আলোর আশায়
দেবদত্ত বিশ্বাস
“স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে কে বাঁচিতে চায়” - গত শতকের প্রথমার্ধে উচ্চারিত এই কথা গুলোর অর্থ খুঁজতে গেলে আজ হয়রান হয়ে যেতে হয়। ‘স্বরাজ আমাদের জন্মগত অধিকার’ - মানুষের যখন কথাবার্তায়, চালচলনে, জীবনযাত্রায়, খাদ্যাভ্যাসে, বা কোনো কিছুতেই অধিকার থাকেনা, তখনই একমাত্র অন্তর থেকে এই আর্তনাদ উচ্চারিত হতে পারে। জলের ভিতরে থেকে মাছ কি করে জলের অভাব বুঝবে? এপ্রিল মাস থেকে সরকার বাহাদুর বলেছেন বাড়ির বাইরে বেরোবেন না। এই আদেশ শুনেই পরের দিন ততধিক মানুষ বাইরে বেরিয়ে পড়েছেন। এরপর থেকে আজ পনেরই আগস্ট অবধি যতো দিন এগিয়েছে , এক অদৃশ্য পরাধীনতার সাঁড়াশি যেন আমাদের সকলের গলা চেপে ধরেছে। তিয়াত্তর বছরের স্বাধীন দেশে এটুকু পরাধীনতা (নিজেদের স্বার্থে)র স্বাদও আমাদের তিক্ত লাগছে । আসলে সাতচল্লিশে প্রায় দুশো বছরের পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার পর থেকেই স্বাধীনতাকে আমরা...
মুক্তি
ব্রতী ঘোষ
রাসেল স্ট্রিটের এই রাস্তায় কতবার যে এসেছি ৷ কিন্তু কখনো আজকের মতো মনে হয় নি তো !! রাস্তাটা কি অসম্ভব সোজা ভাবে চলে গেছে ৷ রাস্তার দুপাশে কার পার্কিংএ সারি দিয়ে অফিসের গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে ৷ মাঝে মাঝে হুস হুস করে চলে যাচ্ছে এক একটা গাড়ি ৷ এখানেই উৎপলের অফিস। কতবারই তো এসেছি এই অফিসে ৷ এরকম অদ্ভূত তো কোনদিন লাগেনি ৷ কতবারই তো নিউ ইয়ার্সের আগের রাতে পার্কস্ট্রীটে রাত কাটাব বলে বায়না করেছি উৎপলের কাছে। কিন্তু ও কিছুতেই এসব কথায় কান দিতো না ৷ বলতো "ও সব লোক দেখানো ! কিছু করার নেই-শুধু সারারাত ধরে মদ খেয়ে স্ফুর্তি করা-সে আমার দ্বারা হবে না ৷ তার থেকে চলো দীঘা ঘুরে আসি ৷"
"ধুর ! এই এক দীঘা-ও অনেকবার গেছি,আর যাবো না ৷"
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কখন যে উৎপলের অফিসের গেট দিয়ে ঢুকে পড়েছে জয়িতা খেয়ালই করে নি ৷
উৎপলের অফিসটা একটা বেসরকারী অফিস ৷ মালিক আগরওয়ালজি মানুষ ভালো ৷ উ...
ক্যালেন্ডারের হেমন্ত
দেবলীনা সরকার
দুব্বোঘাসে হীরের কুচি
ঝরছে শিশির ভোর বেলা
হিমঋতু ওই শরৎ শেষে
তাই বিধাতার এই খেলা।
আজ ইস্তক এমন কথাই
শুনছে দিদার কোল ঘেঁষে
ছোট্ট তোজো ভাবছে শুধুই
হাতটি গালে, আঁক কষে!
শপিং মলের শো কেসে সে
হীরের কুচি দেখতে পায়
কি করে তা আসতে পারে
দুব্বো ঘাসের গায়, মাথায়?
ঠাম্মা দিদা বলতে থাকে
কতোই কথা তাল বেতাল
মেলে না তার অঙ্ক গুলো
যোগবিয়োগে নাজেহাল।
দাদাই এসে বল্লে হেসে
চল দাদুভাই মাইল আট?
হাঁটতে গিয়ে গার্ডেনেতে
পাবোই দেখতে হীরের ঠাট!
আটটি মাইল হাঁটবে!ভেবে-
ভ্যাঁ করে সে দেয় কেঁদে
ওরা যেন ফিকির করেই
ফেলছে তাকে জাল ফেঁদে
তবু দাদাই বলছে যখন
যেতেই হবে একটিবার,
দুব্বো ঘাসের মাথায় হীরে-
কচু পাতায় মোতির হার!
