Shadow

গল্পের নাম:ঋদান – রেশমি দত্ত

PC Amar Barta
গল্পের নাম:ঋদান
রেশমি দত্ত

এবারের গল্পটা শুরুই হবে না যদি না তার সঙ্গে আলাপ করি। তাকে নিয়েই এবারের গল্প। হ্যাঁ, আমি ঋদানের কথা বলছি, বয়স চোদ্দ বছর। সবে গোঁফের রেখা উঠেছে, হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুল প্যান্ট পরে এখন স্কুল যায় সে। ফুটবল পাগল, সারাদিন সবকিছুতে হেড-গোল দিচ্ছে, ঘুমের মধ্যেও ‘গোওল গোওল’ করে চেঁচায়। গলার স্বরটা ভাঙতে শুরু করেছে, যা বাড়ির সবার বিরক্তির কারণ। মোবাইলের প্রতি সম্প্রতি এত টান জন্মেছে যে সুযোগ পেলেই এর মোবাইল, ওর মোবাইল নিয়ে টানাটানি, গেম খেলার নেশা। হাতে-পায়ে এত চঞ্চল যে বাড়ির লোক তাকে নিয়ে অস্থির।

দিনে দিনে সবার বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে সে। ছোট থেকেই সে বড় চঞ্চল, অনুসন্ধিৎসু মন তার, কোনো খেলনা তার আস্ত থাকে না, ঘরের একটা আয়নাও আস্ত নেই, সব বল নিয়ে হেড আর ক্যাচ করার ফল। কোনো পেন দুদিনের বেশি তিন দিন নয়, পেনটাকে খুলে, তার মেকানিজম জানতেই হবে ঋদানকে। বাড়ির সবাই তার নাম দিয়েছিল ক্ষতিকুমার। ঋদান ধারে কাছে এলেই যে যার জিনিস সামলাত। এসবের জন্য ঋদান ঠ্যাঙানি খেয়েছে মা ও বাবার কাছে প্রচুর।

একবার বাড়িতে অতিথি এসেছে, মা যথারীতি তাদের মিষ্টি খেতে দেবে, ফ্রিজে এক বাক্স মিষ্টি রয়েছে, ফ্রিজ খুলে প্লেটে মিষ্টি সাজাতে গিয়ে দেখে, বাক্সটা খালি, মিষ্টি নেই, কিন্তু বাক্সটা সুন্দর করে গার্ডার দিয়ে আটকে রাখা ফ্রিজের মধ্যে, তারপর মায়ের কী অপমান, কী লজ্জা!

একদিন রাতের বেলা, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, হঠাৎ কুঁই কুঁই করে কিসের কান্নার আওয়াজ। ধীরে ধীরে আওয়াজটা সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিলো, সবাই বাড়ির মধ্যে খোঁজাখুঁজি করতে লাগলো। তারপর চেপে ধরল সবাই মিলে ঋদানকে, ব্যাটা ঘুমের ভান করে শুয়েছিল এতক্ষণ। তারপর অনেক জেরার পর সে স্বীকার করলো এটা তারই কাজ, কোচিং ক্লাস থেকে ফেরার সময় রাস্তা থেকে একটা কুকুরের বাচ্চা তুলে এনেছে সে, ছাদের ঘরে রেখে দিয়েছে তাকে, কোন ফাঁকে গিয়ে দুধও খাইয়ে দিয়ে এসেছে সে, তবু কেন যে কাঁদছে কে জানে!

বাবা রেগে গিয়ে বলল, “তোকে কে মানুষ করে তার ঠিক নেই, তোকেই এই বাড়িতে রাখব না, বোর্ডিংয়ে দিয়ে আসব এবার, আবার কুকুরছানা এনেছে!”

এই বোর্ডিংয়ের ভয়টা তাকে ছোট থেকেই সবাই দেখিয়েছে কিন্তু সে জানে তাকে মোটেই বোর্ডিংয়ে দেওয়া হবে না।

এই তো কদিন আগে দিদি গান করতে বসেছে, হারমোনিয়াম থেকে আওয়াজ বেরোচ্ছে না, কী হলো কী হলো দেখতে দেখতে বার হলো, হারমোনিয়ামের ভেতরের বেশ কয়েকটা রিড ভাঙা, সবাই বুঝে গেল এই কাজ আর কারও নয়, ডাকা হলো ক্ষতিকুমারকে। সে স্বীকার করলো যে কাল যখন দিদি স্কুলে ছিল, তখন সে দেখছিল কী করে হারমোনিয়াম থেকে আওয়াজ বের হয়, যদি ‘সা’ এর রিড ‘মা’ এর জায়গায় বসায় তাহলে কেমন আওয়াজ হবে? কিন্তু সেই করতে গিয়ে আর ঠিক করতে পারেনি। এখানে বলা উচিত, ঋদান কিন্তু ইচ্ছে করে অনিষ্ট করতে চায় না, আর এইটা সে কাউকেই বোঝাতে পারে না।

