
” এই রাত তোমার আমার “
সুরজিত সরখেল
হঠাৎ একটা চাপা অস্বস্তিতে নীলের ঘুমটা ভেঙে গেল। একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখতে দেখতে আচমকা, ঘুমন্ত অবস্থায় হাতড়ে হাতড়ে মোবাইলটা খুলে সময়টা দেখল রাত প্রায় তিনটে বাজে! একবার ঘুম ভাঙলে ঘুম আসতেই চায় না। হাত বাড়িয়ে জলের বোতল থেকে ঢক ঢক করে খানিকটা জল খেয়ে, বাথরুমে বেসিন থেকে ঘাড়ে, মুখে জল দিয়ে বিছানার উপর বসে থাকলো মিনিট খানেক। বাঁকুড়ার এই প্রত্যন্ত এলাকায় অনেক ছোট থাকতে মা–বাবার সঙ্গে বড় মাসির বাড়িতে এসেছিল। মাসির কাছে শুনেছিল ওঁর শ্বশুরমশাই , মানে মেসোর বাবা জমিদার বাবুর রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়তার সূত্রে, এ বিশাল কয়েক বিঘার উপর বাড়িটার সামান্য অংশটুকুর ভাগ পেয়েছিলেন। শরিকী সম্পত্তির যখন ভাগ বাটোয়ারা হয় তখন দেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অস্ত যেতে বসেছে। পরবর্তীকালে মেসো তাদের ভাগের এই সামান্য অংশটুকুর সংস্কার করতে পেরেছিলেন। দুটো ঘর কিন্তু পেল্লাই সাইজের! তখনকার আমলের কড়ি বর্গার ঘর, লাল সিমেন্টের মেঝে, চুন সুড়কি দিয়ে ছোট ছোট সাইজের ভীষণ শক্ত ইটের গাঁথনি। গরমের দিনে ঘর ঠান্ডাই থাকে, কিন্তু এখন প্রায় ৩৫০ বছরের বাড়ির বর্তমানের জরাজীর্ণ চেহারা! যেখানে সেখানে জঙ্গল, বট, অশ্বত্থর ঝুড়ি নেমে এসেছে! এই বিশাল এলাকা জুড়ে জমিদার বাড়ির মাত্র কয়েকটা ঘরে, ওরা ছাড়াও খুবই সামান্য লোকজন থাকে! ভূতের আর সাপ খোপের ভয়ে বিকাল হতেই গ্রামের মানুষদের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়! জমিদার বাড়ির এ মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত লম্বায় এতটাই বড়, যে শুধু ধীর পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতেই প্রায় ১০ মিনিট লেগে যায়! তাও তো বিশাল দিঘির কাছের ঘর গুলোর তো এতটাই জরাজীর্ণ অবস্থা যে তার পাশ দিয়ে হাঁটতেই ভয় লাগে। গতকাল স্টেশনে ট্রেন থেকে নামবার পরে ওর মাসতুতো ভাই ,বোন গৌরব আর নীতার সঙ্গে ওদের গাড়িতে বাড়ির কাছে এসে নামলো যখন, তখন প্রায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হ‘ব হ‘ব করছে। অনেক বছর পর তিন ভাইবোন এক জায়গায় হওয়াতে স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে আনন্দের হাট বসে গেছে। মাসির বয়স আশি পেরিয়ে গেছে। দুজন সব সময়ের কাজের জন্য মাসি আছেন। গৌরব আর নীতা কর্মসূত্রে বাইরে থাকে। গৌরব পাঞ্জাবে, আর নীতা ব্যাঙ্গালোরে। দু‘জনে পালা করে মাসখানেক অন্তর মায়ের কাছে আসে। এবার আসার আগে নীলকে খবর দিয়ে ওদের বাড়িতে আসতে আমন্ত্রণ জানায়। কারণ নীল এবার নিউজিল্যান্ডে কর্মসূত্রে প্রমোশনাল ট্রান্সফারে বছর কয়েকের জন্য যাবে। গাড়ি জমিদার বাড়ির সীমানার মধ্যে আসতেই নীল বুঝতে পারল, সেই ছোটবেলায় দেখা এই বাড়ির সঙ্গে বর্তমানের কতটা ফারাক!! সাধে কি আর দিনের বেলায় পর্যন্ত ভূতের ভয়ে মানুষ এখানে আসতে ভয় পায়!
