
মায়ের আশীর্বাদ সু হাউস
জলি চক্রবর্তী শীল
‘বাবু বেরোলাম | খাবার ঢাকা দেওয়া আছে স্নান করে খেয়ে নিস | আর হ্যাঁ শোন বের হবার আগে ঘরের আলো–পাখাগুলো মনে করে নিবিয়ে দিবি | দরজায় তালাটা এঁটে টেনে দেখে নিবি | ‘কথাগুলো বলতে বলতেই দীঘি সদর দরজাটায় তালা এঁটে বেরিয়ে পড়ে রোজকার ডিউটিতে | দশটা–পাঁচটার ডিউটি নয়‚স্বাধীন ব্যবসা তার | তাদের শহরতলীর মোটামুটি পশ্ এলাকায় তার একটা ভাড়ায় ছোট জুতোর দোকান‚ ‘মায়ের আশীর্বাদ সু হাউস‘ | সকাল দশটায় দোকান খুলে বসে সে| দুপুর দুটোর সময় বন্ধ করে বাড়ি ফিরে স্নান–খাওয়া–দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার সন্ধ্যে ছটা নাগাদ দোকান খুলে বসে | দোকান বন্ধ হতে হতে রাত এগারোটা বেজে যায় |অবশ্য পুজো–পার্বণের সময় এই সিডিউলে দোকানদারী চলে না | তখন নাওয়া–খাওয়ার সময় থাকে না‚ দোকান বন্ধ করার দরকার পড়েও না | ঐ সময়টাই তো বছরের সবচেয়ে বেশি রোজগারের সময় |
মায়ের আশীর্বাদ ভিন্ন এ দোকান চালু করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না | বাবু তখন বেশ ছোট চার দেয়ালের বাইরের কঠিন পৃথিবীতে যখন সে পা রেখেছিল তখন ভাবেনি এই দোকান তার আরও একটা সন্তানে পরিণত হবে | ক্ষুন্নিবৃত্তি থেকে ছেলের স্কুল–টিউশন সব টেনেছে এই দোকানের আয় থেকে | অবশ্য তখন এত প্রতিযোগিতা ছিল না |
মোড়ে এসে দাঁড়াতেই একটা রানিং টোটো পেয়ে যায় | আজ তার বড্ড দেরী হয়ে গেল তাই‚ না হলে সে হেঁটেই যায় | দশটা টাকা কি কম নাকি | তার ওপর বাজারের যা হালচাল এখন‚ বিক্রিবাটা নেই বললেই চলে‚সারাদিনে যা বিক্রি তাতে করে সংসার টানা একপ্রকার বেশ কঠিন | ছেলেটা যাইহোক টিউশনি করে দুপয়সা রোজগার করে বলে সংসারটা থেমে নেই| বড় ভালো ছেলে তার‚ পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের চিন্তাও করে| দীঘির খারাপ লাগে কিন্তু উপায়ই বা কি? দোকানের আয় তো আগের মত নেই‚প্রতিযোগিতা বাড়লে যা হয় আর কি !
দোকানের মুখেই টোটো থেকে নেমে যায় দীঘি | দোকানের সামনে আজ জনাকয় দাঁড়িয়ে আছে কেন কে জানে ? দীঘি দোকানের দিকে এগিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জটলা থেকে একটা লোক তাকে জিগায়‚‘হেই দোকানডা কি আপনের ?’
