
জীবন খাতার প্রতি পাতায় …..
ব্রতী ঘোষ
‘ মা -তোমার হলো ?গাড়ি এসে গেছে কিন্তু |’
‘ এই যাচ্ছি – অভি |’
‘ মা – চলো |’ অভি ঘরে ঢুকে মাকে দেখে এগিয়ে আসে ড্রেসিং টেবিলের কাছে |
‘ দেখি ‘ – বলে , ছোট্ট ছোট্ট আঙুলে মায়ের কপালের টিপটা একটু সোজা করে বসিয়ে দেয় |
রুচিরার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে | প্রণয় যে এভাবেই ওর কপালের টিপ ঠিক করে দিত । কখনো ওকে বলত না তোমাকে সুন্দর লাগছে শাড়িটা পরে । ওর ওই টিপ ঠিক করে দেওয়াই বুঝিয়ে দিত যে ওকে দেখতে ভালো লাগছে | আজ মহা অষ্টমীর দিন। পাড়ার মাইকে একটানা দুর্গা স্তোস্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে | আকাশে বাতাসে প্রতিনিয়ত অনুভূত হচ্ছে পুজোর আনন্দ | ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও অভির জোরাজুরিতে রুচিরাকে গাড়ি ভাড়া করতে হয়েছে ঠাকুর দেখার জন্য | ওর মাকে বাড়িতে একা রেখেই বেরোতে হচ্ছে । প্রতি পুজোতেই ও সবাইকে নিয়ে কলকাতার বাইরে চলে যায় । কিন্তু এবারে অভির মন রাখতেই কোথাও যাওয়া হলো না | ওর অফিসের বন্ধুরা অনেকবার বলেছিল বেড়াতে যাবার জন্য কিন্তু উপায় নেই।ছেলের মন রাখতে এই ত্যাগ টুকু করতেই হল | এই ছেলেকে ঘিরেই তো ওর বেঁচে থাকা ।
পুজোতে কলকাতায় থাকতে না চাওয়ার একটা প্রধান কারণ হলো প্রণয়। এই পুজোতেই তো ওর সঙ্গে মুদিয়ালির ঠাকুর দেখতে গিয়ে প্রথম দেখা । সেবার অষ্টমীর দিন হঠাৎ করেই তুমুল বৃষ্টি | রুচিরা ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল ওর কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে | হঠাৎ বৃষ্টি এসে সবাইকে একেবারে ছত্রভঙ্গ করে দিতেই রুচিরা দৌড়ে গিয়ে একটা বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নিল |
‘ কি বৃষ্টি বলুন তো ? ‘ একটা জলদ গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে ফিরে তাকিয়ে ছিল বছর পঁচিশের শ্যামলা মেয়েটা |
‘ হ্যাঁ – ‘ একবার বক্তার দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিয়েছিল রুচিরা | কিন্তু ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল যে অপর দিকের চোখের দৃষ্টি ওর উপরে নিবদ্ধ | একজন সৌম্য কান্তি দীর্ঘ যুবকের দৃষ্টি ওকে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত ভাললাগায় ভরিয়ে দিচ্ছিল | শেষমেষ ঐ আলাপ আর চোখের গভীর দৃষ্টি ই মিলিয়ে দিয়েছিল দুটি অচেনা অজানা হৃদয়কে | আরো তাড়াতাড়ি বন্ধুত্বটা হয়ে গেল যখন জানা গেল দুজনেই একই রাষ্ট্রীয় সংস্থায় কর্মরত। শুধু অফিস দুটো আলাদা। এরপর কত কথা , কত পরিকল্পনা , কত স্বপ্ন পেরিয়ে দুবাড়ির সম্মতিতে বিয়েটা হয়ে গেল | এই পর্যন্ত তো সব একেবারে সিনেমার মতোই ছিল। বছর দুয়েক পরে কিন্তু কোথা থেকে কি যেন হয়ে গেল। রুচিরার বাবা চলে গেলেন হঠাৎ করে | আর মায়ের সব দায়িত্ব ও নিজের কাঁধে তুলে নিল |