একটানা লম্বা বিশাল এলাকা জুড়ে জমিদার বাড়ি। চুন,সুড়কি আর বিশেষ ধরনের ছোট ছোট ইট দিয়ে তৈরি প্রায় ২০ ইঞ্চির গাঁথনি। একতলা, কিন্তু মাটি থেকে মাপলে ,উচ্চতায় এখনকার বাড়ি বা ফ্ল্যাটের দোতলা উচ্চতার সমান হবে!পাশাপাশি অনেকগুলো ঘর। কিন্তু কয়েকটা মাত্র ঘর ছাড়া ,বেশিরভাগ ঘরেই এখন মানুষ বসবাসের উপযুক্ত অবস্থা নেই!এতটাই জরাজীর্ণ ও জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থা, যদি সবকটা ঘরেই লোক থাকতো‘,তাহলে সব মিলিয়ে কয়েকশো তো হতোই। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটা ঘরে ,এখন ওই হাতে গোনা কয়েকজন করেই লোক বাস করে!! একেকটা ঘরকে প্লাইবোর্ড বা কাঠের দ্বারা পার্টিশন করে বেশ কয়েকটা ঘর বের করা যায়। মাসিরাও তাই করেছে! অত মোটা দেওয়াল বলে ঘরের ভিতরটা একেবারে ঠান্ডা! আর বাথরুমটাই কত বড়! বাড়িতে আসার পরে বাথরুমে গিজারের জলে স্নান করার সময় অভ্যাসবশত গলা ছেড়ে প্রিয় শিল্পী হেমন্ত মুখার্জির অবিস্মরণীয় গান ” এই রাত তোমার আমার, শুধুই দুজনের….”গাইতে গিয়ে কোন মহিলা কন্ঠের চাপা হাসির শব্দ যেন শুনতে পেলো নীল!!কোন মহিলা যেন খুব কষ্ট করে নিজের হাসিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন!!আর তা করতে গিয়ে তার হাতের চুড়ির রিন, রিন শব্দের প্রতিধ্বনি পাশের কোনো ঘরের ভেতর থেকে উঠে আসছে!! নীল প্রথমে এ ব্যাপারটায় খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করলো না!! কিন্তু সেদিন রাতের ঘটনার পর ওর মনে একটা প্রশ্ন জাগলো, সত্যিই কি অনেক ছোটবেলায় যা শুনে এসেছে, যে এই বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু প্রাচীন জমিদার বাড়ি সম্পর্কে, যেখানে বহু প্রেতাত্মার বাস!যদিও ও ভূতের অস্তিত্বে বিন্দুমাত্র বিশ্বাসী নয়!!কিন্তু নামেই জমিদার বাড়ি! চারিদিকে ভগ্ন স্তূপের মত ভাঙাচোরা ইমারতের এখানে– ওখানে আগাছার ঝোপ ,বিশাল বট অশ্বত্থের ঝুড়িতে ঢেকে থাকা প্রাচীন ইতিহাস!! মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় শরিক দের হাতে পড়ে, ভগ্নস্তূপ থেকে মেরামত করে, মূল কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মাথা গোঁজার মত আস্তানা তৈরি করা হয়েছে! সেরকমই একজনের থেকে মেসো এই আস্তানা টুকু কিনেছিলেন।
গৌরব আর নীতার কাছে ও শুনেছিল, ওদের যে ঘরে ওরা থাকে, তার ধারে কাছে অন্য কোন ঘরে কোন প্রতিবেশী থাকেনা। কাজেই সেদিন সন্ধ্যাবেলায় বাথরুমে ও দীর্ঘদিনের অভ্যাসবশত খোলা গলায় গান করার সঙ্গে সঙ্গেই, পাশের কোন ঘর থেকে, ওই রহস্যময়ী বামা কন্ঠের চাপা হাসি, আর মেয়েদের হাতের চুরির রিন রিন শব্দ ওর অবচেতন মনে একটা প্রচ্ছন্ন ছাপ ফেলেছিল!! গৌরব বা নীতাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে ভুলেই গিয়েছিল!কিন্তু সেদিন রাতে পাশের কোন ঘর থেকে যখন সেই একই গানের সুর কেউ হুবহু শিস্ দিয়ে বাজালো, তখন ঘুম ভেঙ্গে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই খিলখিল করে চাপা হাসি আর কাঁচের চুড়ির রিন রিন শব্দ শুনতে পেল!! আর তার সঙ্গে একটা চাপা অস্বস্তি আর অদম্য কৌতূহল ওর মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো!!
