Shadow

বন্ধু – তিতিলা মুখার্জি

PC News18 Bengali
বন্ধু
তিতিলা মুখার্জি

সকালে উঠে চায়ের কাপ হাতে চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল রিমা। ওর ছোট থেকেই অভ্যেস ভোরে ওঠা, বাবা-মা তাই নিয়ম করেছিলেন। সেটা আর পালটানো হয়নি। এখন রিমা যাকে বলে সিনিয়র সিটিজেন, বাবা-মাও নেই, একাই থাকে, কিন্তু নিয়ম বদল হয়নি।

দু’দিন পরেই মহালয়া, মা আসছেন। মনে পড়ল, পুজোর আগে মা সবসময় বাড়িটা নতুন করে তুলতেন — ঝুল ঝাড়া, সারা বাড়ির পর্দা নতুন হতো, অন্যরকম হয়ে উঠত বাড়িটা। কী যে ভালো লাগত! রিমা এই সবই করে, কিন্তু যখন ছেলে আসে বিদেশ থেকে এই দিন পনেরোর অতিথি হয়ে, তখন। রিমাও খুশিতে ভরে থাকে আর বাড়িটাও ঝলমল করে ওঠে। একা একা কি আর এত কিছু করতে ইচ্ছে করে নাকি!

জীবনটা কেমন যেন একটা ওলট-পালট হয়ে গেল। কলেজ শেষ করে নতুন জীবনে প্রবেশ করেছিল আভাসের হাত ধরে। বাবা-মায়ের পছন্দ করে দেওয়া ছেলে। ঠিক হয়ে যাওয়ার পরে যদিও ওরা চুপিচুপি কয়েকবার দেখা করেছিল। দু’বছর পর রাজা এল। বাড়ির কাজ, রাজাকে বড় করা, শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে কোথা থেকে যে দিনগুলো পেরিয়ে গেল, বোঝাই গেল না। আভাস একজন ডাক্তার, সেও ব্যস্ত থাকত তার হাসপাতাল আর চেম্বার নিয়ে। কালের নিয়মে শ্বশুর-শাশুড়ি চলে গেলেন। রাজাও পড়তে চেন্নাই চলে গেল।

বাড়িতে শুধু ওরা দু’জন। একসঙ্গে কাটাতে গিয়ে দেখল, ওরা দু’জন কেউ কাউকে ভালো করে চেনেনি এতদিন। দু’জনে চলতে গিয়ে প্রতি মুহূর্তে বাধা। দু’জনের জীবন তো এগিয়ে যেত বাড়ির অন্য মানুষদের নিয়ে। তাঁদের ভালো-লাগা, মন্দ-লাগা প্রধান ছিল। নিজেদের নিয়ে ভাবাই হয়নি। এখন দু’জন ভিন্ন মতের মানুষের শুরু হলো সংঘাত, প্রতিটি ব্যাপারে। ছেলে যখন হোস্টেল থেকে ছুটিতে আসত, হই-হই করত মা-বাবাকে নিয়ে, মনে হতো সব ঠিক আছে। বাড়ি খালি হয়ে গেলেই আবার সেই ঝগড়া, চেঁচামেচি আর আভাসের ক্লাবে বেরিয়ে যাওয়া।

বাবা-মা কিছুটা বুঝতে পারছিলেন, কিন্তু এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের কষ্ট দিতে চায়নি রিমা। তারপর বাবা-মাও চলে গেলেন, রাজাও পড়াশোনা শেষ করে চাকরি নিয়ে বিদেশে চলে গেল। সম্পর্কটা আরও খারাপ হয়ে গেল। আর পারছিল না, রিমা সিদ্ধান্ত নেয় আলাদা হয়ে যাওয়ার।

তারপর এখানে, এই বাবা-মায়ের ফ্ল্যাটে একাই থাকা। উঠে পড়ল রিমা — না, বাড়িটা নতুনভাবে সাজাতে হবে, মা যেমন করতেন। ঝুলঝাড়ু, কাপড় হাতে শুরু করে দিল। নিজেরই মনে হচ্ছে সেই বয়সে ফিরে পেয়েছে প্রচুর এনার্জি। নিচু হয়ে টেবিলটার পায়া ঝেড়ে যেই উঠতে গেল, আর কিছু মনে নেই। একটু পরে চোখ খুলল, মাথায় অসম্ভব ব্যথা।

কোনোমতে উঠে বসে মাথার পেছনে হাত দিয়ে দেখল, হাতটা লাল হয়ে গেছে, বুঝল টেবিলের কোণায় মাথা ফেটে গেছে। এবার কী হবে? কাজ করে লতা, তারও আসতে দেরি আছে, সেও বা করবে কী! খুব একা লাগছে, কান্না পাচ্ছে, কাকে ডাকবে? নিজেকে সামলে রিমার প্রথম যার কথা মনে পড়ল, সে আভাস। আসবে তো? অনেকদিন কথাও হয়নি। কোনোমতে উঠে ফোন করল। একটু পরেই চলে এল আভাস, সঙ্গে সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যা তক্ষুনি দরকার।

আভাস যখন মাথায় ব্যান্ডেজ করতে করতে বলছে —

“কী যে করো, কী দরকার একা একা এসব করতে যাওয়ার?”

নিশ্চিন্তে চোখ বুজল রিমা। ও তাহলে একা হয়ে যায়নি। দু’দিন পর মহালয়া, মা আজও ওর পাশে এক পরম বন্ধুকে এনে দিয়েছেন।
———————————————————-

তিতিলা মুখার্জী ~ কলকাতাতেই জন্ম ও বড় হওয়া । কর্ম জীবন থেকে স্বেচ্ছা অবসর নেওয়ার পর সাহিত্য,গান,কবিতা নিয়ে পথ চলা 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!