
কেষ্টদার গোয়েন্দাগিরি
চন্দ্র কান্তি দত্ত
বাংলা সাহিত্যের গোয়েন্দাদের মধ্যে কে সবচেয়ে দক্ষ, এই বিষয়টাকে নিয়ে সেদিন সান্ধ্য আড্ডায় ঘোর তর্ক বেধে গেল।
বিপিন ব্যোমকেশের অন্ধ ভক্ত। বলল, “দেখ, গোয়েন্দা হতে হলে ব্যোমকেশের মতো হও। একদিকে সংসার করছে, অন্যদিকে দুর্দান্ত গোয়েন্দাগিরি। অথচ, দুটোতে কোন সংঘাত নেই।“
উদয় আড্ডার সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। এখনও বিয়ে–থা করেনি। সে আবার চিরকুমার ফেলুদার ভক্ত। বলল, “যতই বলো, যখন মাঝে মাঝে অ্যাকশন করতে হয়, তখন কিন্তু তোমার ব্যোমকেশ অচল। অ্যাকশন হিরো হল ফেলুদা – প্রদোষ চন্দ্র মিটার। ব্যায়াম করা শক্ত ছিপছিপে শরীর। ছ–ফিট উচ্চতা। যেকোন পরিস্থিতির জন্য তৈরী। আর ওইরকম একটা মগজাস্ত্র। ভাবা যায়!”
উদয়ের কথা শুনে নন্দীবাবু বললেন, “দেখ! গোয়েন্দা গল্প আমি খুব একটা পড়িনি। তবে, আমি যা বুঝি, যে কোন গোয়েন্দার প্রধান সম্পদই হল তাঁর মাথা বা মগজাস্ত্র। আরে ভাই, প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন না হলে কি আর গোয়েন্দা হওয়া যায়?”
নন্দীবাবুর কথা উদয় সবটুকু মানতে পারল না। বলল, “কিন্তু এটা তো মানবেন নন্দীবাবু যে, শুধু বুদ্ধি দিয়েই সবসময় কাজ হয় না। গোয়েন্দাকে কখনো–সখনো শত্রুর ডেরাতেও হানা দিতে হয়। বা ধরুন যখন শত্রু নিজেই গোয়েন্দাকে রাস্তা থেকে সরাতে চেষ্টা করল, এই দুই ধরণের পরিস্থিতিতে কিন্তু বুদ্ধির সাথে শারীরিক দক্ষতা, মানে বাহুবল আর অস্ত্রবল, দুটোই দরকার পড়ে। ঠিক কিনা বলুন? “
“তাই যদি বলো, তাহলে বলব, সেরকম গোয়েন্দা গল্প তোমরা মানে উদয়, অজু বা বিপিন পড়ই নি। সে ছিল আমাদের ছেলেবেলার হিরো – দীপক চ্যাটার্জী, সাথে সহকারী রতনলাল। সে যা অ্যাকশন, তার কাছে এসব গোয়েন্দার অ্যাকশন তো নস্যি হে! কি বলেন কেষ্টদা, কি বলেন জলধরবাবু?”
কেষ্টদা এতক্ষণ চুপচাপ বসে এসব তর্ক–বিতর্ক শুনে যাচ্ছিলেন আর মাঝে মাঝে ভিতরের দরজার দিকে তাকাচ্ছিলেন। আজ এখনও জলখাবার বা চা, কিছুই জোটেনি। সে কারণেই হয়ত কেষ্টদার মুড ঠিক হয়নি। কিন্তু নন্দীবাবুর কথায় মুখ খুলতে বাধ্য হলেন, “হ্যাঁ! সে একটা সময় ছিল বটে। সন্ধ্যের সময় পড়তে বসেছি। জানালা দিয়ে একটা চল্লিশ পাতার ছোট বই এল। সেটাকে সঙ্গে সঙ্গে বড় বইয়ের ফাঁকে রেখে আধঘণ্টারও কম সময়ে পড়ে ফেলা। মানে গিলে ফেলাই বলতে পারো। তারপরই আবার জানালার ফাঁকে গুঁজে দেওয়া। যার উপর দায়িত্ব সে সময়মতো এসে নিয়ে যাবে। স্বপনকুমারের লেখা হাড় হিম করা সব গোয়েন্দা কাহিনী। একদিকে দুর্দ্ধর্ষ চিনে দস্যু। বিশাল এলাকায় তার বিস্তৃতি আর বেআইনী কারবার। যেকোন মানুষকে খুন করতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগে না। আর তার বিরুদ্ধে সহকারী রতনলালকে নিয়ে একা দীপক চ্যাটার্জী। সেসব অ্যাকশন এখন কোথায় পাবে?”