পরের দিন সকালে দেরি হয়ে গেল নীলের ঘুম ভাঙতে!আসলে গতকাল রাতে ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে যেতে আবার ঘুম আসতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল! নীতা চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকে ওকে ঠেলে না তুললে ওর ঘুম সহজে ভাঙতো না!
গত রাতের ঘটনাটা ঐ ঘুম থেকে উঠেই নীতাকে বলতে কেমন এক অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে নীলের দিকে তাকিয়ে ও বলল ” ওই দিকের ঘরগুলো তো একেবারেই বন্ধ!জরাজীর্ণ অবস্থা!! তার ওপরে পাশের ঘর গুলোর মধ্যে একটা ঘরে একটা অল্প বয়সী মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল সেই সময়!!! শুনেছিলাম অবশ্য বাবার মুখে। তখন তো আমরা সবে এসেছি এখানে। ঘটনাটা তারও অনেক আগে। আমার মনে হয় তুই কোন স্বপ্ন দেখেছিস হয়তো!
অনেকটা জার্নি করে এসেছিস। তবে তোর যদি কোন ভয় বা অসুবিধা হয়, তোর সঙ্গে দাদা শুতে পারে। নীল সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো ” তুই তো জানিস ভূতের ভয় বা বিশ্বাস আমার কস্মিন কালেও ছিল না! কিন্তু তোদের উল্টো দিকের ঘর বা পাশের ঘরে কোন প্রতিবেশী আছে কিনা সেটা তো তোরা বলতে পারবি!”
একটু পরেই গৌরব আর মাসিও ব্যাপারটা জেনে গেল। গৌরব তো শুনেই ওই সকালেই সেই ঘরে কোন অবাঞ্ছিত অতিথি আছে কিনা পর্যবেক্ষণ করতে ছুটলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এসে রিপোর্ট করলো ” সব ঠিক আছে আগের মতনই! দরজায় প্রকাণ্ড তালা যেটা আগেও ছিল সেটাই ঝুলছে। অনেকদিন অব্যবহৃত অবস্থায় বাড়ির ঘর গুলো পড়ে আছে। সিঁড়িতেও ময়লা, ধুলো, ঝুল,মাকড়সার জাল পড়ে আছে। সুতরাং নীলের হ্যাংওভার হয়েছে মনে হয়। আমি আজ নীলের সঙ্গে রাতে এই ঘরে শোবো।“
মাসিও বলল ” আজ তোকে পোস্ত বাটা খাওয়াবো! ঘুম এমনিতেই চলে আসবে! সারাদিন ল্যাপটপ আর মোবাইল নিয়ে তোদের সময় কাটে। ঘুম আসবে কি করে!”
