Shadow

মহারাজ – দীপঙ্কর সরকার

PC Tradeindia
মহারাজ
দীপঙ্কর সরকার

 

নিভৃত পল্লী। সন্ধ্যার পর নেমে আসে নীরবতা। চাঁদের আলো কিংবা জোনাকি পথ দেখায় হাটুরেদের। ফিরতি পথে শোনা যায় ঝিঁঝি পোকার বা শিয়ালের ডাক। সন্ধ্যার পরও খেলা শেষ হতে চায় না বালকের। সারা বিকেল থেকে সন্ধ্যা এক মুহূর্ত অবসর নেই ওদের। একেক সময় একেক খেলায় মাতিয়ে রাখে পুরো গ্রাম। সরু রাস্তায় স্ট্যাম্প বসিয়ে শুরু করে ক্রিকেট খেলা। খেলায় কত নিয়মকানুন। বল উড়িয়ে মারলে আউট। রবি সজোরে ব্যাট চালাতে গিয়ে বল উড়ে গেল রানাদের বাড়িতে। ওর মা তখন উঠোনে ধান শুকোচ্ছিল। বল গিয়ে লাগল রানার মায়ের মাথায়। তারপর শুরু হলো তুলকালাম কাণ্ড। বল ছেড়েই ছেলেরা পালিয়ে হাওয়া হয়ে গেল।

সন্ধ্যার পরও বাড়ি না ফেরায় জোরে ডাক ছাড়ে রবির মা —

“রররররবিইইইই!”

রবিও দূর থেকে জবাব দেয়, “মাআআআআ…”

মায়ের অগ্নিমূর্তি দেখার আগেই ঘরে ফেরে রবি। সুবোধ বালকের মতো হাত-মুখ ধুয়ে বই নিয়ে বসে। হ্যারিকেনের আলোয় রবি চিনে নেয় অক্ষর। সুর করে পড়তে থাকে, ‘আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা এই দেশে বাস করে নানা ধর্মের ও বর্ণের মানুষ…’

মা রান্নাঘর থেকে রবির পড়ার শব্দ শোনে। শব্দ ক্ষীণ হলে মা আবার সজোরে ডাক ছাড়ে — “কী রে, চুপ করে আছিস কেন?”

আবার পড়তে থাকে রবি।

ভাত রান্না প্রায় শেষের দিকে। ঘুম পায় ওর। ঢুলুঢুলু চোখে পড়তে থাকে। এক পর্যায়ে চোখ আর বাঁধ মানে না। মায়ের রান্নাও প্রায় শেষ। তাড়াতাড়ি করে ভাত বাড়েন মা। আলুসেদ্ধ, ভাত দেখে মন খারাপ হয় রবির।

— ও মা, কবে খাসির মাংস খাব?

— আর কিছুদিন পর নবান্ন। তার পরদিন খাবি, কেমন?

মা ছেলেকে সান্ত্বনা দেয়।

ধান কাটার মৌসুম চলছে। নবান্ন আসতে আর দেরি নেই। দুষ্টু ছেলের দলেরা মাঠে যায়। ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান খুঁড়ে বের করে। সেগুলো শুকিয়ে তিলের খাজা, জিলিপি কিনে খায়।

রাত পোহালেই নবান্ন। নতুন ধান ঘরে তোলার উৎসব। সকাল সকাল ঘুম ভাঙে রবির। ঘুম থেকে উঠে বাবাসহ মাঠে যায় ধান আনতে। তারপর চলে নবান্নের আনুষ্ঠানিকতা। পরের দিন বড় খাসি কাটা হবে। আনন্দে রবির চোখে ঘুম আসে না।

পরের দিন সকালবেলা। রাস্তার মোড়ে খাসি কাটা চলছে। রবি গিয়ে শোনে, ওদের ভাগ নেই। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে রবি। ওর বাবা বলে — “আমরা দেরি করে বলায় ওরা দেয়নি। তবুও বলেছে, বাজেটের চেয়ে আধা কেজি বা এক কেজি মাংস বেশি হলে তবেই দেবে।” মন খারাপ হয়ে যায় রবির। খাসি কাটার ওখানে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে ও। কাটা শেষে ওজন করা হচ্ছে। এক এক করে সবাই নিয়ে যাচ্ছে। ওজন করা শেষে দেখা গেল, আধা কেজি মাংস উদ্বৃত্ত থেকে গেছে। সেটুকু নিয়ে পরম আনন্দে ঘরে ফেরে রবি।

মা মাংস রান্নার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। মায়ের হাতের মাংস রান্না যেন অমৃত। এক পিস খেলেও এমন শান্তি আর কোথাও নেই। বাইরে পেটপুরে খেলেও ওই টুকরোতেই যেন পৃথিবীর সব সুখ নিহিত আছে। শুরু থেকে রবি ঘ্যানঘ্যান করে যাচ্ছে — কখন রান্না হবে, কখন রান্না হবে। ওর মা মাংসগুলোকে আলু সহযোগে রান্না করলেন, যাতে পরিমাণে বেশি হয়। রবির আর তর সইছে না। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে খেতে বসে পড়েছে। যদিও চেখে দেখার নাম করে এক দফা আগেই খেয়েছে।

পরম তৃপ্তিতে খাওয়া শেষ করে রবি।

পরের বছরের ঘটনা। রবিদের একটা খাসি আছে। ওজন হয়তো ২৫-৩০ কেজি হবে। রাজার মতো তার গড়ন, চলাফেরাও তাই। রবি আদর করে ‘মহারাজ’ বলে ডাকে।

রবি স্কুল থেকে ফেরার পর ‘মহারাজ’ বলে এক ডাক দেয়। সঙ্গে সঙ্গে খাসিটা ওর কাছে ঘেঁষে আসে। পরম স্নেহে রবি হাত বুলিয়ে দেয় ওর পিঠে।

অভাব-অনটনের সংসার ওদের। ওর বাবা চায় এই নবান্নেই খাসিটা কাটা হোক। রবি তখনও টের পায়নি। নবান্নের পরের দিন রবি জানে, আজকে গ্রামে কারও না কারও খাসি কাটা হবে। সাধারণত নবান্নের পরের দিন ও স্কুলে যায় না। এবার পরীক্ষা চলায় ওকে স্কুলে যেতে হলো। পরীক্ষা শেষ করে বাড়িতে ঢুকতেই রান্নাঘর থেকে মাংসের সুঘ্রাণ ভেসে আসছে। মন আনন্দে নেচে উঠল ওর। আনন্দে ‘মহারাজ’ বলে দিল এক ডাক। মহারাজের কোনো সাড়াশব্দ নেই। আজ আর তার কাছে মহারাজ এল না। এক অজানা আতঙ্কে মন কেঁপে উঠল ওর। মাকে জিজ্ঞেস করল, “আজ কার খাসি কেটেছে?”

মা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন — “খুব টাকার দরকার; আমাদেরটা বিক্রি করেছি।”

রবির সব আনন্দ, উচ্ছ্বাস হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। খাসির মাংস যে ওর এত প্রিয় খাবার, সেদিন ওর গলা দিয়ে মাংস তো দূরে থাক, ভাতও নামল না।
————————————————
দীপঙ্কর সরকার – বাংলাদেশ, রংপুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!