দীঘি মাথা নেড়ে সায় দেয় দোকান তারই | লোকগুলোকে সে আগে কখনো দেখেনি | এলাকার দোকান‚তাই এলাকাবাসীদের মোটামুটি সে চেনে | ছুটকো–ছাটকা ফ্ল্যায়িং কাস্টমার যে সে পায় না তা নয় তবে সে খুব কম‚ অনেকটা ঐ ঠেকায় পড়া কাস্টমার | রাস্তায় বেরিয়ে জুতো ছিঁড়ে গেলে বা বৃষ্টিতে দামী জুতো জলে না ভেজাবার জন্য সস্তায় কেউ কেউ জুতো কেনে |
‘আমাগো আজ ফিরে যাওনের কথা বহিন | তা কাল সব খরিদ করেসি কিন্তু ঐ জুতা খরিদ করা হয় নাই | হাতে তো টাইমও নাই‚তাই এহানকার ঐ দোকানদার কইল তোমার দুকানে পাইব জুতা | তাই অপেক্ষা করত্যাসিলাম |’
উফ আজ কার মুখ দেখে উঠেছে সে | বাংলাদেশের পার্টি | মনে মনে খুশী হয়ে ওঠে সে | মুখে বলে‚ ‘একটু অপেক্ষা করুন‚ দোকানটা খুলে একটু ধূপ দিয়েই আপনাদের জুতো দেখাচ্ছি |’
দ্রুত হাত চালিয়ে সে সব সেরে নেয় | মাপ দিয়ে‚ ভিডিও কল করে পছন্দসই বেশ কটা জুতো স্টক থেকে বিক্রি হয়ে যায় দীঘির | বাংলাদেশের পার্টিরা দরদাম করে না | এই একটা সুবিধা | মনটা হঠাৎ করেই বেশ ভালো হয় যায় |
‘বোনটি সকাল সকাল কিন্তু ভালো বউনি করিয়ে দিলাম‚একটু চা টা হবে না নাকি ?’ পাশের সুতোর দোকানের দোকানী গৌরদা বলেন |
‘নিশ্চয় হবে দাদা‚ আপনি চা বলেন‚ আমি দাম দিয়ে দেব |’ দীঘি বলে |
‘শুধু গৌরদাকে চা খাওয়ালে হবে না বোনটি‚ আমরাও আছি কিন্তু‘ | দুধের দোকানের তিমিরদা‚ জলের দোকানের রমিতাবৌদি সবাই একসাথে বলে ওঠে |
দীঘি হেসে সায় দেয় | সামান্য চা তাতেই খুশী এই মানুষগুলো | কত সামান্য চাহিদা |
তবে শুধু চা আসে না সাথে বেকারীর বিস্কুটও নিয়ে আসে রাজু | দোকান দোকান ঘুরে চা বিক্রি করে রাজু | আগে ওর ফুটের ওপর একটা দোকান ছিল | কিন্তু দোকানটা অবৈধ বলে পুরসভা থেকে ভেঙে দিয়ে গেছে দিনকয় আগে | তাই বেচারা ফ্ল্যাক্সে করে চা নিয়ে দোকান দোকান ঘুরে বিক্রি করে |
দীঘি চায়ের সাথে বিস্কুটের দামটাও দিতে চেয়েছিল‚ কিন্তু অটোস্ট্যান্ডের বিরজুদা বিস্কুটের দামটা দিয়ে দিল | আসলে এরা কম বেশি সকলেই প্রায় একইরকম আর্থিক অবস্থার মানুষ তাই কেউ কারও ওপর চাপিয়ে দিতে চায় না‚ বরং ভাগ করে নেয় | প্রত্যেকেই সহমর্মী প্রত্যেকের আর্থিক অবস্থার প্রতি | এদের সাথেই বরং এখন নিজেকে অনেক বেশি কানেক্ট করতে পারে দীঘি | নিজেকে স্বচ্ছন্দ মনে হয় এদের মধ্যে |
হঠাৎই মোবাইলটা বেজে ওঠে | বড়দা ! এত বছর পর বড়দা ফোন করেছে তাকে !! শেষ ফোন করেছিল বাবা মারা যেতে| সেও তো প্রায় বছর পনেরো হয়ে গেল | হঠাৎ এতবছর পর তাকে ফোন করছে কেন ? আবার কারো কিছু হল না তো ? বুকের ভিতর যেন রক্ত ছলকে ওঠে | এখনও অনুভূতিগুলো মরে যায়নি টের পায় দীঘি |
কলটা তুলতেই ওদিক থেকে বড়দা সটান জিঞ্জাসা করে‚ ‘কি শুরু করেছিস তুই ? হাটের মাঝে একটা সস্তার জুতোর দোকান খুলে বসেছিস সেও না হয় মেনে নিয়েছি | তাই বলে ঘর–সংসার ছেড়ে আশেপাশে লোকগুলোর সাথে হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছিস দেখলাম‚ কত বড় ঘরের মেয়ে তুই‚ তোর কি লজ্জা বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই ?