‘ মা – মা – কি হলো ? তুমি কি ভাবছো ? একটাও কথা বলছো না | ‘
গাড়িতে যেতে যেতে অভির কথায় সম্বিৎ ফেরে রুচিরার |
‘ না রে সোনা – কিছু না |’ ছেলেকে কাছে টেনে নেয় ও | গাড়ি এগিয়ে চলে একের পর এক ট্রাফিক সিগন্যাল পেরিয়ে | এসে থামে সোজা শিব মন্দিরে | গাড়ি থেকে নেমে রুচিরা অভির হাত ধরে এগিয়ে চলে ভিড় ঠেলে | দুপাশের অপূর্ব রূপসজ্জা যেন চোখ ধাঁধিয়ে দিতে থাকে । কলকাতায় অভির এই প্রথম ঠাকুর দেখা | সে অবাক চোখে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। মুখে কোন কথা নেই | শিবমন্দিরে চায়ের ভাঁড় দিয়ে প্যান্ডেল দেখে অভি একেবারে অভিভূত | সত্যি এত অপূর্ব শিল্পকর্ম কিভাবে সম্ভব ? কলকাতার পুজোতে সমগ্র বাঙালি যেন তাদের রুচি শিল্পকলা কৃষ্টি সবকিছু উজাড় করে ঢেলে দেয় । প্রতিটি ক্লাবের কর্মকর্তাদের সারা বছরের চিন্তাভাবনা, কত শ্রমিকের দিনরাতের এক করা পরিশ্রম সবকিছু যেন পরিপূর্ণতা পায় এই কটি দিনে |অভিকে এই সব কিছু বোঝাতে বোঝাতে রুচিরা এগিয়ে যেতে থাকে মাতৃ মূর্তির দিকে | মাতৃ মূর্তির চোখের দিকে তাকিয়ে – মা , বলে দুহাত আপনা হতে জড়ো হয়ে আসে ওর | ‘ মাগো আমার অভিকে সব বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করো মা! ও যেন মানুষ হয় | ‘
ভাবতে ভাবতেই চোখটা বন্ধ করে সে | কিন্তু একি ? এ কাকে দেখতে পাচ্ছে ও ? সেই সৌম্য কান্তির চোখের দৃষ্টি যেন |
‘ না – রুচিরা তোমার মায়ের দায়িত্ব আমরা নিতে পারবো না |’
‘ কিন্তু তোমাকে তো কিছুই করতে হবে না, যা দেখাশোনা করার তো আমিই করব | তুমি শুধু আমার সঙ্গে থেকো। ‘
‘ সেটাই – সেটাই আমি পারবো না। মা চান না তাই আমিও পারবো না |’
‘ তবে তো আর কোন কথাই বলা চলে না। তুমি তো জানতে আমি বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে ,তাহলে ? ‘
‘দেখো আমি এত কথা জানিনা | আমি শুধু বলতে পারি আমি পারবো না |’
‘ বেশ ! তবে আমি চলে যাব মার কাছে।’
‘ সে তুমি যেটা ভালো মনে কর |’
‘ তুমি এভাবে আমাকে বলতে পারলে?’
‘ এসব নাটক আমার ভালো লাগেনা |’
‘ বেশ ! কিন্তু যে আসছে আমাদের ভালোবাসা সন্তান তার কি হবে ?’
‘তোমাকে আমি আগেই বলেছিলাম যে সন্তান আসবে তার দায়িত্ব শুধু তোমারই | কারণ তুমি মা হতে চেয়েছিলে | আমি চাইনি | আমি শুধুমাত্র ওর বায়োলজিক্যাল ফাদার। ‘
‘ তোমার এতো নিম্ন মানসিকতা ! আমার ভাবতেও ঘৃণা বোধ হয়। আমি এই মুহূর্তে বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। ‘
অপর প্রান্তে কোন উত্তর নেই | সেদিনই সব ছেড়ে চলে আসে রুচিরা।
এরপর শুরু হয় একা একটি মেয়ের মা হয়ে ওঠার সংগ্রাম |
‘ মা ! মা! চলো ! ওদিকটা দেখি | ‘
‘ হ্যাঁ বাবা |’
আজ বারবার একি হচ্ছে রুচিরার | কেন বারবার সেই দৃষ্টি ফিরে আসছে? ও যে চায় না , চায় না , ওই স্বার্থপর মানুষটাকে একবারের জন্যও মনে করতে!