“এবার আমি একটা কথা বলি?” অজু বলে উঠল, “দেখুন কেষ্টদা! আপনাদের দীপক চ্যাটার্জীকে আমরা কিন্তু চিনিও না। কেননা, স্বপনকুমারের কোন বই আমি অন্ততঃ বাজারে দেখিনি। তবে, যেসব অ্যাকশনের কথা বললেন, আমাদের নীহাররঞ্জনের কিরীটিও কিন্তু এসবে কিছু কম যান না। তাছাড়া, কিরীটী রায় এসেছেনও এঁদের মধ্যে সবার আগে। বস্তুত, কিরীটিকে এক অর্থে এঁদের গুরুও বলতে পারেন।“
“দূর! সিনিয়র গোয়েন্দা সম্পর্কে তুই কতটুকু জানিস রে অজু?” কেষ্টদা বললেন, “শুনে রাখ, কিরীটির থেকেও সিনিয়র গোয়েন্দা ছিলেন দেবেন্দ্রবিজয়। তোরা তাঁরও নাম শুনিসনি হয়ত। বিখ্যাত সাহিত্যিক দীনেন্দ্রকুমার রায়ের সৃষ্টি। সহকারী ছিলেন অরিদমন। বাংলা সাহিত্যে এক অর্থে তিনিই প্রথম গোয়েন্দা। বাকি সব গোয়েন্দার শিক্ষাগুরু বা দ্রোণাচার্য বলা যায়।“
নন্দীবাবুর ভাই হুগলী থেকে বাগানের বড় বড় বেগুন পাঠিয়েছেন। সেই বেগুন দিয়েই আজ পঞ্চানন বেগুনী ভাজছে। এখানে একটা কথা বলতেই হয় – জলখাবারের ব্যবস্থা যা–ই হোক, আমাদের সেটা গামলা ভরে চাই। আজ অবশ্য গামলা ভরে আসেনি। কারণ, পঞ্চানন বারে বারে বেগুনী থালা ভরে সরবরাহ করবে।
আজ কেষ্টদা তোলার আগেই জলধর সেন একখানা তুলে নিলেন। ব্যাপারটা কেষ্টদার খুব একটা মনঃপূত হল বলে মনে হল না। তবে কেষ্টদা জলধর সেনের উপরে একটা বাঁকা দৃষ্টি নিক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই করলেন না। তারপর একসাথে দুখানা তুলে নিলেন। সকলে নেওয়ার পর নন্দীবাবু একটা নিয়ে কামড় বসানোর আগে হঠাৎ বললেন, “আচ্ছা কেষ্টদা! একটা কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনার সেই কোচবিহার না মাথাভাঙ্গা, কোথাকার সেই গোয়েন্দাগিরিটা? মনে আছে?”