দিনে দিনে বাড়ির সবাই এত অতিষ্ঠ হয়ে উঠল যে বাবা এবার ঠিক করেই ফেলল যে তাকে বোর্ডিংয়েই দেবে। সেইমতো একটা ভালো বোর্ডিং স্কুল ঠিক করে এল বাবা, সামনের মাসেই দিয়ে আসবে তাকে। বাবা এসে জানিয়ে দিলো ঋদানকে, “যত বাঁদরামি এই মাসটা করে নাও, পরের মাস থেকে…”

ঋদানের মনটা খুবই খারাপ, বাড়ি ছেড়ে থাকতে চায় না সে কোথাও, মাকে ছেড়ে সে কোনোদিন কোথাও থাকেনি কিন্তু কেউ শুনবে না তার কথা সে জানে। তাই অগত্যা মেনে নিলো সে। মাও ভাবল, “ভালোই হয়েছে, সবার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে গেম খেলে খেলে ছেলেটা একদম পড়াশোনায় মন দিচ্ছিল না, এবার আর মোবাইল ফোন হাতে পাবেও না।”

কদিন আগেই চুপি চুপি বাবার ল্যাপটপটা নিয়ে কী সব করেছে, সব লক হয়ে গিয়েছিল, বাবা চিৎকার করছিল খুব।

দেখতে দেখতে ক্ষতিকুমারের চলে যাওয়ার দিন চলে এলো, রবিবার তাকে পৌঁছে দেওয়া হবে, সোমবার থেকে তার বোর্ডিং স্কুল শুরু। এদিকে শনিবার ঋদানের বাবার একটা ইম্পর্ট্যান্ট অনলাইন মিটিং আছে, বস বারবার বলে দিয়েছেন মিনিস্ট্রি লেভেলের সঙ্গে মিটিং, তাই আনইন্টারাপ্টেড নেট কানেকশন থাকতে হবে, যদি কোনোরকম এদিক-ওদিক হয় তাহলে তার চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে।

একটা ঘরে তটস্থ হয়ে বসেছেন উনি। প্রেজেন্টেশন দিতে হবে তাকে, অনেকবার প্র্যাকটিস করেছেন তবুও ভয় করছে, কোথাও আটকে না যায়। বাড়ির সবাইকে বলে রেখেছেন কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে, ঋদানের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলেছিলেন, “এই মিটিং সেরে উঠেই তোমার আমি ব্যবস্থা করব, তোমার বজ্জাতি এবার ঘোচাব, মোবাইল তুমি হাতেই পাবে না।”

এরপর মিটিং শুরু হলো, বেশি কিছু টেপাটেপি করছেন না ভুলেও, শুধু মাইক্রোফোনটা অন-অফ করছেন। সময় মতো ভিডিওটা অন করেই রাখতে হয়েছে, কিন্তু এ কী হলো, প্রেজেন্টেশন দেওয়ার সময় আর স্ক্রিন প্রেজেন্ট করতে পারছেন না, কিছুতেই মনে পড়ছে না, কী করে যেন করতে হয়? ঘাম ছুটছে তার, মাথা ঘুরছে বনবন করে। গেল এবার চাকরিটা, প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থা, এমন সময় ঋদান কী নিতে যেন সেই ঘরে ঢুকেছিল, বাবাকে দেখে সে ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে বাবা?”

ঋদানের বাবা কোনো উপায় না দেখে বলল, “স্ক্রিন প্রেজেন্ট করতে পারছি না, আমাকে বাঁচা।”

সঙ্গে সঙ্গে ঋদান ল্যাপটপটা নিয়ে নিমেষের মধ্যে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দিলো, কেউ বুঝতেই পারল না আড়ালে ঋদান রয়েছে, সবাই অসম্ভব খুশি হলো, আর এই যাত্রায় ঋদানের বাবার চাকরিটা বেঁচে গেল। ওনার একটা প্রমোশনও হলো।

ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ঋদানের বাবা যে কান্নাটা এতক্ষণ চেপে রেখেছিলেন, তা আর বাঁধ মানল না, বললেন, “আমায় ক্ষমা করে দিস বাবা, তোকে আমি বাড়িছাড়া করছিলাম, এখন বুঝতে পারছি, তুই আমার সাহারা হয়ে উঠেছিস, তোকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না, আজ চাকরিটাই থাকত না তুই না থাকলে। তোরা নতুন যুগ সৃষ্টি করবি বাবা, তাই কিছু সৃষ্টির আগে, কিছু ধ্বংস তো হবেই। আমরা পুরাতন, পুরাতন বাঁচবে একমাত্র নতুনকে সঙ্গে নিয়ে। কোথাও যাবি না তুই এই বাড়ি ছেড়ে, তুই চলে গেলে এই বাড়িটার কোনো উন্নতি হবে না, এই বাড়িটা সেকেলে হয়েই থেকে যাবে।”

সমাপ্ত
—————————————————–

লেখিকা-রেশমি দত্তঃ জন্ম ও পড়াশোনা কোলকাতায় ৷ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর-পেশায় শিক্ষিকা রেশমির অবসরের বিনোদন হলো বইপড়া ৷ শৈশব থেকে  বাবার অনুপ্রেরণায় গল্প ও কবিতা লেখার শুরু ৷ শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং ভ্রমণ ওর প্রিয় বিষয় ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!