Shadow

মুঠোবন্দী দুঃখ-সুখ – শ্রুতি দত্ত রায়

PC DepositPhotos
” মুঠোবন্দী দুঃখ–সুখ “
শ্রুতি দত্ত রায়

(এক)

শর্মিলার গল্প:

রাত প্রায় পৌনে বারোটা বাজে। শর্মিলা ওর মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে শোবার ঘর লাগোয়া ছোট্ট এক চিলতে বারান্দাটায় মোড়া পেতে বসলো। বর্ষাকাল। একনাগাড়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। আশেপাশের বেশিরভাগ বাড়ির আলো প্রায় নিভে গেছে। ঘুমের চাদর গায়ে জড়িয়ে একটু একটু করে নিঝুম হয়ে যাচ্ছে গোটা পাড়া। রাস্তার জলে ভেজা, ঘোলাটে, টিমটিমে স্ট্রিট লাইটগুলো, আর দুই একটা নেড়ি কুকুর ছাড়া এই সময় কারো অবশ্য জেগে থাকার কথাও নয়। একটু আগেই শর্মিলাও ওর বছর দশেকের একমাত্র ছেলে রাতুলকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছে। গোটা পাড়ায় এখন হয়তো শুধু শর্মিলাই রাতের খাবার আগলে জেগে আছে অসীমের ঘরে ফেরার অপেক্ষায়। ডাক্তারদের চেম্বারের রোগী দেখা শেষ হলে তবেই অসীমের মতো ছোটখাটো ওষুধ কোম্পানির এম. আর. দের সুযোগ ঘটে চেম্বারে ঢোকার , ব্যাগ ভর্তি স্যাম্পেল ফাইল দেখিয়ে, ওষুধের গুণাবলী ন্যারেট করে, ক‘খানা নতুন ফাইল টেবিলে রেখে আসার। প্রায় দিনই তাই বেশ রাত হয় শর্মিলার বরের বাড়ি ফিরতে। প্রতিদিনের টার্গেট অ্যাচিভ করতে না পারলে কোম্পানি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে, বাড়িওয়ালাও রেহাই দেবে না। তখন বউ বাচ্চা নিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে অসীমকে। মরতে হবে না খেয়ে। তার উপর ওদের সন্তান রাতুলও তো সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চা নয়। স্প্যাস্টিক ডিপ্লেজিয়ায় আক্রান্ত। শরীরের উপর অংশ দেখলে কিছুই বোঝার উপায় নেই।কিন্তু কোমর থেকে তার দুটি পায়ের পেশী একেবারেই শক্ত। হাঁটতে গেলে একটা হাঁটু অন্যটার সঙ্গে ক্রশ করে যায়। সবটা মিলিয়ে শর্মিলা অসীমের দুই কামরার ভাড়া বাড়ির সংসারে দারিদ্র্য ,অসুস্থতা, অনিশ্চয়তা, মন খারাপের একটা গুমোট বাতাস যেন সবসময়ই খেলা করে বেড়ায়। 