নীতা এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শুনছিল। নীল কে চোখের কোনা দিয়ে পর্যবেক্ষণ করার পরে বলে উঠলো ” এখন উঠে বাথরুমে যা। ব্রেকফাস্ট করে এখানে চারপাশটা ঘুরে আসিস । তোর ভালো লাগবে। দেরি করিস না।“
বাঁকুড়ায় কত মন্দির, মল্ল রাজাদের স্থাপত্য, প্রাচীন ইতিহাসের গন্ধ সারা শরীরে মেখে, ওরা যখন বাড়ির দিকে রওনা দিল, ততক্ষণে সূর্যদেব প্রায় ঢলে পড়েছে। তার রক্তিমাভ আলোয়, চারিপাশের জঙ্গলের গাছপালায়,আধো অন্ধকারের মধ্যে যেন কোন এক রহস্যের অবগুণ্ঠন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে! দুপুরের খাবারটা ওরা ওখানকার এক নামকরা হোটেলে খেয়েছিল। চিতল মাছের মুইঠ্যা এখনো মুখে লেগে আছে নীলের! অনেক বছর আগে মাসি নিজের হাতে রান্না করে খাইয়েছিল।
এত কিছুর মধ্যেও নীলের মনে একটা খটকা মাঝে মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। সকাল বেলা যখন ওরা গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে, সিগারেটে শেষ টানটা মেরে বাঁদিকের ড্রাইভারের সামনে দরজাটা খোলার সময় নীলের চোখটা হঠাৎই সেই ঘরের সামনের জানালায় যখন পড়লো, মনে হলো একটা ছায়া মূর্তি হঠাৎই সরে গেল!!
ব্যাপারটা আচম্বিতে হয়ে গেল! তারপর গাড়ি চলতে শুরু করার পরে নানারকমের আলোচনার মাঝে ঘটনাটা ধামাচাপা পড়ে গেল।কিন্তু সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পরে সবাই খুব ক্লান্ত ছিল। সারা দিনের ধকলের পরে কোনরকমে রাতের খাওয়া শেষ করে, সবাই শুয়ে পড়ল। এ তো আর কলকাতা নয়, রাত দশটায় কলকাতায় সবে সন্ধ্যে হয়!
মাঝ রাতে নীলের ঘুমটা হঠাৎই ভেঙ্গে গেল। কেমন যেন একটা দুর্বোধ্য আওয়াজ ভেসে আসছে পাশের ঘর থেকে! ওদের ঘরের থেকে সেই আলোচ্যঘরের সবটাই যে দৃশ্যমান, তা নয়! কেননা মাঝের একটা দেওয়ালের খানিকটা, দুটো ঘরের জানালার মধ্যে একটা অন্তরালের সৃষ্টি করেছে। আসলে পুরনো স্থাপত্য ভেঙে যখন নতুন করে বাসস্থানের উপযোগী করে তোলা হচ্ছিল, তখন যে যার মতন করে কাঠামো সংস্কার করে নিয়েছে। দুটো ঘরের জানলার মধ্যে দূরত্ব আনুমানিক ৭/৮ মিটার হবে। নীল বাথরুম যাবে বলে উঠে সেই জানালার দিকে কৌতূহলবশত ঘুম চোখে তাকাতেই একটা ধাক্কা খেলো যেন। চোখ থেকে ঘুম উধাও! মুখ থেকে কথাই সরে না। ও যে খুব ভিতু তা নয়; কিন্তু ওই গভীর নিস্তব্ধ রাতে প্রায় জন মানবহীন এলাকায়, বিশেষ করে যেখানে অশরীরী আত্মা বা ভূতের ভয়ে এলাকার লোকেরা দিনের বেলাতেই আসতে চায় না, সেখানে পাশের ঘরের জানলা থেকে একটা দুর্বোধ্য আওয়াজ শুনে তাকাতেই দেখতে পেল
একটা কঙ্কাল হাত–পা নেড়ে তাকে ইশারায় ডাকছে!!প্রথমে শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল!! যতই সাহসী আর বেপরোয়া, ভূত প্রেতে অবিশ্বাসী হোক না কেন, ওই রকম চারি দিকে খাঁ খাঁ, নিস্তব্ধ জনমানব শূন্য পরিবেশে একেবারে তেঁনাদের পক্ষে আদর্শতম জায়গায় ওই গভীর রাতে কঙ্কালের হাতছানি;নীল একেবারে উপেক্ষা করতে পারল না!!কোন রকমে বাথরুম থেকে চোখে মুখে ভালো করে জলের ছিটে দিয়ে বিছানায় এসে বসে পড়লো !
