
পেঞ্চে মহাশিবরাত্রি
দেব মুখার্জি
গোপাল রাও আর অঞ্জণা বাঈ, এদের সঙ্গে দেখা, তোতলাডোহতে, আঙুল দিয়ে বুড়ো বটগাছটাকে দেখিয়ে কিছু বলছিল গোপাল রাও তার সহধর্মিণীকে। ঘাড় নেড়ে অঞ্জণা বাঈ গড়গড় করে অনেক কথা বলে থামলো। সম্পূর্ণ মারাঠী বুঝতে না পারলেও বুঝলাম, একটা সময় ওদের ঘরবাড়ি ছিল, ঐ বুড়ো বটের সামনে। দোতলা বাড়ি ছিল প্রধানের। ছোট্ট কুঁড়ে,খাপরার চাল মঞ্জু মৌসি, একাই থাকতো, দুটো ছেলেই পরদেশে চলে গেল কাজে, একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সে থামে।
আমি সামনে তাকাই, এখন এই মুহুর্তে ঘরবাড়ির কোনো চিহ্ন নেই, সব মিশে গেছে ঘন জঙ্গলের আড়ালে। গোপাল রাও বলে, বাবুজী জঙ্গল তো ছিলই, জানোয়ার বাড়তেই আমরা গ্ৰাম ছাড়া, বুঝি পেঞ্চ টাইগার রিজার্ভে পরিবর্তিত হতেই, বনগ্ৰামের মানুষজন পুনর্বাসিত হয়ে এখন জঙ্গলের বাইরে।
তোতলাডোহ, পেঞ্চের জঙ্গলের মাঝের কোনো এক বনগ্ৰাম, যেটা ছিল, এখন আর নেই। সেই বনগ্ৰামের ঘন জঙ্গল, উঁচু নীচু রাস্তা পেরিয়ে পাহাড়, ঝর্ণা আর নদী, যেখানে, সেটা আম্বাখোরি। আর সেই আম্বাখোরির এক গুহায় দেবস্হান…মহাদেবের।
মহাশিবরাত্রির নির্দিষ্ট দিনে বনদফতরের বিশেষ অনুমতি মেলে দেব দর্শনের, বছরে একদিন। আজ সেই বিশেষ দিনে শুধুমাত্র মন্দির নয়, নিজের শিকড়ের টানে গোপাল বা অঞ্জণা বাঈয়ের মতো বনগ্ৰামের অজস্র ঘরছাড়া মানুষ। তার সেই সঙ্গে
আমার মতো বেশ কিছু শহুরে মানুষ, এই মুহূর্তে তোতলাডোহতে বাসের লাইনে দেবস্হান দর্শনে।
পেঞ্চের কোর এরিয়ার সিল্লারী গেট, সেই গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রায় ১৩ কিমি। কেবলমাত্র চারচাকা নিয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি আজ সর্বসাধারণের। গেটের সামনে লম্বা লাইন পড়েছে। বনদফতরের কর্মীরা আজ একটু বেশিই তৎপর। বারংবার বলছেন, জঙ্গলের ভেতরের নিয়ম কানুন। গাড়ি ধীরে চালানোর অনুরোধ। মনে করাচ্ছেন গাড়ি থেকে না নামার কথা, কোনো কিছু গাড়ি থেকে জমিতে না ফেলার কথা। হর্ণ বাজানো, ধূপ ধুনো প্রদীপ না জ্বালানো বা বাজনা ইত্যাদি নিয়ে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
গেটের সামনে বসে কর্মীরা লিখে রাখছেন নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, গাড়ীর নম্বর। তারপর ইস্যু করছেন গেট পাস। অল্প কিছুটা এগোতেই নজরে পড়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর বনদফতরের কর্মীরা নজরদারিতে ব্যস্ত। আজ শুধুমাত্র লাঠি নয়, বন্দুকধারীরাও রয়েছেন, ঊর্দিতে লেখা STPF, (Special Tiger Protection Force)