           প্রতিদিনের মতো অপেক্ষা করতে করতে আজও শর্মিলা ওর মুঠোফোনটা খুলে বসলো। এই সময়টুকুই শর্মিলার একান্ত নিজের। এই সময়টুকুই সে শুধু বাস্তবের কাঠিন্য থেকে সামান্য বিরতি নিয়ে বিচরণ করে নীলাভ আলোর এক মায়ানগরীতে। মুখবইতে তার অনেক বন্ধু। বেশিরভাগই অচেনা। তবু তাদের প্রোফাইলে ঘুরে বেড়াতে শর্মিলার বড় ভালো লাগে। বিশেষ করে একটি মেয়ের প্রোফাইলের পোস্টগুলি তার ভারী পছন্দের। নাম সুহানা বাসু। বাঙালি। কিন্তু থাকে নিউজার্সির এডিশনে। এক ঢাল কোঁকড়া চুল। পার্মিং করা মনে হয়। দীঘল টানা দুটি চোখ। টিকালো নাক। মাখনের মতো পিচ্ছিল ত্বক। দামী মেকআপের গুণে যা আরো উজ্জ্বল বলে মনে হয়। আকর্ষণীয় ফিগার। অফ সোল্ডার কালো গাউন, স্লিক সিলভার জুয়েলারিতে একটি অত্যন্ত গ্ল্যামারাস ও স্টাইলিশ লুকসের ছবি ওর প্রোফাইল জুড়ে। নিচে ক্যাপশন “স্টেইং আইকনিক অর অ্যাটলিস্ট ট্রাইং….”। একবার দেখলে ছবিটার দিকে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। মেয়েটিকে নিয়মিত স্টক করে শর্মিলা। ওর সুখী সুখী জীবনের প্রতি এক অদ্ভুত টান বোধ করে। মেয়েটি কখনো ঘন নীল ফ্লেয়ার্ড ফ্রক পরে দাঁড়িয়ে থাকে হাডসন নদীর তীরে। কখনো ক্যাটস আই সেপের সানগ্লাসে নিজেকে আরো স্টাইলিশ করে তুলে ক্যাফেটেরিয়ায় বসে লাতে ক্যাফেতে চুমুক দেয়। কখনো বা লাস ভেগাসে মধ্যরাতে কালো সিকুইন বসানো শাড়ি ও ব্যাকলেস হল্টারনেক ব্লাউজে নিজেকে গুছিয়ে নেচে নেচে রিলস বানায়….”আজ কি রাত হোনা হ্যায় কেয়া..…..পানা হ্যায় কেয়া…. খোনা হ্যায় কেয়া..…..” কখনো বা টাইম স্কয়ারের কোন রুফটপ বারে দোতলা বার্থডে কেক কাটে। ককটেলের গ্লাস নিয়ে সুদর্শন স্যুটেট বুটেট স্বামীর কোমর জড়িয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকে। হাতে ঝলসায় হীরের ব্রেসলেট। কিটি পার্টিতে যায়। সেখানে সব মেয়েরা একই থিমের পোশাক পরে।ক্যাপশনে লেখে “বেবস্“। সোলোট্রিপে দিব্যি কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে বনে বাদারে ঘুরে বেড়ায়।           

            সুহানার প্রোফাইলে ঢুকলে ওর এই পরিপূর্ণ সুখী জীবনের রামধনু রঙের ছোঁয়ায় কিছুক্ষণের জন্য রঙিন আলোয় ভরে ওঠে শর্মিলার অসুখী মনটাও। কিন্তু স্বপ্নের ঘোর কাটে যখন মাঝরাত পেরোলে অসীমের ধ্যারধেরে স্কুটারটা গ্রিলের বাইরে এসে দাঁড়ায়।

                 আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। প্রায় রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ ধ্বস্ত শরীরে রেনকোট জড়িয়ে অসীম এসে উপস্থিত হলো বৃষ্টির মধ্যে। সস্তার বারমুডা–গেঞ্জি পরা ক্লান্ত স্বামীকে ভাত আর মাছের ঝোল স্টিলের থালায় বেড়ে দিতে গিয়ে হঠাৎই নিজের জীবনের সঙ্গে সদ্য দেখা সুহানার ভার্চুয়াল, সচ্ছল, বাঁধনহারা, উচ্ছল জীবনের তুলনা শর্মিলার মনকে ভারী করে তুলল। চোখ দিয়ে নেমে এলো অঝোর ধারা।

বাইরে তখন অন্ধকার পৃথিবীটাও ধুয়ে যাচ্ছে বর্ষার প্রবল বারিধারায়। অবিরাম। নিরন্তর।

(দুই)

সুহানার গল্প:

দুপুর প্রায় দুটো, সোয়া দুটো বাজে। সুহানা জাস্ট কিছুক্ষণ হল ম্যানহাটনে ঢুকে আপাতত টাইম স্কয়ার ক্যাফেতে এক কাপ কফি নিয়ে বসেছে। আজ এডিশন থেকে এখানে পৌঁছাতে গাড়িতে প্রায় ঘন্টাখানেক লাগলো। পথে আসতে আসতে ওয়েদার হঠাৎই বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি আর ঝড়ো বাতাস সঙ্গে নিয়ে সুহানা পৌঁছেছিল ম্যানহাটনে। আজ ড্রাইভ করে এসে কেমন যেন একটা ক্লান্ত লাগছে। এমন তো কতই ড্রাইভ করে সুহানা। কিন্তু তবু আজ কি কারনে যে টায়ার্ড লাগছে বুঝতে পারল না সে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মিররে চোখের তলায় হালকা কালির আস্তরণ দেখতে পেয়েছিল। তাই সেজেগুজে বের হবার আগে কনসিলার আর ফাউন্ডেশন দিয়ে ভালো করে ব্লেন্ড করেছিল চোখের তলায়। তবুও এখনো যেন কিছুটা ডার্কনেস রয়ে গেছে। সানগ্লাসটা দিয়ে চোখ দুটো ঢেকে ক্যাফের টেবিলে বসে দুই তিনটে সেলফি নিলো সুহানা। তারপর মোবাইলে সামান্য এডিটিং করে পোস্ট করল ওর ফেসবুক পেজে। হোয়াইট ফ্লোরাল প্রিন্টেড স্পেগেটি টপ ও হালকা পার্লের সেটটাতে খুবই গ্ল্যামারাস দেখাচ্ছে এখন ওকে। ফটো পোস্ট করার দশ মিনিটের মধ্যেই প্রশংসা সূচক কমেন্টে ভরে যেতে লাগলো সুহানার মুখপুস্তিকার একাউন্ট। তবুও সুহানার মন কিছুতেই আনন্দে ভরে উঠছিল না। 

           ফেসবুকের চেনা অচেনা কোন বন্ধুরাই তো জানে না, এই কালো চশমাটার আড়ালে কত কালিমা লুকিয়ে রয়েছে। গতকাল রাতেই যেমন নিজের সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ভাস্করকে কাছে টেনে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল সুহানা। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও ব্যর্থ হয়েছে। আসলে প্রতিটি মানুষের ভেতরেই বোধহয় বাস করে বিভিন্ন মানুষ। বিচিত্র তার উপস্থিতি। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী এক এক জন মানুষের কাছে সে এক এক রূপে ধরা দেয়। বাইরের মানুষের কাছে সুহানার হাসব্যান্ড মিস্টার ভাস্কর বসু মোস্ট হ্যান্ডসাম কর্পোরেট জেন্টলম্যান হিসেবে পরিচিত। সামাজিক ভাবে অত্যন্ত পপুলার। সকলের সঙ্গেই তার খুবই উষ্ণ সম্পর্ক। অথচ সেই মানুষটিই বেডরুমের চার দেয়ালের মাঝে একেবারে বিপরীত একজন চরিত্র। সুহানার সঙ্গে তার সম্পর্কের শীতলতা যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের হিমবাহ। ভাস্করের আলিশান বাংলোর দামী আসবাবগুলোর মতই একটি সুন্দর সৌখিন শোপিস যেন সুহানা। সমাজের সামনে যাকে সাজিয়ে গুছিয়ে স্ত্রী হিসেবে পরিবেশন করে ভাস্কর। অথচ সুহানার মনের খবর রাখার সময় তার নেই। টাকা আর ক্ষমতার লোভ তার সমস্ত আবেগ যেন শুষে নিয়েছে। এমনকি স্বামী–স্ত্রীর সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক, সন্তানের আকাঙ্ক্ষা….সেসব থেকেও যেন ভাস্কর কয়েক যোজন দূরে। ভাস্করের দৃষ্টিভঙ্গিতে সন্তান কেবলই একটা অকারণ বোঝা, স্বাধীন জীবনের অন্তরায় মাত্র। আর তাই সুহানার সবকিছু থেকেও কিছুই নেই যেন। থাকার মধ্যে আছে শুধু দেখনদারি বৈভব আর অনন্ত নিঃসঙ্গতা। এই একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতেই তাই সে নিজেকে ব্যস্ত রাখে কিটি পার্টি, সোলো ট্রিপ, সাজ পোশাক, মেকআপ আর শপিং মলগুলোর এন্তার কেনাকাটার মধ্যে।                   

