
বাস্তব
ভারতী ভট্টাচার্যী
‘শশী, তুই কোন দিকে গেলি! আমি যে তোকে দেখতে পাচ্ছি না! সামনে আয় বাবা! আমাকে আর কষ্ট দিস না! কই রে! শুনতে পাচ্ছিস কি আমার কথা! উফ্, ছেলেটা যে কোথায় গেল! ও বাবা, কোথায় গেলি!’
বলতে বলতে শশীর মা প্রীতি বিছানায় উঠে বসলেন। সেই দেখে বড় ছেলের বউ দৌড়ে এসে শাশুড়িকে ধরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে মা? আবার স্বপ্ন দেখেছেন?” এরপর জড়িয়ে ধরে বলল, “আপনি শুয়ে পড়ুন। আমি আপনার কাছে আছি। কোনো চিন্তা নেই।”
প্রীতি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বউ, শশী কই? তাকে তো দেখতে পাচ্ছি না! এখনও অফিস থেকে ফেরেনি?”
বউ শান্ত হয়ে বলল, “মা, আপনি ভুলে গেছেন, শশী তো বিদেশে গেছে। ভালো চাকরি পেয়েছে যে।”
“আরে শশী গেছে তো কী হয়েছে! আমরা তো আছি। শশী আমাদের ওপর আপনার দায়িত্ব দিয়ে গেছে। আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। এখন আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। অনেক রাত হয়ে গেছে।”
প্রীতি কতটুকু বুঝেছেন, বোঝা গেল না। কোনো বাক্যব্যয় না করে বড় বউয়ের মুখের দিকে এক নজর দেখে আবার শুয়ে পড়লেন।
প্রীতির দুই ছেলে — রবি আর শশী। ছোটবেলা থেকে শশী খুব চৌকস। সব দিক দিয়ে এক নম্বর। সোজা কথায় বলা যায়, রবি সাদা-কালো আর শশী রঙিন টেলিভিশন। শশীই তার দাদাকে চালনা করে। দুই ভাই মিলেমিশে থাকে। তাই প্রীতির খুব শান্তি। প্রীতির বর খুব শান্ত। কারও সাতে-পাঁচে থাকেন না। প্রীতি বরং বাড়ির মধ্যে সব থেকে বাকপটু। সংসারের হাল কাউকে তো ধরতে হয়, স্বামী নির্বিকার বলে প্রীতি সেই ভার প্রথম থেকেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ভালো-মন্দে, মিলেমিশে প্রীতির সংসারটা ভালোই চলছিল।
শশী একটু বড় হবার পর থেকেই সে মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। ছোটবেলা থেকে বয়সের তুলনায় শশী অনেক বেশি ম্যাচিওর। বলার আগেই সব কিছু এত সুন্দর বুঝে নিত! মাঝে মাঝে প্রীতি অবাক হয়ে যেতেন। কোথায়, কখন, কীভাবে কাজ করতে হবে, সেটা ওকে বলতে হতো না।
শশী একবার গান করে প্রথম স্থান অধিকার করে। রবিও অন্য গ্রুপে গান করেছিল। সে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। বাড়ি এসে রবি ভাইয়ের জন্য খুব খুশি, কিন্তু শশীর খুব মন খারাপ। প্রীতি বোঝালেন, এসব কোনো বড় ব্যাপার নয়। সামনের বার রবিও প্রথম হবে। যাই হোক, খেয়ে-দেয়ে রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেল। সকালে উঠে সবাই দেখে, সার্টিফিকেটে শশী তৃতীয় আর রবি প্রথম প্রাইজ পেয়েছে। সবাই অবাক! কী করে শশী সেটা বাস্তবে পরিণত করেছে, সেটা সে কাউকে বলেনি। স্কুলের রেকর্ডে যাই থাকুক, বাড়ি এসে সবাই দেখবে রবি প্রথম হয়েছে, এটাই শশীর আনন্দ। ভাই যে ভাইকে এতটা ভালোবাসতে পারে, এই দৃষ্টান্ত কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না। এরকম অনেক দৃষ্টান্ত আছে, যা শুনলে সবাই অবাক হয়ে যাবে।
