
Ocelli
দেব মুখার্জি
সেইবার পেঞ্চের জঙ্গলে, খুরসাপার গেটে সাফারিতে – চারপাশে সবুজ গাছগাছালি, হরিণের অ্যালার্ম কল, ময়ূরের কর্কশ ডাক, গাছের মাথায় হনুমানগুলো এতক্ষণ লাফাচ্ছিল, এবার স্থির। গাইড মঙ্গল আঙুলটা তুলে ডানদিকের ঘাসজমিটা দেখিয়ে বলল, “ওখানে বাঘ রয়েছে, হাঁটছে, নড়ছে লম্বা লম্বা ঘাসগুলো।” আমি তাকিয়ে থাকি, কিছু একটা নড়ছে, দেখা যাচ্ছে।
মঙ্গল শেখালো Ocelli… ল্যাটিন ভাষায় এর অর্থ, ছোট্ট চোখ। বাঘের কানের পেছনে সাদা রঙের একটা স্পট, সাধারণত ওইটা দেখেই নাকি শাবকেরা ঘাসজমির মধ্যে মাকে খুঁজে পেয়ে পেছনে পেছনে হাঁটে।
রাজা বের হবেন ঘাসজমির ভেতর থেকে, বেশ জোরেই দুলছে ঘাসগুলো। এবার মুখটা বের করলেন উনি, মঙ্গল বলল এর নাম বারাস… দেখো চোখের পাশের স্ট্রাইপগুলো, যেন ১২ সংখ্যাটা লেখা রয়েছে। ও বলে চলে… প্রত্যেক মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতো, বাঘের শরীরের স্ট্রাইপও আলাদা, কারও সঙ্গে কারও মিল নেই।
এখন আমার অবশ্য ওইদিকে মন নেই, যদি উনি একবার ঘাড় ঘোরান কানের পেছনটার সাদা রঙের স্পটটা… ওই Ocelli… দর্শনের চেষ্টা। অপেক্ষা করি অনেকক্ষণ, সময় ফুরোয়। ফেরার পথে, মঙ্গলকে জিজ্ঞেস করতেই ও বলে, কোনো ভিনদেশি মানুষের সঙ্গে সাফারির গাইড হয়েছিল সে, আর তারপর ওনার থেকে সে জেনেছে এই ল্যাটিন ভাষার Ocelli… ছোট চোখের কথা। আমি আকাশের দিকে তাকাই, প্রকৃতির এই অসামান্য সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজতে চেষ্টা করি, শুনেছি ওনার তৃতীয় নয়ন আছে… Ocelli নয়, ল্যাটিন ভাষায় নাকি তৃতীয় নয়নকে বলে tertius oculus।
ইস! কত কিছু যে আজও শেখা হয়নি –
দেখা হয়নি Ocelli, সেদিন যদি একটা দূরবীন থাকতো, তারপর ভাবি সব সময় কি সঠিক পথ খুঁজতে দূরবীন লাগে, বাঘের শাবকদের তো দূরবীন নেই, কিন্তু মাকে খুঁজে পেতে Ocelli আছে।
আমি ফের একবার আকাশের দিকে তাকাই, মাকে খুঁজি, আঁচলের খুঁটটা ধরে টলোমলো পায়ে হাঁটার চেষ্টা, ভয় নেই পথ ভোলার। ফের চশমাটা ঝাপসা হয়, ঝকঝকে আকাশটার নীচে শ্রদ্ধেয় তারাপদ রায়কে মনে পড়ে…
ছবির মতো আকাশ,
আর আকাশের নীচে সেই বোকা মানুষ-
যার কথায় কথায় চোখে জল আসে।
সমাপ্ত
———————————————————
![]()
লেখক পরিচিতি
চন্দননগরের দেব মুখার্জি,কর্মসূত্রে প্রবাসী বহুদিন ধরে। ভ্রমণ ছিল তাঁর পেশার অঙ্গ। এখন নেশায় দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজে অকাজে ঘুরে বেড়িয়ে,সেই পথ চলার কিছু কথা,পথচলতি মানুষের কথা-অল্প কয়েক বছর আগে শখ করেই লিখেছিলেন ফেসবুকে। সেই লেখা পছন্দ করেন অনেকেই। লেখা চালিয়ে যেতে বলেন। উনি আর থামেন নি। মাঝে মধ্যে কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন,ই-বুক বা সংকলনগুলোতে কিছু লেখা ছাপাও হয়। সবাই প্রশংসা করে। ফেসবুকে পরিচিতি পেয়েছেন,ধারাবাহিক ভাবে লিখে গেছেন কয়েকটি ফেসবুক গ্ৰুপে দীর্ঘদিন। আজও তিনি নিয়মিত লেখেন ফেসবুকে তাঁর টাইমলাইনে। এবার বই হোক,মলাটবন্দী হোক সৃষ্টিগুলো-বন্ধু বান্ধব,পাঠক পাঠিকা আর শুভানুধ্যায়ীদের অনুরোধ,আবদার ছিল দীর্ঘদিনের। জনপ্রিয় কয়েকটি লেখা বেছে দিয়েছিলেন তাঁরাই। ছাপা অক্ষরে দেব মুখার্জীর প্রথম প্রচেষ্টা ‘পাড়ি’। আশা রাখি ভবিষ্যতে এরকম আরও অনেক অপরিচিতই কাছের মানুষ হয়ে উঠবেন ওনার জীবনমুখী অরণ্য প্রেমের ছোঁয়ায়।