কেষ্টদার গোয়েন্দাগিরির কথা শুনে বিপিনের গলায় হঠাৎ একখন্ড বেগুনী আটকে গেল। বিপিন বিপুল বেগে কাশতে কাশতে কোনক্রমে বলল, “সেকি? কেষ্টদা গোয়েন্দাগিরিও করেছেন নাকি? সেটা কিরকম শুনি।”
জলধর দ্বিতীয় বেগুনীটা নিতে হাত বাড়িয়েছিলেন মাত্র। কিন্তু নেওয়া আর হল না। মাঝপথে থেমে গিয়ে বললেন, “মানে? কেষ্টদার গোয়েন্দাগিরি?” কথাটা বলেই জলধর থালায় রাখা শেষ বেগুনীটা নিতে হাত বাড়ালেন। কিন্তু কেষ্টদা এমনভাবে ছোঁ মেরে সেটা নিয়ে নিলেন যে জলধর কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। মুখে অবশ্য বললেন, “নিন নিন। পঞ্চানন এখনই আবার গরম গরম আনবে।“
কেষ্টদা নির্বিকার মুখে বেগুনীতে একটা কামড় দিয়ে চিবোতে চিবোতে বললেন, “না না। গোয়েন্দাগিরি–টিরি করিনি কখনো। ওসব কি আর আমার কাজ? ওসব তোমাদের ওই নামকরা গোয়েন্দারাই পারেন।“
“তবে যে নন্দীবাবু বললেন?” জলধর বাধা দিলেন।
নন্দীবাবু বয়োঃজ্যেষ্ঠ লোক। তাঁর কথা কেষ্টদা আর উড়িয়ে দিতে পারলেন না। বললেন, “না মানে ওটাকে ঠিক গোয়েন্দাগিরি বলা চলে না। তবে ওরই কাছাকাছি একটা ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। আসলে ব্যাপারটা কি হয়েছিল জানো? চোখের সামনে হঠাৎ একটা অপরাধ গোপন করার চেষ্টা দেখে ফেলে নিজেকে আর দূরে রাখতে পারিনি। একরকম জোর করেই বিষয়টাতে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম” , কেষ্টদা রহস্যটা জিইয়ে রাখলেন।
জলধরও ছাড়ার পাত্র নন। বললেন, “তা সে গোয়েন্দাগিরি বা তার কাছাকাছি, যা–ই হোক, একটু বিশদে বলুন না দাদা! বেশ রোমহর্ষক একটা কাহিনী শুনে আমাদেরও তেলেভাজাগুলো একটু হজম হোক।“
“তেলেভাজা হজম হবে কিনা জানিনা। তবে তোমরা যখন এত করে বলছ, তখন শোন। কিন্তু তার আগে স্মৃতির গোড়ায় যে একটু দম দিতে হয়।“
“তেলেভাজা শেষ হলেই চা দিতে বলেছি। আপনি আরম্ভ করুন। চা এখনই এসে পড়বে” , নন্দীবাবু আশ্বস্ত করলেন।
গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে কেষ্টদা শুরু করলেন, “এম এ পাশ করার পর বছর না ঘুরতেই অপ্রত্যাশিত ভাবে চাকরিটা পেয়ে গেলাম। অপ্রত্যাশিতই, কেননা, সে সময় ভারতবর্ষে বেকার সমস্যা একটা জলন্ত সমস্যা। আমি তোমাদের যে নকশাল আন্দোলনের কথা বলেছিলাম, তার পিছনেও আরও অনেক কারণের সাথে বেকার সমস্যাও একটা কারণ ছিল। বিশাল এই দেশে শিক্ষিত বেকার প্রতি বছর নিরন্তর বেড়ে চলেছে। অথচ, কি করলে সেই সমস্যা মেটানো যাবে তার কোন দিশা নেই। কোন নতুন শিল্প আসছে না। আজকের এই তথ্য প্রযুক্তি, মানে ইনফরমেশন টেকনোলজি বা আজকের এফ ডি আই, মানে বিদেশী বিনিয়োগ – তখন ছিল দূরাগত স্বপ্ন।
সেরকম একটা সময়ে পাশ করার এক বছরের মধ্যে চাকরি পাওয়া, বুঝতেই পারছ, কি পরিমাণ আনন্দ পাওয়ার কথা। কিন্তু তাৎক্ষণিক একটা প্রবল আনন্দ মনে খেলে গেলেও, সেটা কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। চাকরিটা খুবই ভাল – কলেজে মাস্টারী। কিন্তু চাকরির জায়গাটা পাঁচ–ছশো কিলোমিটার দূরে ফালাকাটায়। ফালাকাটা হল আলিপুরদুয়ার জেলার একটা ছোট্ট শহর। গভীর জঙ্গলে ঘেরা। মন তাই কিছুতেই সায় দিচ্ছে না।“
