
আত্মদর্শন
সোনালী গুহ
স্লেট-রঙা আকাশের কোল থেকে উঁকি দিচ্ছে শ্রাবণী পূর্ণিমার চাঁদ। অসাধারণ এক আলো-আঁধারি পরিবেশ। বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে নবতিপর রেখাদেবী গভীর চিন্তামগ্ন।
যাদবপুরের এই দোতলা বাড়িটি তাঁর স্বামী অবসরের সময়ের প্রাপ্ত টাকা দিয়ে বানিয়েছিলেন অনেক শখ করে। সামনের এক টুকরো বাগান তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ফুলে ফুলে ভরে থাকত বারো মাস। সকাল-বিকাল তাঁর বাগানেই কেটে যেত। তারপর সন্ধ্যায় এই দোতলার বারান্দায় দু’জনে বসতেন চা নিয়ে। নানান গল্প করতে করতে কখন যে রেডিওতে খবরের সময় হয়ে যেত, বুঝতেই পারতেন না ওঁরা। তখন ঘরে ঢুকে রেডিও চালিয়ে সুকুমারবাবু সেই রাত দশটা পর্যন্ত বসে থাকতেন। অসম্ভব ভালো গানের গলা ছিল ওঁর। কখনও নিজের মনে গান গাইতেন।
একটিই সন্তান। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের স্নাতক। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে থাকত। স্বামী-স্ত্রীর নিভৃতবাসে ছিল শান্তির বাতাবরণ।
কিন্তু “শান্তি কোথায় মোর তরে হায় বিশ্বভুবন মাঝে, / অশান্তি যে আঘাত করে, তাই তো বীণা বাজে!”… গানটা আজ রেখাদেবীর মনে পড়ল। কর্তা খুব গাইতেন। এক ভোরে ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন কর্তামশাই তাঁকে একা করে। সেই থেকে এই বারান্দায় বসেই সময় কাটে তাঁর, একাকী স্মৃতি রোমন্থন করে।
দু’বছর হল ছেলে বিদেশেই চাকরি নিয়ে, বিয়ে করে স্থায়ী সংসার পেতেছে। দিনান্তে ফোনে মায়ের খবর নেয়, এই পর্যন্তই। তাই রেখাদেবীর একলাই দিন কাটে।
এইভাবেই চলছিল, কিন্তু আজ পূর্ণিমার চাঁদ তাঁকে বড় উতলা করে তুলেছে। কেন জানি মনে হচ্ছে বেশি করে পুরনো দিনের কথা। ছোটবেলার কথা, কলেজের সেই দিনগুলি। কমলনাথের সঙ্গে বন্ধুত্ব, ক্রমে প্রেম। বাড়ির তীব্র আপত্তি। তবুও দু’জনেই বেপরোয়া, উদ্দাম। পরিণতির করুণ দিকটি জেনেও এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় দু’জনের অকস্মাৎ কাছে আসা। জানালার পাশে বৃষ্টি বাজছে, পৃথিবী ধুয়ে যাচ্ছে অবিরাম বৃষ্টিতে। নির্জন হোস্টেলের নির্জনতম গৃহকোণে দুটি প্রেমিক প্রাণ নিবিড় আলিঙ্গনে মত্ত… এতগুলো বছর পেরিয়ে সেই অপূর্ণ প্রেমের অনুভূতি আজ কেন জেগে উঠল!
বিয়ের পর স্বামীকে যখন কমলনাথের কথা বলেছিলেন, সব কিছু বললেও এই সন্ধ্যাটি ছিল কেবল দু’জনেরই। আজ সে কোথায় কে জানে! তারও কি মনে পড়ে!
রেখাদেবীর ছ’মাস হল ক্যান্সার ধরা পড়েছে। একা একা ডাক্তারের কাছে গিয়ে দেখিয়েছিলেন। জানাননি ছেলেকে, অভিমানে। যে ছেলে মা ছাড়া কিছুই জানত না, সে আজ কত দূরের মানুষ। এটাই স্বাভাবিক। নিজের বৃত্ত তৈরি করার পর সময় নেই বৃদ্ধা মায়ের জন্য। টাকা পাঠায় মাঝে মাঝে। কর্তার রেখে যাওয়া টাকায় তাঁর ভালো মতোই চলে। ডাক্তার বলেছেন, শেষ স্টেজ। রোগটা ছড়িয়ে পড়েছে। আশ্চর্য, তেমন কষ্ট কিছু নেই। প্যালিয়েটিভ কেয়ার অর্থাৎ, ব্যথা অনুভব যাতে না হয়, সেই মরফিন দিয়ে চিকিৎসা চলছে। হয়তো পরের শ্রাবণ আর আসবে না কাছে।
এই মেঘের ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া চাঁদের শোভা দেখা হবে না আর। তাই কি হঠাৎ কমলনাথ স্মৃতিতে এল!
আজ বড় নির্ভার লাগছে। কর্তার হাতটা যেন মেঘের আড়াল থেকে দেখা যাচ্ছে।
পাশের ছোট টেবিল থেকে মুঠোফোনে ছেলেকে কল করলেন রেখাদেবী। আজ একবারেই বাবু ফোন তুলে ‘মা’ বলে ডাকল।
“এই সময় তো ফোন করো না মা, কী হল?”
“বাবু, আজ তোর গলাটা শুনতে খুব ইচ্ছা হল রে। বাইরে শ্রাবণী পূর্ণিমার চাঁদ, মেঘের আড়াল থেকে দেখা যাচ্ছে। কেমন উথাল-পাথাল করছে মনটা।”
“মা, এখন আমি অফিসে। তুমি এমন করলে কাজ করি কীভাবে!”
“বাবু, আর তো কথা বলা হবে না।”
“সে কী! কেন?”
“মা, মা, আমি সামনের মাসে যাব। তুমি শান্ত হও।”
“আসবি? কিন্তু ততদিন কি সময় পাব?”
“কেন পাবে না?”
“ডাক্তার জবাব দিয়েছেন। ক্যান্সারের শেষ স্টেজ। তোকে বিরক্ত করিনি তাই। এত ব্যস্ত তুই।”
“মা! আমায় বলোনি কেন?”
“শোন, যদি আসিস, এই বারান্দায় কিছুক্ষণ বসিস বাবু। আমি আর তোর বাবা বসতাম”…
“মা, আমি এখনই টিকিট বুক করছি। মা গো! আসছি আমি তোমার কাছে…”
ফোনটা কেটে দিলেন রেখাদেবী। এই উদ্বেগপূর্ণ স্বর শুনেই মনটা শান্ত হয়ে গেল যে! পরশ পেলেন যেন বাবুর।
ঘরে এসে শুয়ে পড়লেন। জানালার বাইরে শ্রাবণ মাস। আকাশ কালো করে আসছে। বৃষ্টিটা নামুক। বৃষ্টিটা দেখে যেতে পারলে আর কোনো আফসোস থাকবে না ।।
——————————————————-
![]()
সোনালী গুহ পরিচিতিঃ
পেশায় শিক্ষিকা। মাতৃভাষায় কিছুটা মনের আনন্দে লেখালিখি করেন। অত্যন্ত অমায়িক,সবার সাথে মিলেমিশে,সবাইকে নিয়ে চলতে স্বস্তি অনুভব করেন।