যারা নিয়মিত জঙ্গলে যাতায়াত করেন তারা জানেন, যে জঙ্গলের কেবলমাত্র একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে সাধারণের প্রবেশের অনুমতি থাকে, আজ তার অন্যাথা হয়েছে, নতুন পথের হদিশ পেয়ে আজ আমি একটু বেশিই উৎসাহী। পরপর গাড়ির লাইন বনপথে, থেকে থেকেই থামছে, কখনও একদল হরিণ, গাছের নীচে, নিশ্চিন্তে পাতা চিবোচ্ছিলো, এখন মুখ তুলে দেখে ভেতরের দিকে ঢুকে গেল। বেশ কিছু হনুমান অযথাই রাস্তা পারপার করে একটা উঁচু পাথর, চবুতরার মতো, সেখানে গিয়ে বসলো, প্রায় সবকটাই।
লতানে গাছগুলোর কত বয়স কে জানে সাপের মতো জড়িয়ে ধরেছে পাশের গাছগুলোকে। কান্ডগুলো যথেষ্ট মোটা। একটা ভূতগাছ, মাঝখানে কান্ডটা দুভাগ হয়ে দুদিকে এক্কেবারে ৯০ ডিগ্ৰী। সেগুন, খয়ের কুসুম, বহেড়া, মহুয়া, কাঞ্চন, আরো কতো কি, চেনা অচেনা গাছগুলো। রঙ বদলাচ্ছে প্রকৃতি, হলুদ হচ্ছে পাতাগুলো। থেকে থেকে দমকা হাওয়ায় উড়ছে ঝরা পাতা। ইতিউতি পলাশ, ঋতু বদলের জানান দিচ্ছে, কাগজের হেডলাইনে জায়গা নিয়েছে, Palash signals seasonal shift. কতগুলো নীলগাই একটু তাড়াহুড়ো করে সামনের উঁচু জমিটার উপরে উঠে ঢাল বেয়ে নেমে চোখের আড়াল হল। সম্বরটা, ছুটছিল, তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে দুটো কান খাড়া করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। বিপদের অনুমান করার ক্ষমতা এদের অপেক্ষাকৃত কম, তাই এরা নাকি মন্দবুদ্ধি।
একটা মস্তবড়ো বটগাছ, ঝুরি নেমেছে, কিছু পাখির কলরব,একঝাঁক ধণেশ,ছাই ছাই রঙের,উড়তেই কেঁপে উঠলো ডালপালাগুলো…
उड़ के जाते हुए पंछी ने बस इतना ही देखा
देर तक हाथ हिलती रही वह शाख़ फ़िज़ा में
अलविदा कहने को … या पास बुलाने के लिए…
উড় কে জাতে হুয়ে পঞ্ছী নে বস ইতনা হী দেখা/দের তক হাথ হিলাতী।রহী।ওহ শাখ ফিজা মে/ অলবিদা কহনে কো… ইয়া পাস বুলানে কে লিয়ে…
তিন পংক্তির কবিতা, ত্রিবেণী, গুলজার সাহেবের… মনে পড়ে। শিখেছিলাম এর আক্ষরিক অর্থ ও ভাবার্থ। উড়ে যাওয়ার সময় নড়তে থাকা গাছের ডালপালাগুলো ফের ডাকছে না বিদায় জানাচ্ছে যেরকম বোঝা যায়না ঠিক সেইরকম এটা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে সেই পুরনো স্মৃতিগুলো কি আমাদের মুক্তি দিচ্ছে, নাকি এখনও বন্দী করে রেখেছে।