পড়াশোনা শেষ করে দু’জনই নিজের দেশে ভালো চাকরি পেয়েছে। দু’জন দুটো শহরে থাকে, কিন্তু ভিডিও কলে রোজই কথা হয়। শশী বাবা-মায়ের সাথে আর রবি একা অন্য শহরে। শশী কোনোদিনও পরিবারকে ছেড়ে বিদেশে যাবে না বলেছে। রবি একা থাকে বলে চাকরি পাওয়ার সাথে সাথে দাদার বিয়ে ওর বন্ধুর বড় বোনের সাথে ঠিক করেছে। খুব ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হলো। দাদার বিয়ের দিন বউদির এক বন্ধুর ছোট বোনের সাথে পরিচয় হয়ে শশী প্রথমে প্রেম এবং পরে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মেয়েটি তেলেগু। বাড়ি থেকে কোনো অসুবিধা নেই। শশীর বিয়ে দাদার বিয়ের দু’বছর পর ঠিক হয়েছে। খুব জোর কদমে বিয়ের প্রস্তুতি চলছে। শশী সবার এত প্রিয় পাত্র যে সবাই আনন্দে কাজ করছে।
বিয়ের এক সপ্তাহ আগে শশী ওর হবু বউ নীলিমার সাথে সন্ধ্যাবেলা বাজার করতে যাবে বলে ঠিক করেছে। তাই সেদিন সকালে স্কুটি নিয়ে একটু চুল-মুখ ঠিক করবে বলে পার্লারে গেল। সকাল এগারোটা নাগাদ গেছে, কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, ফিরছে না দেখে মা ফোন করে জানতে পারলেন, এইমাত্র শেষ হয়েছে। এখনই এসে যাবে। মাকে আবার হেসে হেসে বলছিল, “একবারই তো বিয়ে করব, মা, ভালো করে সেজে নিই। আমাকেই তো সবাই দেখবে, তাই না মা?” মা বলছিলেন, “আমার ছেলে রূপে রাজপুত্তুর, গুণে বিশ্বকর্মা, এমনি সবাই তাকিয়ে থাকবে, তার জন্য নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে সাজার কোনো দরকার ছিল না।” বাড়ি তাড়াতাড়ি চলে আয়। এও বললেন, উনি অপেক্ষা করে বসে আছেন, ছেলে আসলে একসাথে খাবেন। শশী ‘আসছি’ বলে ফোনটা রেখে দিল। কিন্তু এক ঘণ্টার বেশি হয়ে গেল, ছেলে তো এখনও এল না! আবার ফোন করলেন, কিন্তু তুলল না ছেলে! ভাবলেন, হয়তো রাস্তায় আছে, তাই ধরতে পারেনি। প্রীতির এবার খুব অশান্তি হচ্ছে। ঘর আর বারান্দা করছিলেন।
শশী মাকে ফোন করতে করতে পার্লারের আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই চোখ সরাতে পারছে না। মায়ের ফোনটা কেটে কিছুক্ষণ নিজেকে দেখার পর হাতে চিমটি কেটে দেখল, ও স্বপ্ন দেখছে না তো! হঠাৎ করে মায়ের একটা কথা মনে পড়ে গেল! মা বলেন, নিজের দৃষ্টি নিজের ওপর সব থেকে বেশি পড়ে। মনে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পার্লারের টাকা পেমেন্ট করে বেরিয়ে এল। ভাবছে, নীলিমা আজ ওকে দেখে একদম পাগল হয়ে যাবে। মনের উত্তেজনায় হেলমেটটা পরতেই ভুলে গেল। খুশিতে আত্মহারা হয়ে স্কুটি স্টার্ট দিল। শশীর মনে হচ্ছিল, পারলে নীলিমার কাছে উড়ে চলে যায়! এখান থেকে বাড়ি আধ ঘণ্টার পথ! কিন্তু শশীর আজ মনে হচ্ছে পথ শেষই হচ্ছে না। মনকে নীলিমার কাছে রেখে মনের আনন্দে স্কুটি চালাচ্ছিল। হঠাৎ ধুম করে একটা আওয়াজ শুনতে পেল, এরপর আর কিছু বলতে পারল না।
