Shadow

নামদাফার সেই রাতে – সুরজিৎ সরখেল

PC Ei samay

নামদাফার সেই রাতে 

সুরজিৎ সরখেল

 

এবার আমরা তিন বন্ধু, আমি অর্থাৎ সন্তু চ্যাটার্জি ওরফে স্যাটা, বোধন ভদ্র ওরফে বুদ্ধু এবং ছোটন দত্ত ওরফে ছোট্টু,  মিলে ঠিক করলাম, ভারতের সবচেয়ে বড় ও মনোরম রাজ্য অরুণাচলের ভীষণই দুর্গম এবং মোহময়ী প্রকৃতির অফুরন্ত ভাণ্ডার নামদাফা অরণ্যে বেশ কয়েকটা রোমাঞ্চকর দিন কাটাবো। আমরা তিনজনই অবিবাহিত এবং সরকারি কর্মচারী। গত বছর রূপকুণ্ডে ট্রেকিং করতে যাওয়ার সময় আমাদের দলের একজন গুরুতরভাবে আহত হওয়ায়, পরবর্তীকালে আমাদের প্রত্যেকেরই বাড়ি থেকে ট্রেকিং করতে যেতে বিধিনিষেধ জারি করা হয়। আমরা ঠিক করলাম ডিব্রুগড় পর্যন্ত আকাশ পথে যাব এবং তারপরে ক্যাব ভাড়া করে একেবারে মিয়াও পর্যন্ত চলে যাব! খালি সেই রাতে মার্গারিটায় আমরা থাকব একটা হোটেলে। সেই অনুযায়ী আমরা বিমানের টিকিট কেটে ফেললাম পুজোর মধ্যেই! সুদূর বর্মার কোলে ঘুমিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ও বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় প্রাণীদের অবস্থান হিসেবে নামদাফা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অরণ্য! আমাদের সৌন্দর্য-পিপাসু মন সেখানে আনন্দ আহরণের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল!

নির্দিষ্ট দিনে আমরা যার যার লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্টের পেটের মধ্যে যখন প্রবেশ করলাম, কে বলবে এটাই আমাদের প্রথম এয়ার ট্রিপ! আমরা তিনজন বোর্ডিং পাস নিয়ে ভেতরে গিয়ে, কফি আর মোমো খেয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। যথাসময় আমাদের বোয়িং বিমান ছেড়ে দিল। ছোট্টু জানালার ধারের সিটটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে দুজনের মাঝখানে মাথা নীচু করে গুটিসুটি মেরে বিড়বিড় করে ঠাকুরের নাম জপতে শুরু করল।

আমাদের বোয়িং কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে থাকল। মেঘের অনেকটা নীচ দিয়ে উড়ে যাওয়ার জন্য নীচের সবকিছুই খুবই স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম। বর্ষার সময় এই ব্রহ্মপুত্রকে দেখলে চোখ কপালে উঠে যায়! এতটাই ভয়ংকর লাগে! এখন শান্ত! ভূপেন হাজারিকার গানের কথা মনে পড়ে গেল!

ছোটবেলা থেকেই সবকিছু ভিজুয়ালাইজ করার একটা অভ্যাস আমার নিজে থেকেই গড়ে উঠেছিল! সে পরীক্ষা বা কোনো খেলাধুলাই হোক, কীভাবে তৈরি হব, মনে মনে তার প্যাটার্ন বোনা চলতে থাকে!

অনেকক্ষণ জানালা দিয়ে নীচের ব্রহ্মপুত্র-সহ প্রাকৃতিক দৃশ্য আর ওপরে মেঘেদের লীলায়িত ছন্দ দেখতে দেখতে আগামী দিনে কোথায়, কখন, কী করব, দেখব, এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎই মনের কোনো গহীন কোণে একটা অযাচিত, রোমাঞ্চকর শিহরণ খেলে গেল! এটা কি কোনো অজানা আশঙ্কার আগাম হাতছানি বা কোনো বিপদের পূর্বাভাস!