একটা খোলা ঘাসজমি, বেশ কিছুটা অংশ জুড়ে। বড় বড় হলদেটে ঘাস, সেখানেই গাড়ি পার্কিং এর ব্যবস্হা। সঠিক জায়গায় পার্ক করতে বলা হচ্ছে সাধারণকে। এরপর বাকি তিন চার কিমি পাহাড়ি পথটা বনদফতরের বাসে যেতে হবে। সিঙ্গল লাইনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বাসে ওঠার অনুরোধ বনকর্মীদের। আর এই বাসের লাইনেই আলাপ গোপালদের সঙ্গে। জানতে পারা, ওদের গ্ৰামটা এখন আর নেই, মুকুলের মন্দার বোসের মতো এখানে কেউ বা কারা সেটা ভ্যানিশ করে দিয়েছে।
বাসের লাইন ভেঙে হুড়োহুড়ি, শহরের পরিচিত দৃশ্য আবার চোখের সামনে।
শহুরে মানুষেরা শহরে নিয়ম ও শিষ্টাচার কতোটা মেনে চলেন তার অভিজ্ঞতা তো আছে, সেটা বনেও দেখছি। নাহ বনদফতরের লোকজন তো আর ট্রাফিক পুলিশ নন, তাই কিছুক্ষেত্রে অপারগ, হয়তো এনাদের চালচলন দেখে হতাশও।
বাস থেকে নেমে এবার সামান্য কিছুটা হাঁটা পথ, চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, সামনেই দেবস্হান। পেঞ্চ নদীর জলধারা, তোতলাডোহর আম্বাখোরিতে ঝর্ণা হয়ে ঝরছে একটা টিলার গা বেয়ে। সেখানেই ছোট্ট একটা গুহায়, মহাদেবের অধিষ্ঠান, দূর থেকে চোখে পড়ছে। বেশ কিছু পুণ্যার্থী লাইনে, ধীরে ধীরে লাইন এগোয়, একটা হ্যান্ডমাইক হাতে একজন কর্মী, ভীড় কন্ট্রোলের চেষ্টা, অনুরোধ ধীরে চলার, শ্যাওলা, পিছল পথ সাবধানে এগোই।
সঙ্গে করে আনা ছোট্ট ঘটিতে ঝর্ণার জল ভরছেন কেউ কেউ, কেউ অন্য কোনো পাত্রে, শিবের মাথায় জল ঢালার জন্যে। আমার সামনের ছেলেটি, সুধাংশু, দেওলাপারে বাড়ি। জলের বোতলটা চায় সে, বোতলের জলটা ফেলে ঐ ঝর্ণার জল ভরে। ঝর্ণার জল মেখেই গুহায় প্রবেশের সংকীর্ণ পথ। বোতল থেকে জল ঢেলে স্নান করায় সে তার অভীষ্টকে। আমাকে বলে হাতটা বাড়াতে, শ্যাওলা ধরা, জলে ভেজা শিবলিঙ্গটা জড়িয়ে ধরি ওর দেখাদেখি।একটা অদ্ভুত শিহরণ হয় শরীরে।
কোনো পূজারী নেই , পন্ডা নেই, অর্থের আস্ফালন নেই। বেশকিছু ফুল পাতা আমার হাতে গুঁজে দেয় সে, শিবলিঙ্গটার মাথায় রাখি। সেটাই কুড়িয়ে নিয়ে হাতে দেয়, বলে “বাড়ি নিয়ে যাও সাব্, আশীর্বাদী“। সেই প্রসাদী ফুল পাতার ছবি ধরে রাখি মোবাইলে। কাছের মানুষ যারা দূরে আছেন তারা ভালো থাকুন এইটুকুই তো অভিপ্রায়, এই প্রসাদ তাদের না পাঠালে এ যাত্রা যে বৃথা।
বিড়বিড় করে কিছু বলছিল সুধাংশু… সম্ভবত… ওম নমঃ শিবায়, আমার ওকে দেখে মনে পড়ছিল হংসরাজ রঘুবংশীর গাওয়া গানটা….