‘ মা চলো |’ অভি অস্থির হয়ে উঠেছে |
এত ভিড় পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার | কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে কালো মানুষের মাথাগুলো এগিয়ে চলে ।এখান থেকে মুদিয়ালির ঠাকুর দেখতে যাওয়ার কথা | শিব মন্দির আর মুদিয়ালি পাশাপাশি | মুদিয়ালির ঠাকুর দেখে বেরিয়ে এসে ড্রাইভারকে ফোন করবে, এরকমই ভেবে রেখেছে রুচিরা |
ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে রুচিরার শরীরটা হঠাৎ খারাপ লাগতে থাকে | একি ? মাথাটা হঠাৎ ঘুরছে কেন ? চোখটা অন্ধকার লাগছে কেন ? কদিন আগেও একবার এরকম হল। না এখান থেকে বেরিয়েই আগে একটু বসতে হবে কোথাও । ‘ মা -মা- চোখ খোলো | চোখ খোলো | অভি ওয়াটার বোতল থেকে জল নিয়ে মায়ের মুখে জল দিতে চেষ্টা করে |
‘ খোকা তোমার বাড়ি কোথায়? ‘
শিলপাড়ায় |’
‘তোমার মা ? মোবাইল আছে? দাও তো, বাড়িতে আর কে কে আছে ? ‘
এইসব কথাগুলো রুচিরা শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু উত্তর দিতে পারছে না। বুঝতে পারছে রাস্তার উপরে শুয়ে আছে ও |
অভির কান্না মাখা গলায় মা ডাক ও শুনতে পাচ্ছে।
‘দেখি, দেখি কি হয়েছে ?খোকা ?তোমার কাছে মোবাইল থাকলে দাও তো!’
গলাটা চেনা চেনা লাগছে ? নাকি সারাদিন আজ যার কথা ভেবে ভেবে ও শরীরটা খারাপ করলো সেই এসে হাজির হলো ওর কাছে।
এরপর আর কিছু রুচিরার মনে নেই | পরদিন ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটছে | দূর থেকে ভেসে আসছে মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্র : ” ওই গিরি নন্দিনী নন্দিত মেদিনী বিশ্ব বিনোদিনী নন্দনুতে | ”
রুচিরা দেখতে পেল ওর বিছানার একপাশেই মা আর আরেক পাশে অভি শুয়ে আছে | দুজনের মাথাতেই দুটো হাত বুলিয়ে দেয় সে | এত তাড়াতাড়ি ওর অসুস্থ হলে যে চলবে না | দুটো প্রাণ যে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে | অভির মুখটার দিকে তাকিয়ে বড় মায়া হয় ওর । গতকাল প্রথম কলকাতার ঠাকুর দেখতে গেল আর তারপরেই এই বিপদ ! বেচারা ! গত মাসেও রুচিরার এরকম একবার হয়েছিল , কিন্তু তখন ও ততটা গুরুত্ব দেয়নি | কিন্তু না , ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিতে হবে।
‘ মা- মা- তুমি উঠোনা | শুয়ে পড়ো | ‘
‘ আচ্ছা বাবা | শুচ্ছি | ‘
কে বলবে অভি ক্লাস ফাইভে পড়ে ! একদিনে ছেলেটা এত বড় হয়ে গেল |
‘ মা জানো , কালকে যে কাকুটা তোমাকে কোলে করে আমাদের গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেল তারপর বাড়িতে নিয়ে এলো সেই কাকুটা খুব ভালো । ‘
‘ আচ্ছা ! তুমি আমাদের বাড়ি আসতে বলেছে তো একবার ? ‘
‘ হ্যাঁ মা বলেছি | উনি তোমাকে ফোন করবেন | ‘
