
পলাতক
মণি ফকির
ভন্টু বাবু কে মনে পড়ে?
আমাদের ভন্টু ডাক্তার রে।
কেউ বলত দাদা, কেউ কাকু;
অনেকে নাম ধরে ডাকত।
তাস, দাবা খেলে বেড়াত,
পসার তেমন ছিলনা।
গভীর রাতে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে, বা নকল মেডিক্যাল সার্টিফিকেট, এসবের জন্য ছিল তার নামডাক।
বড়রা পরিহাস করে বলতেন ভন্টু ডাগতার ফ্রম ডেক্কা।
লোকে নেহাৎ চক্ষুলজ্জার খাতিরে, নাম মাত্র ভিসিটে ওনাকে দেখাত।
মাঝে মধ্যে এম আর দের ডেকে বলতেন “একটু দেখো ভাই“।
ভন্টু দা কে, কেউ খুব উঁচু চোখে দেখতো না,
আবার খুব একটা নীচু চোখেও নয়।
বলতে গেলে, গোটা পাড়ায়, উনি ছিলেন
সবচেয়ে গুরুত্বহীন, একা,একটি মানুষ।
কোনো আত্মীয় পরিজন, কস্মিনকালেও কেউ দেখেনি।
মাঝে মাঝে, দূর সম্পর্কের এক ভাগনে আসত।
একটা ঘটনার পর, হঠাৎ সব কিছু কেমন বদলে গেল।
সেদিন মহালয়ার রাত।
রেডিও মাথার কাছে নিয়ে শুতে যাব,
হঠাৎ ভয়ানক শোরগোল।
রুবিদের বাড়ির সামনে, কারা একটা বডি ফেলে দিয়ে গেছে!
ঝামেলার ভয়ে কেউ এগোচ্ছেনা।
ভীড় ঠেলে, এগিয়ে এল ভন্টু দা।
নাড়ি ধরে বলল, নাঃ
“এখনো যায়নি, তোল ওকে“
কাছে গিয়ে দেখি যতীন, পাড়ার হরিশ উকিলের ছেলে।
তারপর?….
সেই দুঃসহ রাতটা, কোনদিনও ভুলবোনা।
সীমিত সরঞ্জাম আর অদম্য উৎসাহ নিয়ে লড়ে গেল ভন্টু ডাগতার।
আমরাও হাত লাগালাম, যত টুকু পারি।
ভোরের দিকে, বাতাসে তখন “ইয়া দেবী সর্বভূতেষু, শক্তি রূপেণ সংস্থিতা“
চোখ মেলল যতীন।।
ভন্টুদার চোখে, তখন কুয়াশার জল।
বিশ্বাস কর আমি পালাইনি, পালিয়ে আসিনি।
শুনেছিলাম মিলিটারি থেকে পালিয়ে এসেছিল ভন্টুদা।
আমার আর জানা হয়নি কেন? কিভাবে……..
তবে আমি জানি,
আর যাই হোক, ভন্টু ডাক্তার পলাতক নয়
এই ঘটনার পর একদিন, ভন্টু দা পাড়া ছেড়ে চুপচাপ চলে গেল।
অনেক পরিহাসের যোগ্য জবাব দেওয়ার সুযোগ পেয়েও, না দিয়ে।
…….………..
যতীন এখন, সুস্থ জীবনে ফিরে ডাক্তার হয়েছে
কোনো একান্ত মূহূর্তে, চুপ করে বসে ভাবি,
জীবনের কিছু অঙ্ক, কখনোই মেলে না।
আজও আমার চোখ, পথে ঘাটে ওনাকে খোঁজে।
কখনও কোথাও যদি দেখা হয়ে যায়?
বলব “আরে মশাই, আপনি তো সেই পলাতক হয়েই রয়ে গেলেন “।
————————————————————–

মণি ফকিরের জন্ম শিল্পনগরী বার্ণপুরে। সাহিত চর্চার অভ্যাস ছাত্র জীবন থেকেই। অনুপ্রেরণা মা ও মামার কাছ থেকে। প্রথম কবিতার বই *মণি ফকিরের পদাবলী* প্রকাশিত হয় ২০১৮ পূজোয়। গল্পকারের মূল বৈশিষ্ট্য তার গল্প বোনার ও বলার সাবলীল ধরন। গল্পের শেষে কিছু না বলা কথার প্রচ্ছন্ন ঈঙ্গিত মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।।