ডিব্রুগড় এয়ারপোর্টে পৌঁছে সেখান থেকে ক্যাবে করে মার্গারিটা পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে গেল! হোটেল বুক করাই ছিল। শুধু রাতটুকু কাটিয়ে, বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন সকালেই সেই ক্যাবে করে মিয়াও পৌঁছে গেলাম। অরুণাচলের তিরাপ জেলার একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো মিয়াও। এই মিয়াও হলো নামদাফা জঙ্গলে ঢোকার প্রবেশদ্বার। এখানে চেক গেটে ইনার লাইন পারমিট চেক হলো। এটা ছাড়া অরুণাচলে প্রবেশ করা যায় না। আমরা ডেবান বাংলোয় চারটে রাত কাটাবো।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ছোট্টু আর বুদ্ধু বিশ্রাম নিচ্ছে। আমি ক্যামেরা কাঁধে ছবি তোলার জন্য বাইরে এলাম। একটা পাহাড়ি ছোট্ট টিলার ওপর সার্কিট হাউসটা। নীচ দিয়ে নীল জলের নোয়া-ডিহিং নদী সাবলীলভাবে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে। নদীর বুকে মাঝে মাঝে হলুদ চরা পড়েছে! অজস্র সুন্দর সুন্দর রঙিন প্রজাপতি, ফড়িং আর নানা রকমের প্রচুর পাখিতে জায়গাটা পরিপূর্ণ। ফটো তুলে আশ মেটে না! ছোট্টু ডাক দিল। আমাদের এবার ডেবান বাংলোয় নিয়ে যাওয়ার জন্য জিপ এসে গেছে। এই সার্কিট হাউস থেকে ডেবান বাংলো ঘণ্টাখানেকের পথ। নোয়া-ডিহিং-এর তীর ঘেঁষে জিপ উত্তর দিকে চলল। জঙ্গল ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে! বেশ কিছু জায়গাতে জঙ্গল এতটাই ঘন যে বড় বড় মহীরুহের গোড়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না! এখানে প্রচুর হাতি, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিতা, বুনো কুকুর, বাইসন, হুলক গিবন, হরিণ, রেড পান্ডা, নানা ধরনের পাখি ছাড়াও বরফাবৃত অঞ্চলে স্নো লেপার্ড, ক্লাউডেড লেপার্ড কোনো কিছুরই অভাব নেই! তার সঙ্গে উপরি পাওনা একেবারে নিরেট, বুনো প্রাচীন আরণ্যক পরিবেশ! আরো একটা পাওনা যে ছিল আমাদের— তা কল্পনাও করতে পারিনি!

একেক সময় নিজের চোখ, কান আর মনকেও বিশ্বাস করতে পারা যায় না! যুক্তিবাদী মনের সবকিছুই তলিয়ে দেখা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু কখনো কখনো সেই মনের প্রাচীরেও ফাটল ধরে! আমাদের অন্তত সেই রাতে তাই মনে হয়েছিল এবং এখনো ভাবলে গা শিউরে ওঠে! একেকবার মনে হয়েছিল প্রাণ-সংশয় না হয়! যদিও তিনজনেই অক্ষত শরীরে বাড়ি ফিরেছিলাম! ছোট্টুর ভীষণ জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল! এতক্ষণ ভূমিকা হলো! এবার আসল ঘটনায় আসা যাক!

ডেবান বাংলোয় যাওয়ার পথটা অসাধারণ! প্রকৃতিও অকৃপণভাবে যেন সমস্ত অঞ্চলটাকে সাজিয়েছেন! জঙ্গল যে এত ঘন সবুজ চাদরে ঢাকা হতে পারে, অন্য কোথাও এরকম দেখিনি! পাশ দিয়ে নোয়া-ডিহিং তিরতির করে বয়ে চলেছে। সারাটা জঙ্গল জুড়ে এত রকমের পাখি আর প্রজাপতি দেখে এক এক সময় মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত প্রজাপতি আর পাখিদের এখানে কোনো কনফারেন্স চলছে! দু’পাশের পাহাড়গুলো দিয়ে ছোট-বড়-মাঝারি ঝরনা নেমে এসে পথ ভিজিয়ে দিচ্ছে! এই জন্যই এখানে মাটির একটা ভেজা সোঁদা গন্ধ সবসময় নাকে ভেসে আসছে। এই পথে যখন-তখন ধস নামে। আমাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। প্রায় দুই কিলোমিটার আমাদের এখানে লাগেজ নিয়ে হেঁটে আসতে হলো! হঠাৎই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার গাছপালার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা গেল। অজস্র তারায় আকাশ ভর্তি, মনে হচ্ছে প্রকৃতি-মায়ের শাড়ির প্রতিটি অংশে অজস্র হিরের চুমকি বসানো হয়েছে! অবশেষে বাংলোর বাগানে ঢুকে পড়লাম। দারুণ সুন্দর বাংলো, আর ততোধিক সুন্দর তার বাগান। মনে খুশির জোয়ার উঠল সবার। সারাদিন প্রচুর ধকল যাওয়াতে প্রত্যেকের শরীর খুবই ক্লান্ত-অবসন্ন ছিল। বাংলোর চৌকিদার ভগতরাম দারুণ রান্না করেছিল। গরম গরম ভাত, মাটন, আলু-চোখা আর শেষ পাতে আমের চাটনি সবাই গোগ্রাসে গিললাম যেন। আমাদের জন্য একটা ডরমিটরি ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমাদের করিডরের একেবারে কোণের ঘরটা তালাবন্ধ থাকত! আমাদের রাতের খাবার দিয়ে ভগতরাম রাতেই এখান থেকে এক কিলোমিটার দূরে তার বাড়িতে চলে যেত। এই শ্বাপদসংকুল অরণ্যের ভেতর দিয়ে একটা সাইকেল এবং টর্চ সম্বল করে অতদূর যেতে যেকোনো অতি সাহসী মানুষেরই ভয়ে বুক কেঁপে ওঠার কথা! রাতে বাংলোয় না থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করলেই, ও একটু মুচকি হাসি হেসে গম্ভীর হয়ে যেত! এরকম নির্বান্ধব, জনমানবহীন জঙ্গলে রাতটা বেশ দীর্ঘই হয়! তবে উপরি পাওনা কত বিভিন্ন রকম জানোয়ারদের বিভিন্ন রকম চিৎকার, আর তার সঙ্গে বিভিন্ন রকমের পোকামাকড় আর নিশাচর পাখিদের ডাক! সে এক দারুণ কনসার্ট! এ পরিবেশে না থাকলে বোঝা যায় না! এক কথায় অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা, সবার ভাগ্যে সচরাচর যা ঘটে না!