আফসোস হচ্ছিল, হাতে মোবাইলটা থাকলে ছবিটা তুলে রাখতে পারতো। নীতা আর গৌরবকে সঠিক প্রমাণ দিতে পারতো। কোন রকমে রাতটা না ঘুমিয়ে কাটাবার জন্য নীল একটা সিগারেট ধরিয়ে খাটে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল; কিন্তু সিগারেটের গরম ছ্যাঁকা হাতে লাগায়, সেটুকুও উধাও হয়ে গেল !ভোরবেলার দিকে একটু ঘুম এসেছিল। কিন্তু নীতার ঠ্যালা খেয়ে ধরমর করে উঠে বসে বিছানায়। গতকাল রাতের ঘটনা নীল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নীতাকে বলে। আর এটাও জানায় ও এখনই ওই ঘরে নিজেই যাবে। সত্যি সত্যি নীল ওই সকালেই অশরীরী আত্মার মুখোমুখি হওয়ার জন্য দুর্বার গতিতে রীতিমত দৌড় দিল!! নীতা কোন মতে গৌরবকে ডেকে ওর পিছন পিছন দৌড় দিল। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ঝুল, আগাছা আর মাকড়সার জালে ভরা বহুদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকলে ঘরবাড়ির যেরকম দুরবস্থা হয়, সেরকমই দেখতে পেল নীল। ঘরের সামনে এসে ও থমকে দাঁড়ালো। একটা বেশ বড় তালা ঝুলছে দরজায়!! হঠাৎ নিচু হয়ে একটা কি জিনিস তুলে পকেটে ঢুকিয়ে রেখে, দরজায় সিআইডি সিরিয়ালের অফিসার, দয়ার স্টাইলে একটা বেশ জোরে লাথি কষিয়ে, আর একটা মারতে যাবার আগেই, নীতা ওকে ধরে ফেলল।
” দাঁড়া, খুলে দিচ্ছি। দরজা ভাঙলে ওরা মুশকিলে পড়ে যাবে !!” কাতর স্বরে বলে উঠলো নীতা!!
” ওরা কারা“…… চিৎকার করল নীল।
” সব বলছি, আগে দরজাটা খুলি “… বলে হাতে একটা বড় চাবি দিয়ে তালা খুলে ঘরে ঢুকে বললো……
” স্নিগ্ধা, বেরিয়ে এসো তোমরা “…..
” ভয় করছে নীতাদি। উনি যেভাবে রেগে আছেন, মারবেন না তো!! বলতে বলতে মুখে মৃদু হাসি চেপে রেখে নীলের দিকে তাকিয়ে, মাথা নিচু করে দাঁড়ালো স্নিগ্ধা নামের শ্যামলা রঙের মেয়েটি।
” এরকম একটা ভূতুড়ে পরিবেশে থাকতে আপনাদের ভয় করেনি!! তার ওপর কঙ্কাল নিয়ে আমাকে ভয় দেখানোর সাহস পেলেন কিভাবে? আর একজন কোথায়? বেরিয়ে আসুন তাড়াতাড়ি! পুলিশ ডাকবো এবার!!!” ক্ষেপে গিয়ে বলে উঠলো নীল।
” গৌরী, বেরিয়ে আয় এবার“……. নীতার কথা শেষ হতে না হতেই, অপরূপ লাবণ্যে ভরা মুখ নিয়ে গৌরী সামনে এসে দাঁড়ালো মাথা নত করে। নীলের চোখের পলক আর পড়ে না!! গৌরীর হাত ভরা কাঁচের চুড়ি আবার রিন রিন শব্দে বেজে উঠলো, যখন ও নিজের দু‘হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে দাঁড়ালো!!