শিব সমা রহে মুঝমে ঔর ম্যায় শূন্য হো রহা হুঁ
ক্রোধ কো, লোভ কো, ম্যায় ভষ্ম কর রহা হুঁ…
ঝর্ণার জল মেখে গুহার ভেতরে ঢুকেছিলাম, এবার বের হওয়ার সময়ও একপ্রস্থ জলে ভেজা। তাকিয়ে দেখি কেউ কেউ জলের নীচে দাঁড়িয়ে আপাদমস্তক ভিজছেন, আবার উপস্থিত অনেকেই সেই ঝর্নার জল আঁজলা ভরে পান করছেন দেখে অবাক হই।
শহুরে মানুষ আবার পেটরোগা ভীতু বাঙালি আমি। নাহ, এই অবাক জলপান আপাতত থাক। রুমালটা কোথায় যে রাখলাম, ভেজা মাথাটা পুছতে হবে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে, শীত ধরছে বেশ। সেবার শীতকালে হোসেঙ্গাবাদে নর্মদার ঘাটে প্রকাশ আর আমি বসে আছি, থেকে থেকে প্রকাশ বলছিল “ডুবকি লাগাতে হবে“, তবেই নাকি জন্ম সফল, তখনই এক সাধু মহারাজের সঙ্গে কথায় কথায় শেখার চেষ্টা বাহ্যিক শুদ্ধতা নয়, চেতনার শুদ্ধির কথা।
রামবিলাস শর্মা ও তার সহযোগীরা, এই আয়োজনের উদ্যোক্তা, সামান্য আলাপচারিতায় জানতে পারি তাদের ট্রাস্টের এই উদ্যোগের কথা। খবরের কাগজে নাকি এক সপ্তাহ আগে এই বিশেষ দিনে সাধারণের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে, সে কথা প্রকাশিত হয়েছিল, সেটা জেনেই হয়তো পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে, আর আমার মতো কয়েকজন, অরণ্যের অভ্যন্তরে পড়ে পাওয়া সুযোগের সদব্যবহারে।
থেকে থেকে জয়ধ্বনির আওয়াজ কানে আসছে, ওম নমঃ শিবায়। বাঁশি বাজিয়ে, হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে, উপস্থিত জনতাকে বারংবার অনুরোধ দফতরের… কৃপয়া শান্ততা ঠেবা। লাইন সোজা রাখার অনুরোধ, চোখে পড়ে দূরে একটা আ্যম্বুলেন্স দাঁড় করানো রয়েছে, হঠাৎ কোন দরকার হলে কাজে লাগবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্হাদি পাকাপোক্ত দেখে ভালো লাগে, তবে ভীড়টা যে ভাবে বাড়ছে, আশঙ্কা হয় ভবিষ্যতে দেব দর্শনের অনুমতি থাকবে তো।
উপস্থিত মানুষজনকে ফের একবার তাকিয়ে দেখি, এর মধ্যে অধিকাংশ চেহারাই আমার অতি পরিচিত ভারতবর্ষের। শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর অটুট আস্হায় ভর করে পাওয়া না পাওয়ার বেদনাকে বয়ে নিয়ে চলেছে যেন অনন্তকাল ধরে। অজান্তেই হাত দুটো জড়ো করে ফেলি ঈশ্বরকে কিছু বলতে চেয়ে, ধরমবীর ভারতীর লেখা হিন্দি কবিতাটা থেকে দুটো লাইন ধার করি …
सृजन की थकन भूल जा देवता
अभी तो पड़ी है धरा अधबनी,
সৃজন কী থকন ভুল জা দেবতা
অভী তো পড়ী হ্যায় ধরা অধবনী…
Don’t get tired of creating, God
The world isn’t complete yet