হাঁটতে থাকে দুইটি প্রদীপ
গার্ডেনেরই ধার ঘেঁসে
কোথায় হীরে? মোতিই কোথায়?
আছে কোথায়? কোন বেশে?
কে যে সঠিক, কে-ই বা বেঠিক
ভরতে থাকে চোখে...
কবির বিস্মরণ ?
অগ্নিমিত্র ভট্টাচার্য্য
রবীন্দ্রসঙ্গীতে নিবেদিতপ্রাণ,সঙ্গীতসাধক শ্রী শৈলজারঞ্জন মজুমদার মহাশয় তাঁর অসামান্য স্মৃতিকথা "যাত্রাপথের আনন্দগান" গ্রন্থে তাঁর জীবনে রবীন্দ্র সান্নিধ্যের বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। সকল ঘটনাই যদিও বহুপঠিত,তবু বার বার,বিশেষ বিশেষ কিছু ঘটনার কথা পড়লে শৈলজাবাবু ও রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ট ও সহজ সম্পর্কের মধুর ছবি মনে ভেসে ওঠে। সেই সব অনুপম মুহুর্তের ঘটনাবলীর মধ্যে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক হল শান্তিনিকেতনে ১৯৩৯ সালের বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠানের জন্য কবির কাছ থেকে শৈলজাবাবুর পছন্দের ও ফরমায়েশের একাধারে পনেরটি গান সুকৌশলে আদায় করে নেবার কাহিনী! সেই বহুপঠিত পনেরটি গান রচনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার মধ্যে না গিয়ে, আমি আজ কেবল একটি মাত্র গান রচনার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করবো,তার প্রেক্ষিতে আমার ব্যক্তিগত অভিমত ব্যক্ত করবো এবং পরিশেষে পাঠককুলের নিরপেক্ষ মতামত আশা কর...
শিউলি সুরভি রাতে
মধুমিতা মিত্র
শ্রাবণের শেষ ভাগে জন্ম মেয়েটার, নামটা শ্রাবণী না হয়ে বাবা পিসীদের শখে হলো একটা আধুনিক নাম। সেই নামের সৌন্দর্যও গেল আধুনিকতার জোয়ারে ভেসে, চারিদিকে খালি সেই নামেরই ছড়াছড়ি। সে যাই হোক শ্রাবণ মাসে জন্ম হওয়ায় একটা লোকসান মেয়েটার, মায়ের কায়দায় প্রতি বছর মায়ের দেওয়া জন্মদিনের আর পূজোর জামা হতো একটাই। মায়ের যুক্তি শ্রাবণের পর ভাদ্র পেরিয়েই আশ্বিন, তাই জন্মদিনে নতুন জামা একবার পরে তুলে রাখলে সে জামা নতুনই থাকে, আর পূজোর সময়তেই সে জামা নতুন হিসেবেই পরা যায়। তখনকার দিনে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিতে এমন রীতিই প্রচলিত ছিল। বাহ্যাড়ম্বরকে যথাসম্ভব গুরুত্বহীন করে রাখা। কলকাতার উপান্তে ভারী খোলামেলা রেলকলোনীতে ছিল এই মেয়েটির বাস। সামান্য ছোট সহোদর তার সর্বক্ষণের সাথী। মা বাবা কর্মস্হলে বেরিয়ে গেলেই ভাই বোন দুটি কেমন পাখনা মেলে উড়ে বেড়াতো রেলকলোনী...
গবেষণা
পল্লব চট্টোপাধ্যায়
আরে না না, এটা আমার পি-এইচ-ডির থিসিস নয়। সম্প্রতি এ দেশে গো-জাতি নিয়ে নানাবিধ চর্চা হচ্ছে। গরু আমাদের মাতা এবং গোমাংস ভক্ষণ পাপ হলেও গোমুত্র ইত্যাদি পানে যে সর্বরোগহারিণী সুধা আছে বা গোদুগ্ধে সোনা বা তার কিছু লবণ বর্তমান তাও বিশ্বাস করা হচ্ছে। কোন বিতর্কের মাঝে যাব না, কিন্তু এই দেশে ইদানীং গোভক্তি অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে, নিঃসংশয়ে ভাল কথা, তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে থাকতে গেলে গো-জাতি সম্বন্ধে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। অবশ্য জ্ঞান থাকলেই যে সর্বত্র তার প্রদর্শন করতেই হবে তার কোনও মানে নেই - মাথা তো বাপু একটাই! তাই বলে গরু সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ জ্ঞানলাভও করতে নেই? ‘গো+এষণা’- সে-ই তো গবেষণা, মানে গরু খোঁজা। অবশ্য রিসার্চের সঙ্গে গরু-খোঁজার কী সম্পর্ক সেটা বলার মত জ্ঞান আমার নেই, আমি বরং যতটুকু জানি, সেটুকুই বলি।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আসি ‘গো’ শব্দটিতে। ‘গো’ সংস্কৃত শব্দ।...