ভগতরাম চলে যাবার পর বাংলোটা যেন আরও নির্জন হয়ে গেল! আমার বিছানাটা ছিল জানলার ধারে। করিডরের শেষ প্রান্তের দরজাটা তালা দেওয়া কেন, আমার মনে একটা খটকা লেগেই থাকত! ছোট্টু আর বুদ্ধু দুজনেই অঘোরে ঘুমোচ্ছে! আমিও কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই! আমার ঘুমটা ভীষণ পাতলা! শেষ রাতের দিকে একটা আওয়াজ পেয়ে মাথার সামনে পাঁচ সেলের বড় টর্চটা নিয়ে জানলার ধারে উঠে এলাম! বাইরে আলো ফেলতেই, একটা প্রচণ্ড, ক্রুদ্ধ, চাপা আওয়াজ করে দুটো জ্বলন্ত চোখ একলাফে উধাও হয়ে গেল! ওরাও দুজন ঘুম থেকে ধড়মড় করে উঠে বসল!

পরের দিন সকালে ভগতরাম কিছু একটা আন্দাজ করে কাঁচুমাচু মুখ করে সদর দরজার গেটের সামনে মাথা নীচু করে কী যেন দেখছিল! আমাদের রাতে আর ঘুম আসেনি। আমরা জানলার ধারে বসে ভগতরামের ক্রিয়াকলাপ দেখছিলাম। আমাদের ঘরে ঢুকে অক্ষত অবস্থায় দেখে, আশ্বস্ত হয়ে বলল, “আপনাদের খাবার ঘরে দিয়ে যাচ্ছি। খাওয়া হয়ে গেলে সব বলব!”

খাওয়া হয়ে গেলে ভগতরাম বলা শুরু করল। গত বছর এক বাঙালি দম্পতি এই বাংলোয় কয়েকদিনের জন্য ঘুরতে আসে। ওই তালাচাবি দেওয়া ঘরটা ওদের জন্য বরাদ্দ ছিল! তিনসুকিয়ার বাসিন্দা ভদ্রলোক কাঠের ব্যবসায়ী। লম্বা-চওড়া চেহারা, এক মাথা ভর্তি বাবরি চুল! মার্জিত ব্যবহার! সারা দেশ জুড়ে কাঠের বিশাল ব্যবসা। কিন্তু ভদ্রমহিলা অসম্ভব রকমের ধূর্ত, লোভী ও স্বার্থপর! পৃথিবীতে বৈচিত্র্যময় স্বভাবের অধিকারী হিসেবে মানুষের মতো দ্বিতীয় কোনো প্রাণী নেই! এই মহিলার সবকিছুই নিজের করায়ত্ত করার এক দুর্দমনীয় বাসনা ছিল! তার জন্য যত নীচে নামতে হোক না কেন, তার কোনো আপত্তি ছিল না! স্বামীর প্রভূত অর্থ সে কেমন করে হাসিল করবে সবসময় সেই চিন্তায় ডুবে থাকত। বিশাল শরীরের এবং বাবরি চুলের অধিকারী মানুষটি স্বভাবের দিক থেকে কিন্তু কোমল ছিলেন। স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন! তাঁদের একটাই ছেলে। বাবার মতনই এক মাথা ভর্তি বাবরি চুল এবং মার্জিত স্বভাবের ছেলে। সে গান-বাজনা, পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকত।