সামনের চবুতরার ওপরে দুজন স্বেচ্ছাসেবক, সাবুদানা বিলি করছেন কাগজের থালায়, হাত বাড়িয়ে ধরে বলছেন “প্রসাদী লিজিয়ে।“আমি হাত বাড়াই। ফুটফুটে দুই শিশু, পাথরের একটা ধাপে বসে প্রসাদের কাগজের থালা হাতে। অবাধ্য সাবুদানাগুলো যতটা মুখের মধ্যে যাওয়ার কথা অধিকাংশই মুখের বদলে বাইরেই পড়ছে। যত্নবান আর ধৈর্যশীল বাবাটি, এক এক করে মাটি থেকে সেই সাবুদানাগুলো তুলে নিজের মুখে ফেলছেন। চোখাচোখি হয়, সলজ্জ হাসি মুখে বলে ওঠেন আমায় নমস্তে,
সামনে বাবাকে দেখে বড় শিশুটিও আধো আধো গলায় বলে ওঠে নমস্তে। হাত দুটো জড়ো করি আমিও, বাবা ও সন্তান, তাদের শিক্ষা ও সংস্কার আমাকে ফের শেখায়…
बिना प्रार्थना के जहां मुराद पूरी हो जाए
पिता इस मंदिर का नाम है
বিনা প্রার্থনা কে জহাঁ মুরাদ পুরী হো জায়ে
পিতা ইস মন্দির কা নাম হ্যায়।
এবার ফেরার পালা, বাসে বসে চোখটা আটকে যায় একটা স্লোগানে, সবুজ সাদা একটা স্টিকার, সেখানে লেখা, Conserve, There is NO PLAN et B… পাশে আরো একটা, ভাবিয়ে তোলে আমায়, পাছে ভুলে যাই, ছবি তুলে রাখি।
চোরবাউলি, বনেরা, সুরেওয়ানী, কোলিতমারা… এবার কোন রাস্তাটা ধরি ভাবছিলাম, আর একটু এলোমেলো ঘুরে বেড়িয়ে না হয় পৌঁছোব সুয়ারধারায়। এবারেও সঠিক সময়ে নিমন্ত্রণ পত্রটা পাঠিয়েছেন বলুকর মহারাজ আর রবীন্দ্র তিওয়ারি, ভজন ও ভোজন এই দুইয়ের বন্দোবস্ত আছে প্রতিবছরের মতোই।
ছোট্ট মন্দিরটা, নতুন করে ফের রঙ হয়েছে, পাশের ইঁদারাটায় টলটলে জল, উঁকি মারলে ফের একবার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। চন্দ্রভান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। সোনু, হর্ষল, গুঞ্জন, সবাই… “দাদা স্যার এবার বড্ড দেরী করেছো কিন্তু“, উষ্ণ আপ্যায়নে মনটা ভরে ওঠে।
দূর গ্ৰাম থেকে আবার একটা পাল্কী এলো, বীণা, মঞ্জিরা, ঢোলক, নাম গান করছেন সেই দলের সদস্যারা। পুরুষদের পরণে সাদা পোষাক, প্রত্যেকের খালি পা। বালতি করে জল তোলে ছেলেগুলো, পরম যত্নে পা ধুইয়ে দেয় তাদের। কৃষ্ণের নামগান হচ্ছে এই মুহূর্তে, ভাষা সমস্যায় সবটুকু বোঝা অসম্ভব।
কে একজন বললে ওয়ারকারি। জেনেছিলাম
এই ওয়ারকারিরা মহারাষ্ট্রের ৭০০–৮০০ বছরের পুরনো বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের ভক্ত, যারা পান্ডারপুরে পায়ে হেঁটে বার্ষিক, সুশৃঙ্খল তীর্থযাত্রায় অংশ নেন। এই ওয়ারকারিরা কৃষ্ণের এক রূপ বিঠ্ঠল (বিঠোবা) এর পূজা করেন,আর সবচেয়ে বড়ো যেটা এরা নিঃস্বার্থ ভক্তির উপর জোর দেন।
একটা কলসী বাঁধা ছিল ওপরের তারে সেটাও ভাঙা হয়েছে, ঐ ননীচোরা গোপালকে মনে করে। বেশ কয়েকবছর পর পর এসে বুঝে গেছি ভোজনের সময় এবার ঘোষিত হবে। গোপালকালা মাখা সাঙ্গ হয়েছে। গোপালকালা অনেকটা ঐ দধিকর্মার মতো তবে মিষ্টত্ব নেই , নোনতা। ভারতের প্রত্যন্ত গ্ৰামে এই মুহুর্তে শিব ও হরি মিলে মিশে গেছে, বলুকর মহারাজ গাইছেন “জয় জয় রামকৃষ্ণ হরি“, জনগণ ধুয়ো দিচ্ছে। আমি ফের একবার ছেলেবেলায় ফিরি, গুয়াবাগানের বাবাজি বাড়িতে, বাবাজি বললেন “প্রেমানন্দে হরি হরি বলো“, আমি তৈরী, বাতাসা লুফতে হবে, হরির লুঠ হবে যে।
