
পুরানো সেই
সুজয় দত্ত
এ জীবনতরী শ্লথ হয়ে আসে, পঞ্চেন্দ্রিয় হয়ে আসে ক্ষীণ,
তবু শুনি যেন কার পিছুডাক, থেকে যেতে বলে আরও কিছুদিন।
না বলা কথারা ভীড় করে আসে, স্মৃতির মেঘেরা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়,
আলো আঁধারির খেলা চলে বুকে, লুকোনো বেদনা বৃষ্টি ঝরায়।
যারা এসেছিল, যারা চলে গেছে, রেখে গেছে কিছু ধূসর চিহ্ন,
হৃদয়ের টানে বাঁধা পড়ে সেই বাঁধন করেছে হেলায় ছিন্ন,
আজও আছে তারা মনের গহীনে ছায়াছায়া কিছু অনুভূতি হয়ে,
চুপিচুপি এসে ডাক দিয়ে যায়, নীরবেই যায় কত কথা কয়ে।
সেই যে কে এক ছিল বাঁশিওয়ালা, প্রতিদিন যেত কি সুর শুনিয়ে
গোধূলিবেলায় মোহনবাঁশিতে কল্পনা জাল প্রাণেতে বুনিয়ে।
তার পিছুপিছু আরও একজন — ঝুমঝুমি আর রঙিন খেলনা
পিঠের ঝুলিতে ভরা ছোটদের স্বপ্নের ধন, নয় সে ফেলনা।
ফিরবে না তারা, মন জানে তবু কেন যে তাদের পিছু পিছু ধায়?
ছোট ছোট পাওয়া, ছোট ছোট খুশী — তার পানে আজও দুহাত বাড়ায়।
পাড়ায় পাড়ায় ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসবে যার লাটাইয়ের টানে
কাটা যেত আর সকলের ঘুড়ি সে আজ কোথায়? কেউ কী তা জানে?
কিংবা ছাদেতে ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দেওয়ার সময় ধারালো
কাঁচে কাটা হাতে রক্ত মুছিয়ে দিত যে মেয়েটি, সেও তো হারালো
সময়স্রোতের ঘূর্ণিতে। ঠিক যেমনটি গেছে আগিন মাহাতো —
পাড়ার গোয়ালা, দুধ দিত রোজ, শীতে খড় জ্বেলে আগুন পোহাতো।
তার দোস্ত সেই বনোয়ারীলাল — ঝাঁটা হাতে আর বালতির জলে
বাড়ী বাড়ী রোজ ময়লা সাফাই, তারপর স্নান রাস্তার কলে।
বৌ ছিল তার ঘুঁটেওয়ালি আর ছেলেটা বেচত কয়লার গুঁড়ো,
পুরনো কাগজ কিলোদরে কিনে ঠোঙা হতে দিত তারই এক খুড়ো।
ওদের খুপরি, আমাদের ফ্ল্যাট দূরত্ব যেন লক্ষ যোজন।
তবু ছিল ওরা বন্ধুর মতো বিপদে আপদে আপনার জন।
মন্টেসরির শেফালী আন্টি, প্রাইমারী স্কুলে বীথি দিদিমণি
গানের টিচার — স্বরলিপি ছাড়া গান শেখাতেন সোম আর শনি।
টিফিন বেলায় ফুটপাথে কেনা কুলের আচার, নুন দেওয়া শশা,
সকাল বিকেল স্কুলের গেটেতে মোটা লাঠি হাতে পাহারায় বসা
রামরূপ সিং, শিবধনী লোধ — মুখ মনে নেই, ধোঁয়া-ধোঁয়া সবই —
বুকের বিজন ছবিঘরে যেন সারি দিয়ে রাখা ধুলোপড়া ছবি।
বিকেলে মাঠেতে চাঁদা করে কেনা রবারের বল নিয়ে হুটোপুটি,
সন্ধেবেলায় মাটির উনুনে গরম তাওয়ায় ফুলো ফুলো রুটি,
মন্দিরে শাঁখ, আরতির ধ্বনি, আজানের ডাক, পড়ুয়ার গলা —
সব পিছু ফেলে জীবনের এই গোধূলি বেলায় একা একা চলা
সেই ধ্রুব পথে — শেষ হয় যার কবরে কিংবা শ্মশানের ঘাটে।
এই পৃথিবীকে প্রাণ দিয়ে যেন ভালবেসে বাকী সময়টা কাটে।
——————————————–

সুজয় দত্ত বর্তমানে আমেরিকার ওহায়ো রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানতত্ত্বের (statistics) অধ্যাপক। তিনি কলকাতার বরানগরের ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন ছাত্র। তরুণ বয়স থেকেই সাহিত্য তাঁর সৃজনশীলতার মূল প্রকাশমাধ্যম,সাহিত্য তাঁর মনের আরাম। ছোটগল্প, বড় গল্প, প্রবন্ধ ও রম্যরচনার পাশাপাশি নিয়মিত কবিতাও লেখেন তিনি। এছাড়া করেছেন বহু অনুবাদ–হিন্দি থেকে বাংলায় এবং বাংলা থেকে ইংরেজিতে। তিনি হিউস্টনের “প্রবাস বন্ধু” ও সিনসিনাটির “দুকুল” পত্রিকার সম্পাদনা ও সহসম্পাদনার কাজও করেছেন। এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত ‘বাতায়ন’ পত্রিকাটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। এই পত্রিকাগুলি ছাড়াও ‘অপার বাংলা’ ও ‘গল্পপাঠ’ নামক ওয়েব ম্যাগাজিন দুটিতে,নিউজার্সির ‘আনন্দলিপি’ ও ‘অভিব্যক্তি’ পত্রিকা দুটিতে,কানাডা থেকে প্রকাশিত ‘ধাবমান’ পত্রিকায়,ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত পূজাসংকলন ‘মা তোর মুখের বাণী’ তে,ভারতের মুম্বাই থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা পরবাসে’ রয়েছে তাঁর লেখা। কলকাতার প্রসিদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সমাজসেবী সংস্থা ‘পোয়েট্স ফাউন্ডেশন’-এর তিনি অন্যতম সদস্য। সম্প্রতি নিউ জার্সির “আনন্দ মন্দির” তাঁকে “গায়ত্রী গামার্স স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কারে” সম্মানিত করেছে। সাহিত্যরচনা ছাড়া অন্যান্য নেশা বই পড়া, দেশবিদেশের যন্ত্রসঙ্গীত শোনা এবং কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র বাজানো।