‘তুমি কি করে জানলে ? তুমি কি এইমাত্র এখান দিয়ে গেলে ?’ দীঘি জানতে চায় |
‘না গেলে কি আর এসব দেখতে পেতাম ? ‘
‘আমার দোকানে তো আসতে পারতে দাদা‘ |
‘রুচিতে বাধল | ‘
‘রুচি !! তাই বটে| তোমরা যা বড়লোক‚ তাতে এইসব ছোটখাটো দোকানে এলে তো সত্যি তোমার রুচি নষ্ট হত | কিন্তু সেটা ফোন করে বলার বা কি দরকার ? আমি তো আর কাউকে কিছু বলতে যাইনি |’
‘বলবি সে মুখ আছে কি তোর ? যার জন্য বাড়ি ছাড়লি শুনলাম তাকেই নাকি তুই ছেড়ে দিয়েছিস ?’
‘সব খরবই তো রাখো যখন ‚ কেন ছেড়েছি সে খবরও নিশ্চয় তোমার জানা |’
‘না সব খবর রাখি না‚ রাখার প্রয়োজনও বোধ করি না | তবে কানে কথা আসাটা তো বন্ধ করতে পারি না | লজ্জা করে তোকে আমার বোন বলে পরিচয় দিতে |’
হাসে দীঘি কিন্তু চোখের কোন জ্বালা করে | ‘দেওয়ার দরকারই বা কি ? সেসব পাট তো আগেই চুকে গেছে |’
‘অবাক লাগে তোর রিগ্রেট বলে কোন কিছুই নেই | একটা অকাল কুষ্মান্ডকে বাড়ির অমতে বিয়ে করে বাড়ি ছাড়লি‚ আর আজ তাকে ছেড়ে ‘
‘দাঁড়াও বড়দা‚ আমি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছি‚ কারণ তোমরা আমার বিয়েটা মানোনি | বাবাও মানেননি | সেটা সেদিনের সত্য ছিল | আর আজকে যেটা সত্য সেটাকে মেনে নিতেও আমার কষ্ট হয়নি | হ্যাঁ ভুল হয়েছিল আমি স্বীকার করছি | বিশালকে চিনতে আমার ভুল হয়েছিল | সে যাকগে‚ আমি কিন্তু বড়দা তোমাদের দয়া ভিক্ষা করতে যাইনি | আমি আমার মত করে রাস্তা খুঁজে নিয়েছি | আর যাদের তুমি দেখলে আমার সাথে তারা আমার সুখে সুখী ‚ দুঃখে দুঃখী| আমি ওদের নিয়ে বেশ আছি | তোমরাও তোমাদের মত করে ভালো থাকো | রাখি এখন |’ বলে দীঘি কলটা কেটে দেয় |
জিভে একট তিক্ত আস্বাদ | ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে দীঘি | পার হয়ে এসেছে মাঝের প্রায় ২১ টা বছর | দোকানের দেওয়ালে টাঙানো মায়ের একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলে সে | সম্পর্ক কিছু নেই তবু যেন ঝাড়তে পারে না আপনজনের দেওয়া কষ্টগুলো | সেই দুবেণী সদ্য কৈশোর পার করা মেয়েটাকে এখনো সে খালি চোখেই দেখতে পায় | যার চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন | তাকে নিয়ে ছিল তার বাবারও অনেক স্বপ্ন | কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারী পেরিয়ে স্বপ্নগুলো চুরমার হয়ে গেল |
