদিন রাতে সলিল সমাধি হত। আমাদের মফস্বলের রাস্তা তখন প্রায় ফাঁকা গুরুমার বাড়ি অনেক দূরে। রিক্সা ওয়ালা তাকে বাসস্টপে নামিয়ে আমায় বাড়ি পৌঁছে দিতে সম্মত হল।কথামত তিনি বাসস্টপের কাছে নেমে গেলেন আমি বাড়ির পথ ধরলাম। রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার বাড়ি কোথায়? সে বলল আপনাদের পাড়ার কাছে বলে আমায় বাড়িতে নামিয়ে ভাড়া নিয়ে চলে গেল।আমি কোনদিন আর তার দেখা পাইনি।পরের দিন গুরুমাকে ফোন করে জানলাম তিনিও তখনই শেষ বাস পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন।আজও যখন ঐদিনের কথা ভাবি খুব আশ্চর্য বোধহয়। কে ঐ রিক্সাওয়ালা?ঐ অন্ধকারে কোথা থেকে এল জানিনা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মনে হয় শ্রীমা ও ঠাকুরের কৃপাই সেদিন আমার অজান্তে  রক্ষা করেছিল।(কলম–চি রূপা) 
  •   জীবনের অনেক বিপদ বহুল সময় যখন অকূল পাথারে হাবুডুবু খাচ্ছি কোথা থেকে যেন কৃপার হাত সে বিপদ থেকে রক্ষা করে নিরাপদ জীবনে ফিরিয়ে আনে। শ্রী ঠাকুর ও শ্রীমায়ের কৃপায় কেউ এসে ঠিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। তাই বলা হয়– যার কেউ নেই তার ভগবান আছেন। হ্যাঁ অবশ্যই মা আছেন এবং করুনাময়ী সকল সময় রক্ষা করছেন।জয় মা জয় মা জয় মা।

                            (কলম–চি রূপা) 

  • আনন্দের এই ভবের হাটে
  •     মায়ের নামে দিন কাটে। 
  • শেষে দিন ঘনিয়ে এলে
  •     উঠবো গিয়ে মায়ের কোলে। 
  • ধুলো কাদা মুছিয়ে মাগো
  •  বুকে আমায়  স্থান দিও।
    ————————————————-
     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!