প্রথম ব্যাচে মহিলা ও নামগানের লোকজনরা বসবেন কিছুটা সময় আছে ভোজনের, তাই রীতেশ কে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলের অন্যদিকে ঢুকি, একটা লেবুগাছ আর কাঁঠালগাছ আছে ঐ দিকটায়, রবীন্দ্রজীর বাড়িটা এই পথেই। বেশ কিছু এঁচোড় ফলেছে। এঁচোড় পাকলে তবেই কাঁঠাল হয় জানি। কিন্তু রীতেশের কাছে পাকা হোক বা কাঁচা দুটোই কাঁঠাল।
হাতের কাছে একটা লাঠি পেলে, কাঁঠাল গুলো অনেকটা উঁচুতে, আফশোস করে রীতেশ। সাইকেলটায় হাফপ্যাডেল করে আসছিল একটা ছোট্ট মেয়ে, এখানে অবশ্য হাফপ্যাডেল বলেনা, বলে কাঁইচি। গুড়িয়া এই গুড়িয়া, রীতেশের ডাকে থামে সে। গাছের তলায় সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে ক্যারিয়ারের ওপর উঠে দাঁড়ায় রীতেশ, আমায় বলে ধরো সাইকেলটা। পুরোনো সাইকেলটার কলকব্জা জানান দেয় শব্দ করে…
হাওয়ার উপর চলে গাড়ি | লাগেনা পেট্রল ডিজেল, মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল,
মুনির সরকারের বাউল গানটা, দেহতত্ত্বের। আনমনে গুনগুনিয়ে উঠি…
দুই চাকায় করেছে খাড়া
জায়গায় জায়গায় ইস্কুরুপ মারা
চিন্তা করে দেখনা একবার, চিন্তা করে দেখনা একবার, দুইশ ছয়টা হয় এক্সেল
কি চমৎকার গাড়ির মডেল গো
মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল…
রীতেশ এঁচোড় ছিঁড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে একপ্রস্থ আঠা ঝরে পড়ে, কিছুটা গায়েও লাগে। চটচটে আঠা রীতেশের মুখেও পড়েছে।
চলো দাদা কুয়োর পাড়ে, লেবু পরে হবে, রীতেশ বলে ওঠে।
ও আঠা লাগলে পরে ছাড়বে না
গোলেমালে গোলেমালে পিরীত কোরো না
ওরে পিরিতি কাঁঠালের আঠা
পূর্ণ দাস বাউলের এই গানটা মুখস্থ করে ভোমলা স্কুলে এসেছিল, সদ্য কৈশোরে সরস্বতী পুজোর আবহে, গোলেমালে কথাটা কে কতবার কি ভাবে বলতে পারে, ভোমলা আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছিল, টিফিন পিরিয়ডে। পিরীতির আঠা যে ভয়ংকর গোলমেলে ব্যাপার সেটা নিয়ে আলোচনা চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। ও আঠা সেই বয়সে আমার গায়ে না লাগলেও, কয়েকজনের তো লেগেছিল। আজ কুয়োর পাড়ে পৌঁছে জল ঢালার পরে বুঝতে পারছিলাম, ও আঠা লাগলে পরে ছাড়ে না।
নিজের মনেই হেসে উঠি, ফেলে আসা সময়ের কথা মনে করে, সেই বয়সটা, যেখানে আর পৌঁছনোর তো উপায় নেই । কেউ সেদিন হোয়াটসয়্যাপে লিখেছিল, এই বয়সটা নিয়েই…
এক “উম্র” কে বাদ,
“উস উম্র” কী বাতে
“উম্র ভর” ইয়াদ আতী হ্যায়,
পর “ওহ উম্র“
ফির “উম্র ভর” নহী আতী..