স্বাধীনতা দিবসে প্রাজ্ঞ
প্রবীণদের স্মৃতি রোমন্থন
নিখিলরঞ্জন বিশ্বাসের স্মৃতি রোমন্থন
১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের এই শুভ দিনটি প্রতিবছর ফিরে ফিরে আসে। যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে আমরা এই দিনটি পালন করি। সমস্ত সরকারী বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই দিনটি পালিত হয় সসম্মানে। দিনটি অনেকের কাছে শুভবার্তা বহন করে আনলেও, আমাদের মতো ভিটেমাটিহারাদের কাছে তা ছিল চরম বেদনাদায়ক। এই দিনে আমরা জানতে পেরেছিলাম বিভক্ত হয়ে গেছে ভারতবর্ষ। আমাদের আজন্মকালের বাসভূমি ত্যাগ করতে হবে, কারণ পূর্বতন নদীয়া জেলার আলমডাঙা থানার চুয়াডাঙা সাবডিভিশনের মুন্সীগঞ্জের জেহালা গ্রামে থাকা আর সম্ভব নয়। অল্পদিনের মধ্যেই কিছু মানুষের অত্যাচারে সর্বহারা নিঃস্ব হয়ে আমরা ভারতে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। লাখ লাখ হতভাগ্য মানুষের তখন একটাই গন্তব্যস্থল ভারত। সর্বস্বান্ত হয়ে এক অজানা অচেনা অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা। সেকি করু...
প্রতারণা
অঙ্কন দন্ড
খড়গপুর স্টেশনে নামতেই জয়কে ফোন করল শ্রী। জয়ের ফোন বন্ধ। আরও কয়েকবার জয়কে ফোনে পাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ শ্রী। অবশেষে ক্লান্ত শরীরটাকে রাখলো স্টেশনের একটি বেঞ্চে। শ্রী-কে স্টেশন থেকে নিতে আসার কথা ছিল জয়ের, কিন্তু সে এখনও এসে পৌঁছয়নি ।
একটু ভালোবাসার সন্ধানে নিজের স্বামী ধ্রুব ও বছর ১৩ এর মেয়ে রিম্পাকে ছেড়ে সে ছুটে এসেছে জয়ের কাছে,ঝাড়গ্রাম থেকে খড়গপুর, কাউকে না জানিয়েই। আসার আগে টেবিলে রেখে এসেছিল একটা চিঠি। যেখানে লেখা ছিল,"ধ্রুব,আমার পক্ষে এই তিক্ত জীবন কাটানো আর সম্ভব নয় । ১৫ বছর ধরে সংসার করছি তোমার সাথে। জানি, তোমার প্রাইভেট জব। তাই বলে কি তোমার থেকে একটুও সময় পেতে পারি না আমি? আমারও কিছু চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে। রিম্পা আসার পর থেকে একা হাতেই মানুষ করতে শুরু করেছি ওকে। আর না,এবার ওকে তুমিই দেখো।জানি, তোমার জীবনে আমি গুরুত্বহীন। তুমি মত্ত থাকো তোমা...
আলোকের এই ঝর্ণাধারায়
অনসূয়া সরকার বিশ্বাস
(১)
সকাল থেকেই মাথাটা ভার হয়ে আছে শ্রীলেখার। কেমন যেন একটা গুমোট লাগছে। জানালার পর্দা সরিয়ে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, বাগানে গন্ধরাজ গাছটার দিকে। ফুলে ফুলে ভরে গেছে গাছটা। সন্ধ্যে হলেই সুন্দর গন্ধে চারদিকটা ভরে যায়। এই গাছটা টিডো আর শ্রীলেখা একসঙ্গে লাগিয়েছিল। মাঝে মাঝে বড্ড নিঃসঙ্গ মনে হয়। কে আছে তার টিডো ছাড়া? দেবাশীষ চলে যাবার পর ওই তো তার শিবরাত্রির সলতে। অদ্ভুত শীতল সম্পর্ক তাদের মা ছেলের। অথচ ছোটবেলায় কি ন্যাওটাই না ছিল টিডো ! আর আজ ! হাজার চেষ্টা করেও দশ বছর ধরে এই দুর্লঙ্ঘ্য্ সীমারেখা অতিক্রম করতে পারেনি শ্রীলেখা। ক্লাস নাইন থেকেই বাইরে পড়া শুরু করলো। কাছ ছাড়া করতে মন চাইতো না। কিন্তু ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে মৌন থেক...