ভদ্রমহিলা তাঁদের গাড়ির ড্রাইভারকে নিজেদের অপকর্মের দোসর বানিয়ে ফেললেন! এই ছেলেটির মধ্যেও শয়তানের সাগরেদ হবার মতন অনেক গুণ ছিল! অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সমস্ত রকমের দুষ্কৃতিমূলক কাজে ড্রাইভার ছেলেটি পটু হয়ে উঠল। ভদ্রলোক ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, তার কাঠের ব্যবসার শেয়ার দুজনে মিলে অনেক দুরভিসন্ধি করে হস্তগত করে ফেলল! কাঠের ব্যবসায় মন্দা শুরু হলো! ওরা নামদাফার এই বাংলোয় কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে এল। এখানে কিছু দূরে একটা ছোট্ট টিলার ওপর একটা বেশ সুন্দর ঝোরা আছে। তার সামনে একটা বিশাল ছাতিম গাছ আছে। ওখানে মায়ুকি বাবা নামে এক নাগা সন্ন্যাসী ওই টিলার ছোট এক গুহাতে থাকতেন। দিনের বেলা ওই ছাতিম গাছের গোড়ায় বসে ধ্যান করতেন। রাতে গুহাতে ধুনি জ্বেলে ধ্যান করতেন। ভদ্রলোক ওঁর সন্ধান পেয়ে নাগা বাবাকে সব খুলে বললে, সন্ন্যাসী সব বুঝতে পেরে দুটো বাঘনখের মালা ভদ্রলোককে সবসময় পরে থাকতে বললেন। সতর্ক করেও দিলেন, কোনো অবস্থাতেই সেই মালা ত্যাগ করা যাবে না! তাহলে বিপদ অনিবার্য! ধূর্ত স্ত্রী গোপনে আড়ি পেতে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে, তার দুষ্কর্মের সঙ্গী সেই ড্রাইভার ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে, রাতের খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে, কাবু করে গলায় ফাঁস দিয়ে ভদ্রলোককে খুন করেন! প্রচুর টাকা দিয়ে স্থানীয় পুলিশের মুখ বন্ধ করলেও নাগা বাবা মায়ুকিকে কোনো মতেই বশ করতে পারলেন না!

এই পর্যন্ত বলে ভগতরাম আমাদের উদ্দেশ্যে বলল, “অনেক দূর থেকে আপনারা এখানে বেড়াতে এসেছেন। আজ আপনারা ঘুরে আসুন। আপনাদের লাঞ্চ রেডি আছে। গাড়ির ড্রাইভারকে বলে দেওয়া আছে। এখানে সন্ধ্যের পর গাড়ি চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কোর এরিয়া তো! জানোয়ারদের মুখোমুখি হয়ে যেতেও পারেন! তবে আপনাদের কোনো ভয় নেই! মায়ুকি বাবা আপনাদের কোনো ক্ষতি করবেন না!”

“তুমি গেটের সামনে মাথা নীচু করে কী দেখছিলে ভগতরাম!”

অকস্মাৎ আমার প্রশ্নের জবাবে চিন্তিত মুখে ভগতরাম বলে উঠল, “সেই বাঘের বিষ্ঠা আর গায়ের লোম গেটের গায়ে লেপ্টে আছে! মনে হয় ওরা দুজন ধারেকাছে, ব্যবসার কাজে এসেছে। আসাম, আন্দামান, অরুণাচল, কেরল-সহ দেশের নানা জায়গার কাঠের চোরাকারবারিদের সঙ্গে এদের দহরম-মহরম! আর ওরা যদি এসে থাকে এখানে, তাহলে বড় বিপদে পড়বে!”

যাই হোক, আমরা ড্রাইভার পদম ছেত্রীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। দারুণ সপ্রতিভ ছেলে! সুন্দর বাংলা বলে। সারাক্ষণ আমাদের চলার পথে নোয়া-ডিহিং কখনো বাঁদিকে, কখনো ডানদিকে লুকোচুরি খেলতে খেলতে চলছিল! তার গর্জন শুনতে শুনতে কখন যেন একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল! হঠাৎ হুক্কা-হুয়া করে এক প্রবল গর্জনে আমাদের তন্দ্রা ছুটে গিয়েছিল! পদম হেসে বলল, “ভয় পাবেন না! এরা হুলক গিবন! এই জঙ্গলে প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়! এরাই উল্লুক নামে পরিচিত! আর পথে হাতি বা বাঘেদের দেখা না পাওয়াই ভালো! তাই না! এখানে কোনো গার্ড নেই সঙ্গে!”