কাঁধের ব্যাগটা থেকে লজেন্সের প্যাকেটটা বের করি, মেয়েটিকে ডাকি, “গুড়িয়া লো।” ঘাড় নেড়ে বারণ করে সে। নাহ্ মা বারণ করেছে, অপরিচিত মানুষের থেকে…মারাঠিতে উত্তর দেয় সে। মা কোথায় তোর, দূরে আঙুল দেখায়, ঐ যে রান্নার জায়গায়।
শ্বাপদ সংকুল পরিবেশে ছেলে মেয়ে পরিবার নিয়ে ঘর করতে শত অসুবিধার মধ্যেও মানুষগুলো মানিয়ে নিয়েছে, এখানেই বড় হওয়া, ভয় ডর হীন জীবনে অভ্যস্ত হলেও, অচেনা অজানা মানুষগুলো থেকে দূরত্ব রাখার প্রয়োজনীয়তা… মেয়েটির মায়ের কাছে গিয়ে বলি, সঠিক শিক্ষা দিয়েছো তুমি। খুব শিক্ষণীয় প্রত্যেকের কাছে। গ্ৰাম্য বধূটি লজ্জা পায়, শাড়ির আঁচলে মুখটা ঢাকে। উপস্থিত বাকি মহিলারা যারা রান্নার কাজে ব্যস্ত তারাও অবাক চোখে দেখে আমায়, কেউ কেউ চিনতে পারে, “দাদা স্যার” মারাঠিতে একে অপরকে বলে “চাঙ্গলা মানুষ আহে।” ভালোমানুষের সার্টিফিকেট পেয়ে আশ্বস্ত হই, মনের মাঝে হানা দেন রবি ঠাকুর
ভালোমানুষ নই রে মোরা ভালোমানুষ নই
দেশে দেশে নিন্দে রটে, পদে পদে বিপদ ঘটে–
সেগুন গাছগুলোর নীচে লম্বা সতরঞ্চি পাতা হয়েছে, শালপাতার ওপর জল ছিটিয়ে পরিষ্কার করে গরম গরম ভাত, এক অদ্ভুত সুগন্ধ উঠতে থাকা ধোঁয়ায়। দুটো হাত মেলে ধরতে হয়, রুটি নেওয়ার সময়, এখন শিখে গেছি। ছোলা আর কুমড়োর ঝাল ঝাল তরকারি, ডালে পালং শাক আর চিনেবাদাম। পেঁয়াজ টমেটো আর কাঁচা লঙ্কা কুচোনো স্যালাড, সুজির হালুয়া শেষপাতে। নিত্যদিন যা জোটে ভক্তের ভগবানকে সেই অন্নই নিবেদন করার পর উপস্থিত সকলে প্রসাদ গ্ৰহণ করছেন। বার বার অনুরোধ আর একটু নিন, থালা তো খালি। সাধারণ আয়োজন আর অসাধারণ আন্তরিকতা, অভিভূত হই। ভোজন শেষে একত্রে সকলে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করলেন, কিছু বললেন, দেখাদেখি আমিও হাত জোড় করি। আবারও একবার উপলব্ধি করি…
খুশ মন ঔর খুশ চেহরা
যহী জীবন কী সম্পত্তি হ্যায়
জমির ওপর পাতা সতরঞ্চিতে হাঁটু মুড়ে বসার, অনভ্যাস, হাঁটু কোমর, সব জানান দেয় তারা পুরোনো হচ্ছে,
ফের বাউল গানটা গুনগনিয়ে উঠি…
নতুন সাইকেল পুরান হইবে
কলকব্জায় জং যে ধরিবে…
মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল।