      নিজের পোস্ট করা সেলফির প্রশংসা পড়তে পড়তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো সুহানার বুক চিরে। আনমনে স্ক্রল করতে লাগলো অন্য পোস্টগুলো। হঠাৎই নজর আটকে গেল শর্মিলা ঘোষের একটা পোস্টে। সুহানার ভার্চুয়াল জগতের একজন অচেনা বন্ধু এই শর্মিলা। থাকে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে। ভারী মিষ্টি দেখতে। পান পাতার মত মুখ, এক ঢাল রেশমের মতন চুল, টকটকে লাল সিঁদুর, একটু হালকা লিপস্টিক ছাড়া সম্পূর্ণ মেকআপ হীন একটি স্নিগ্ধ চেহারা। একটু স্থুল শরীরে অতি সাধারণ একটি ধনেখালি শাড়ি পেঁচানো। ছবিতে মেয়েটি দুই হাত দিয়ে অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে একটি বছর দশেকের ছেলেকে। মাতৃমুখী ছেলেটিও ভারী মিষ্টি। মা ও ছেলের দুজনের মুখই উজ্জ্বলতায় ভরা কোন এক অজানা পুলকে। 

             অপলক দৃষ্টিতে সুহানা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো মাতৃত্বের এই অসাধারণ রূপের দিকে। তারপর ঢুকে পড়লো শর্মিলার টাইমলাইনে। সেখানে ওয়াল জুড়ে মা ও ছেলের বিভিন্ন ছবি। শিশুকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কত শত ছবি। বেশিরভাগই মায়ের সাথে সন্তানের। কোনটা পার্কের দোলনায় বসা, কোনোটা বা মেলায় “বুড়ির চুল” হাতে নিয়ে, কখনো বা ঘরে নিতান্ত আটপৌরে অবস্থায় জন্মদিনের পায়েসের বাটির সামনে। সব ছবিই আবক্ষ। তবে ছবিগুলিতে দুজনেরই হাসি হাসি মুখ। সুহানার মনে হল প্রতিটি ছবি থেকে যেন স্নেহসুধা ঝরে পড়ছে। এক আশ্চর্য মন আর্দ্র করা ভালো লাগা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল সুহানাকে। আর পরক্ষণেই এক অদ্ভুত শূন্যতাবোধ গ্রাস করতে শুরু করল সুহানার সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে। হঠাৎই হুহু করে ওর চোখ দিয়ে বাঁধনহারা কান্নার স্রোত নেমে আসতে লাগলো। কফি কাপে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া লাতের ওপরের নকশা ভেঙে যেতে লাগলো সুহানার টপ টপ করে ঝরে পড়া অশ্রুবিন্দুতে। ক্যাফেটারিয়ার কাচের দরজার ওপারে তখন ম্যানহাটনের শহরও বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে যাচ্ছে।

গল্প কথা ফুরোলো:

        এভাবেই এই বিপুলা ভার্চুয়াল পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে কোন না কোন শর্মিলা আর সুহানারা নিভৃতে চোখের জল ফেলে। বাইরের পৃথিবীও ভিজতে থাকে ওদের গোপন আবেগে.… অসংখ্য না পাওয়ার যন্ত্রণায়। মাঝে শুধু রূঢ় বাস্তব হয়ে আঁকা থাকে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের কাল্পনিক রেখাটুকু ।।
—————————————————–

শ্রুতি দত্ত রায় পরিচিতি:
সুন্দরী ডুয়ার্সের মফস্বল শহর জলপাইগুড়িতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পেশায় সরকারি বিদ্যালয়ের ভাষা সাহিত্যের শিক্ষিকা। ভালবাসেন গান শুনতে, বই পড়তে, ডুয়ার্সের প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়াতে। আর গান গাইবার মধ্যে খুঁজে পান মুক্তির স্বাদ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!