বিশাল জয়সয়াল| হার্টথ্রব ছিল স্কুলের সব মেয়েদের | সেই ছেলে একরকম পিছনে পড়েই গেল দীঘির | ওমন একটা ছেলেকে কি ভাবে না বলবে দীঘি | হায়ার সেকেন্ডারী পাশ দিয়েই দুজনে বিয়ে করে চলে এল | আইডিয়াটা ছিল বিশালেরই | বিয়েটা হয়ে গেলে মেনে নিতে বাধ্য হবে দুজনের পরিবার | কিন্তু দুই পরিবারই মেনে নেয়নি | সেদিনের বিশাল ছিল অন্যরকম একটা মানুষ | জেদ ছিল বিশালের | নিজের পায়ে খেটেখুটে দাঁড়িয়ে গেল | বেশ ভালো চলছিল| দীঘির কোনদিন মনে হয়নি তার সিদ্ধান্তে কোন ভুল ছিল, উনিশে এল বাবু | সবই হল সময়ের সাথে সাথে | কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পাল্টে গেল বিশাল | ব্যবসা বড় হয়েছিল আগেই‚ বাড়ছিল দায়িত্ব‚ আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল বিশালের সাথে দীঘির দূরত্ব | ততদিনে বিশালের জীবনে এসে গেছে আলোকপর্ণা‚ বিশালের পি.এ. |
না দীঘি ঝগড়া করেনি‚ অশান্তি করেনি‚ কান্নাকাটি কিছু না| শান্তিপূর্ণভাবে বলেছিল‚ ‘ তোমাকে আমি ছেড়ে দেব‚ পরিবর্তে আমি যেটা চাইব সেটা তোমায় দিতে হবে‘‚না খোরপোশ চায়নি‚ শুধু চেয়েছিল দু কামরার ফ্ল্যাটটা যেন বিশাল দীঘির নামে দানপত্র করে দেয় | মাথার ওপর ছাদ আর পায়ের তলার মাটি যদি থাকে তবে চালিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতে পারবে দীঘি এই বিশ্বাসটা ছিল তার | বিশালকে বিয়ে করার ফলস্বরূপ বাবার বড়ির কারও সাথে যোগাযোগ ছিল না | শুধু মা মাঝে মাঝে ফোন করত | মারা যাবার দিনকয় আগে মা তাকে গোপনে ডেকে পাঠিয়েছিল বাড়ির কাছাকাছি | একজোড়া সোনার বালা দিয়েছিল সবার চোখ–কান এড়িয়ে| নিতে চায়নি দীঘি‚ কিন্তু মা বলেছিল‚‘ এশুধু বালা নয় মা‚ এ হল স্ত্রীধন| কখন কি কাজে লাগে কেউ বলতে পারে না | যদি মনে করিস পরবি তাহলে পরিস‚ নাহলে রেখে দে‚ ভেঙে দাদুভাইকে কিছু বানিয়ে দিস |’ সেই স্ত্রীধন ভেঙেই এই দোকান | ‘মায়ের আশীর্বাদ সু হাউস ‘| এই দোকান থেকেই ছোট্ট ছেলেকে বড় করে তুলেছে | কে কি লজ্জা পেল‚ কে কি বলল তাতে তার কিছু যায় –আসে না | দোকানে বসে সে অপেক্ষা করে পরবর্তী কাস্টমারের ।।
——————————————————

জলি চক্রবর্তী শীল পরিচিতিঃ
পেশাগতভাবে একজন কম্পিউটার অপারেটর একটি সওদাগরী আপিসে। নেশা বই পড়া এবং কিছু লিখতে চেষ্টা করা। জলির লিখতে ভালো লাগে সেইসব প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে,জীবন যাদের কাছে প্রাত্যহিক লড়াইয়ের নাম। এক টুকরো রুটি বা এক থালা ভাতের কদর যেখানে সবচেয়ে বেশি সেইসব মানুষদের সুখ-দুঃখ-বেদনা-ভালোবাসার দৈনন্দিন গাঁথাই জলির লেখার উপজীব্য।