‘ ফোন করবে ? তুমি আমার ফোন নম্বর দিয়েছো ? ‘
‘ উনি তো তোমার মোবাইল থেকেই ড্রাইভার কাকুকে ফোন করলেন | তারপর একেবারে তোমাকে বাড়িতে রেখে ডাক্তার দাদুকে ডেকে আনলেন | কিন্তু মা জানো ? দিদা একটাও কথা বলেনি কাকুর সঙ্গে । এটা কি ঠিক হয়েছে ? তুমি বলো ? ‘
‘ না এটা তো ঠিক হয়নি। ‘
মা একটাও কথা বলেনি এ তো ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার | মা হয়তো বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিলেন – রুচিরা ভাবলো |
‘ মা – কাকু আমাকে বলল যে তোমার ঠাকুর দেখা হয়নি বলে মন খারাপ করো না | আমি তোমাকে কাল ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাব। ‘
রুচিরা মুখ তুলে তাকালেন ছেলের দিকে। দেখলেন ওর সমস্ত মুখটা খুশিতে ঝলমল করছে |
হঠাৎই টুং করে একটা শব্দ হলো | মেসেজ ঢুকলো মোবাইলে । তাতে লেখা ,’ আমাকে পারলে ক্ষমা কোরো | তোমার যোগ্য সম্মান দিতে পারিনি। মা চলে গেছেন বছর পাঁচেক হলো | আবার বিয়ে করেছি । মাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে গিয়ে তোমাকে আর অভিকে হারিয়েছি | অভিকে নিজের মতো করে মানুষ করো | তোমার মত স্থির, নিজ লক্ষ্যে অবিচল | আর হ্যাঁ , শরীরের যত্ন করো । ডাক্তার বললেন অ্যানিমিয়া | ভালো করে খাওয়া দাওয়া করো | এখনো আমি অষ্টমীতে মুদিয়ালিতেই থাকি । যদি কোনদিন তোমাদের সঙ্গে দেখা হয় এই আশাতে । – প্রণয় |’
‘ দাদুভাই – তুমি চলো আমার সঙ্গে | মাকে বিশ্রাম নিতে দাও | ‘
‘ হ্যাঁ দিদুন ! চলো | ‘
সেদিন বিকেল বেলা রুচিরা দেখলো অভি ড্রয়িং রুমে বসে টিভিতে খেলা দেখছে । ‘তুমি ঠাকুর দেখতে যাবে না আজ তোমার কাকুর সঙ্গে ?’
অভি মুখ তুলে তাকায় মার দিকে। সেই একই রকম গভীর দৃষ্টি | মাথা নেড়ে না বলে ও |
‘ওটা কাকু না পাপা | দিদুন আমাকে বলেছে |’ অভির গলায় অভিমানের বাষ্প |
‘ ঠিক আছে। তুমি পাপার সঙ্গে যাও |’
‘ না – মা। পাপা তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে । আমি যাবো না পাপার সঙ্গে |’
রুচিরা বোঝে মা অভিকে সব বুঝিয়ে দিয়েছে।
‘ না মা আমি যাব না ।’
অভির মাথাটা ধরে রুচিটা কাছে টেনে নেয়।
‘ তুমি তো তোমার মাকে ভালোবাসো ? কি বাসো কিনা ? ‘
অভি মাথা নেড়ে সম্মতি দেয় |
‘ পাপা ও ওর মাকে ভালোবাসেন | তাই আমাকে কষ্ট দিয়েছেন | যে অন্যায় তোমার বাবা আমাদের সঙ্গে করেছেন সেই কাজ তুমি কখনো কারুর সঙ্গে করো না | তুমি পাপাকে কষ্ট দিও না। ‘
———————————————-
![]()
ব্রতী ঘোষঃ
জন্ম,পড়াশোনা সবই কলকাতায় ৷ তিরিশ বছর ধরে ভারতীয় জীবন বীমা নিগমে কর্মরতা। সঙ্গীত অনুরাগী মানুষটি এখন ভালোবাসেন লিখতে ৷ এই পত্রিকাতেই তার লেখার পথ চলার শুরু।