এদিকে প্রীতি শুধু ফোন দেখছেন। যদি ছেলে ওর কল দেখে ফোন করে। কী জানি কেন মনটা খুব কু ডাকছে! সেই সময় হঠাৎ প্রীতির ফোনটা বেজে উঠল। দেখলেন, ছেলের ফোন। ধরতেই ওপার থেকে এক অচেনা কণ্ঠ বলল, “আপনাদের বাড়ির ঠিকানা যদি একটু বলেন! আপনার ছেলের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। এখন কোনো কথা না বলে দয়া করে বলুন আপনাদের ঠিকানা।” প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে ঠিকানা বলে ফোনটা রেখে দিলেন। ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। দরজা খুলে প্রীতি দেখলেন, নীলিমা এসেছে। নীলিমাকে দেখে প্রীতি ছেলের ওপর রেগে ফেটে পড়লেন। নীলিমা ঘরে ঢোকার আগেই বলতে শুরু করলেন, “জানো নীলিমা, এইমাত্র একজন ফোন করে বলল, শশী অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। এইজন্যই এত সময় ধরে আমার মনটা কেমন করছিল। দেখলে তো, ছেলেটা একটা কাণ্ড বাধিয়ে দিয়েছে। ওই লোকটা শশীকে বাড়ি নিয়ে আসছে। নিশ্চয় হাত-পা কিছু ভেঙেছে। স্কুটি চালাতে পারবে না, তাই লোকটা মনে হয় দিয়ে যাচ্ছে। দেখো তো কী কাণ্ড করল! বেশি ভাঙলে তো এই তারিখে বিয়েও হবে না। ক্ষত শরীর নিয়ে বিয়ে করতে নেই। বাড়ি আসলে বোঝা যাবে কতটুকু কী হয়েছে। আজ তোমার আর বাজার যাওয়া হবে না। আগে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। আমি আমাদের গাড়ির ড্রাইভারকে ফোন করছি। ছেলেটা কবে যে বড় হবে, জানি না! তুমি একটু ওকে শান্ত করে দাও তো, নীলিমা।”
শুনে নীলিমা মুচকি হেসে বলল, “আচ্ছা মা।” নীলিমা তেলেগু হলেও ভালো বাংলা বলতে পারে।
দু’জন মিলে লিফট দিয়ে নিচে চলে এলেন। প্রীতির মনে হয়, শশীকে তো নিচে থেকে ঘরে নিয়ে যেতে হবে। অচেনা লোকটা কী করে চিনবে ওদের ঘর। নিচে বসে নীলিমা আর প্রীতি অপেক্ষা করছেন, ছেলে কখন আসবে। ফ্ল্যাটের অনেক মহিলারা নিচে হাঁটছেন। ওদেরকেও প্রীতি ওর ছেলের নামে নালিশ করছিলেন। কেমন কাণ্ডজ্ঞান ছাড়া ছেলে ওর। বিয়ের দু’দিন আগেও শান্ত হয়ে ঘরে বসতে পারল না। ইত্যবসরে প্রীতির বরও অফিস থেকে ফিরে এসেছেন। বর আসতেই প্রীতি যতটুকু জানেন, প্রথমে সব বললেন এবং একটু নিচে অপেক্ষা করতেও অনুরোধ করলেন। এমন সময় একটি অ্যাম্বুলেন্স ওদের ফ্ল্যাটের ভেতর প্রবেশ করল। অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে দেখে প্রীতির বুকটা ধক্ করে উঠল। সবাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল। দেখল, চারটে লোক শশীকে স্ট্রেচারে করে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখল। প্রীতি চিৎকার দিয়ে বলল, “এখানে কেন রাখছ? তোমরা? ঘরে নিয়ে চলো! ওর কিছু হয়নি। একটু ভেঙেছেই তো! ও ঠিক হয়ে যাবে!”
প্রীতি ও নীলিমা দৌড়ে গিয়ে শশীকে বলল, “উঠ শশী! ঘরে চল!…”
কিন্তু শশীর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সাড়া দিতে পারল না। নীলিমাকে একবার জড়িয়ে ধরতে পারল না! একবার প্রীতিকে ‘মা’ বলে ডাকতে পারল না। প্রীতি ও নীলিমা আছড়ে পড়ে ওকে ওঠানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। কেন শশীর দেহ এত ভারী হয়ে গেল! কেন সে ওর প্রিয় মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে! কেন, কেন?
————————————————–

ভারতী ভট্টাচার্য পরিচিতিঃ ভারতী ভট্টাচার্য একজন ব্যবসায়ীক মহিলা এবং লেখক। বর্তমানে বাসস্থান অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম শহরে।