যাই হোক, সুন্দর ভ্রমণ করে বাংলোয় ঢুকে পড়লাম। সন্ধ্যে নেমে এসেছে সারাটা জঙ্গল জুড়ে! আমাদের নামিয়ে দিয়ে পদম চলে গেল গাড়ি নিয়ে। আজ যেন বাংলোটা কেমন নিশ্চুপ হয়ে আছে! সারাদিন কত রকমের পাখি, পতঙ্গ, কাছের-দূরের জঙ্গল থেকে কত জানোয়ারের ডাক শোনা যায়! আজ যেন জঙ্গলে কার্ফু জারি হয়েছে! বাংলোর চারিদিকে একটা বোঁটকা গন্ধ রয়েছে; যেটা গতকাল রাতে ওই এক পলকের জন্য, ওই শ্বাপদটা আসার সময় পেয়েছিলাম! ভগতরাম আওয়াজ পেয়ে ভীত-চকিত অবস্থায় আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে বলল, “আজ একটা সর্বনাশের আশঙ্কা করছি! আমার মনে হয় ওরা দুজন এই অঞ্চলের কোথাও আস্তানা গেড়েছে! আর কোনোদিন এই চত্বরের মধ্যে এত বড় বাঘ আসেনি! মানুষের আস্তানায় চট করে ওরা আসেও না। কিন্তু জানি না আজ খালি অমঙ্গলের আশঙ্কা হচ্ছে! আপনারা হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি আপনাদের ঘরে খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। আজ ডাইনিং হলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই! আর খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে বাইরে যাবেন না! ঘরেই থাকবেন!”

ভগতরাম চলে যাওয়ার পরে আমরা শুয়ে পড়লাম। সারাদিনের অনেক পরিশ্রমের ধকলে সবাই ক্লান্ত ছিলাম। বিছানায় শোয়া মাত্রই ঘুম এসে গেল। শেষ রাতের দিকে ভয়ংকর গর্জন আর মানুষের তীব্র আর্তনাদ আর প্রচুর হট্টগোলে আমাদের সবার ঘুম ভেঙে গেল!

চোখের সামনে দেখছি ভয়ংকর বিশাল এক বড় হাঁড়ির মতো মাথাওয়ালা একটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, তার মুখে এক মহিলার শরীরটা নিয়ে একেবারে আমাদের বাংলোর সদর দরজার গেটের ওপর ধরে আছড়াচ্ছে! কী ভীষণ আক্রোশ তার! সারা বন-জঙ্গল তার ভয়ংকর গর্জনে কেঁপে কেঁপে উঠছে! মহিলার প্রাণহীন শরীরটাকে গেটের সামনে অবহেলা ভরে ফেলে রেখে, আর একটা প্রাণহীন শরীর মুখে করে এনে তার ওপর ফেলে, একটা ভয়ংকর গর্জন করে, একটা বড় লাফ দিয়ে সামনের জঙ্গলের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল! ঘটনাটি ঘটতে সময় লাগল বড়জোর দু-মিনিট! এতগুলো লোকের একজনেরও সাহস হলো না তাকে বাধা দেবার! আমরা সবাই মৃত মানুষের মতন নির্জীব, স্থাণুবৎ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম! শুধু তাই নয়, বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটার আওয়াজ পাচ্ছিলাম! ছোট্টু অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল! আর এরপরে জঙ্গলে ঘোরার সাহস আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম!

আরো একটা ঘটনা ঘটেছিল, নাগা বাবা মায়ুকি একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন! তাঁকে আর কেউ কখনো দেখতে পায়নি!
—————————————————-

সুরজিৎ সরখেল পরিচিতি:
১৯৫৭ সালে কলকাতায় জন্ম। ২০১৮ সালে ভারতীয় জীবন বীমা নিগম থেকে অবসর নিয়েছেন। সঙ্গীতে একটা পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল। সেজমাসী এবং মেজমামা প্রখ্যাত সুরকার স্বর্গীয় হৃদয় রঞ্জন কুশারীর তত্ত্বাবধানে সঙ্গীত চর্চা শুরু হয়। কলেজ জীবন শুরু হবার পর সঙ্গীতে আকৃষ্ট হন। অফিসে কর্মজীবনের ফাঁকেই শুরু হয় সাহিত্য চর্চা। কিছু প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সাময়িক পত্র পত্রিকায়। এছাড়াও বাগানে বিভিন্ন রকমের গাছপালা নিয়ে সময় কাটাতে ভালোবাসেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!