” হয়ে গেল ” ……. গৌরবের তির্যক কথায়, নীল কড়া চোখে গৌরবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো …..
” কি হয়ে গেল “….??
” শুভ দৃষ্টি “!! বলেই গৌরব নীতার আড়ালে চলে এলো নিরাপদ দূরত্বে।
” ও এটা স্ক্রিপ্টেড প্লট !! আমার সন্দেহ কাল রাতেই হয়েছিল! তা ওই কঙ্কালটি কোথায়!!”
নীলের কথা ফুরোনোর আগেই স্নিগ্ধা ফোল্ডেড কঙ্কালটা হাতে নিয়ে এসে দাঁড়ালো!!
” এছাড়া যে আর কোন উপায় ছিল না নীল। পুরোটা শুনলে তুই না করতে পারবি না। তাছাড়া তোর ছবিও গৌরী কে দেখিয়েছি আগেই। আর আজ তোকেও দেখলাম। অপছন্দ হওয়ার কোন জায়গাই নেই, সেটা তোর চোখ আর মন বলছে!! স্নিগ্ধার বাবা আমাদের মতনই এই ঘরটা কিনতে পেরেছেন। এবার সংস্কারও শুরু হবে। গৌরীর জন্য ছেলে দেখা চলছে। শৈশবেই মা–বাবা দুজনেই মারা যাওয়ায় ও মামা বাড়িতেই মানুষ হয়েছে। পরে ডাক্তারও হয়েছে। এখানে বাড়ি কেনার সূত্রেই স্নিগ্ধা দের সঙ্গে প্রথমে আলাপ, আর পরে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সেখান থেকেই গৌরীর কথা জানতে পারি। স্নিগ্ধার মামাতো বোন। এত সুন্দর আর মিষ্টি একটা বৌদি কিভাবে হাতছাড়া করি বল। চল সবাই মা‘কে জানাই। আর পঞ্জিকাটা বের করে তারিখটা পাকা করে ফেলি। তোর কিছু বলার আছে নীল ? “…….
” এটা আপাতত কপালে লাগিয়ে রাখুন!! আপনারই তো!
এখনো কপালে দাগটা আছে!!”…… বলে পকেট থেকে একটা লাল রঙের টিপ গৌরীর হাতে দিল।
” সন্তোষ” কোম্পানির টেপরেকর্ডার বাজাচ্ছিলেন তো!
আমারও ছিল! একই সমস্যা!! ওটা এবার বিদায় করুন!!” নীলের কথায় সবাই হেসে উঠলো ।।
***************************************************

সুরজিৎ সরখেল পরিচিতি:
১৯৫৭ সালে কলকাতায় জন্ম। ২০১৮ সালে ভারতীয় জীবন বীমা নিগম থেকে অবসর নিয়েছেন। সঙ্গীতে একটা পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল। সেজমাসী এবং মেজমামা প্রখ্যাত সুরকার স্বর্গীয় হৃদয় রঞ্জন কুশারীর তত্ত্বাবধানে সঙ্গীত চর্চা শুরু হয়। কলেজ জীবন শুরু হবার পর সঙ্গীতে আকৃষ্ট হন। অফিসে কর্মজীবনের ফাঁকেই শুরু হয় সাহিত্য চর্চা। কিছু প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সাময়িক পত্র পত্রিকায়। এছাড়াও বাগানে বিভিন্ন রকমের গাছপালা নিয়ে সময় কাটাতে ভালোবাসেন।

বেশ ভালো লাগল, সরখেলবাবু। ভুত আর প্রেম। মিলে মিশে হয়ে গেছে জেম।অভনন্দন!