সকলের থেকে বিদায় নিয়ে এবার ফেরার পালা, দাদা স্যার আবার আসবে, কথা দিই
অবশ্যই। সামান্য এগোতেই চোখে পড়ে, সাজা গাছটা, সিঁদুরের টিকা, কিছু ফুল ছড়ানো নীচে। বনদেবতার পুজো হয়েছে।
জগজিৎ সিং এর গাওয়া গজলটা …”ইয়া খুদা অব কে ইয়ে কিস রঙ্গ মে আঈ হ্যায় বহার,… জর্দ হী জর্দ হ্যায় পেড়ো পে হরা কুছ ভী নেহী… জিন্দেগী…
জর্দ কথাটার অর্থ হলুদ, জঙ্গলের রঙ বদলাচ্ছে। পাতাগুলো হলুদ হচ্ছে, সূর্যটাও ডুবছে, রাস্তাটা হলুদ রঙে রাঙিয়ে দিয়ে।
এরপর ফুটবে পলাশ, গাঢ় লাল হবে জঙ্গল, তারপর ধীরে ধীরে বাদামী হয়ে খয়েরী হবে প্রবল গ্ৰীষ্মে। তারপর বর্ষার শেষে যখন ঘন সবুজ, নতুন করে জঙ্গল খুলবে তখন ফের একবার পুজো সেরে জঙ্গলে ঢোকার অনুমতি নেওয়া হবে দেবতার থেকে।
এখন এই অবধি থাক রঙ বদলানো জঙ্গলের গল্প নিয়ে আসবো আবার কোনো একদিন, অনুমতি পেলে।
কৃতজ্ঞতা:- লেখার মধ্যে ব্যবহৃত কবিতা গান শায়েরী ইত্যাদির সকল রচয়িতাদের আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা।
———————————————-

লেখক পরিচিতি
চন্দননগরের দেব মুখার্জি,কর্মসূত্রে প্রবাসী বহুদিন ধরে। ভ্রমণ ছিল তাঁর পেশার অঙ্গ। এখন নেশায় দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজে অকাজে ঘুরে বেড়িয়ে,সেই পথ চলার কিছু কথা,পথচলতি মানুষের কথা-অল্প কয়েক বছর আগে শখ করেই লিখেছিলেন ফেসবুকে। সেই লেখা পছন্দ করেন অনেকেই। লেখা চালিয়ে যেতে বলেন। উনি আর থামেন নি। মাঝে মধ্যে কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন,ই-বুক বা সংকলনগুলোতে কিছু লেখা ছাপাও হয়। সবাই প্রশংসা করে। ফেসবুকে পরিচিতি পেয়েছেন,ধারাবাহিক ভাবে লিখে গেছেন কয়েকটি ফেসবুক গ্ৰুপে দীর্ঘদিন। আজও তিনি নিয়মিত লেখেন ফেসবুকে তাঁর টাইমলাইনে। এবার বই হোক,মলাটবন্দী হোক সৃষ্টিগুলো-বন্ধু বান্ধব,পাঠক পাঠিকা আর শুভানুধ্যায়ীদের অনুরোধ,আবদার ছিল দীর্ঘদিনের। জনপ্রিয় কয়েকটি লেখা বেছে দিয়েছিলেন তাঁরাই। ছাপা অক্ষরে দেব মুখার্জীর প্রথম প্রচেষ্টা ‘পাড়ি’। আশা রাখি ভবিষ্যতে এরকম আরও অনেক অপরিচিতই কাছের মানুষ হয়ে উঠবেন ওনার জীবনমুখী অরণ্য প্রেমের ছোঁয়ায়।