“কলেজে পড়ানো মানে তো অধ্যাপনা। ওটাকে মাস্টারী বলে নাকি?” কেষ্টদার গল্পের মাঝেই বিপিন বলে উঠল।
কেষ্টদা কিন্তু রাগ করলেন না। বেশ শান্ত ভাবেই বললেন, “ওই একই হল। দুটোতে খুব একটা তফাৎ নেই। দুটোতেই কিছু ছেলেমেয়েকে পড়াতে হয়। একটাই মাত্র সূক্ষ্ম তফাৎ আছে – স্কুলে মাস্টারী করার সময় মাঝে মাঝে ছাত্রদের ঠেঙ্গাতে হয়, আর কলেজে ওরাই মাঝে মাঝে সেটা ফেরৎ দেয়। বুঝলে? শোন এবার।“
শোনামাত্র সমবেত একটা হাসির রোল উঠল। কেষ্টদা সেই অবসরে নিজের চায়ের গেলাসে গোটা দুয়েক চুমুক দিয়ে নিলেন। হাসির রোল থামতে আবার শুরু করলেন,
“দক্ষিণ বাংলার একটা মফ:স্বল শহরে বড় হয়েছি। কলকাতাও ভাল করে দেখিনি। সেই আমাকে কিনা মা–বাবা, ভাই–বোন, মায় আমার আবাল্যের শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে! এদিকে বাবা, মা, দিদি, বড়দা, মেজদা সবারই এক কথা – চলে যাও। আজকের দিনে চাকরি পেয়ে ছাড়তে নেই।
মেজদা আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থাটা পাকা করে ফেলল। মেজদার সাথে অতুল নামে একটা ছেলে পড়ত মহসীন কলেজে। ওদের বাড়ি ফালাকাটায়। ফালাকাটার এই কলেজটা নতুন। আগে ওখানে কোন কলেজ ছিল না। তাই অতুলকে হুগলিতে পড়তে আসতে হয়েছিল। ফালাকাটায় অতুলদের একটা নার্সিং হোম আর একটা ওষুধের দোকান আছে। অবস্থা খুবই ভাল। মেজদা একটা চিঠি লিখে ওকে পাঠিয়ে দিল। আবার সেই দিনই আমাদের মামাবাড়ি থেকে ট্রাঙ্ককল বুক করে ওর সাথে কথাও বলে এল। অর্থাৎ আমার অনিচ্ছার কফিনে শেষ পেরেকটাও মেজদা পুঁতে দিল।
“ফালাকাটা পৌঁছে কিন্তু অত খারাপ লাগল না। ঘন জঙ্গলে ঘেরা শহরটা ছোট। যানবাহন চলাচল খুবই কম। মানুষ সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে সাইকেল। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বলতে একমাত্র রিক্সা। শহরের ভিতরে বাস চলে না। বাইরের বাসগুলো স্টেশনের গায়ে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত আসে। অতুলদার কথামতো আমি ওদের ওখানেই উঠলাম। আমাকে নিতে অতুলদা স্টেশনে এসেছিলেন। কথা ছিল, কদিন ওঁদের ওখানে থেকে বাসা খুঁজে নেব। কিন্তু অতুলদার মা বাধা দিলেন। বললেন, ‘কেন বাবা? আমরা কি তোমার আপনার জন নই? এখানেই থাকো না। ভগবানের দয়ায় আমাদের তো ঘরের অভাব নেই। তাছাড়া, অচেনা অজানা জায়গায় কেন একা একা থাকবে?’
ওঁদের ওখানেই স্থায়ী হয়ে গেলাম। অতুলদার বাবার ইচ্ছে অনুসারে ওঁদের সংসারের হট্টমেলার বাইরে একেবারে উপরতলায় ছাদের পাশে একটা খোলামেলা সুন্দর ঘর আমাকে দেওয়া হল। ঘরটা বেশ বড় ও আসবাবপত্র দিয়ে পরিপাটি করে সাজানো। সাথে লাগোয়া স্নানের ঘর। সামনে খোলা ছাদ। সেখানেও আচ্ছাদন দিয়ে অনেকের একসাথে বসার ব্যবস্থা করা আছে। এককথায় অনবদ্য। খাওয়া–দাওয়া নীচে, সবার সাথে।
ছোট্ট শহরে কলেজটাও কাছে। হেঁটেই যাই। বিকেলে ছুটির পর, হেঁটে শহরটাতে খানিক ঘুরে বেড়াই। মাস দুয়েকের মধ্যে অলিগলিও চেনা হয়ে গেল। মাঝে মাঝে নার্সিং হোমে যাই। বেশ বড় নার্সিং হোম। সাথেই নীচে ওঁদের ওষুধের দোকান। শুনলাম, ওঁরা নাকি একাধারে ওষুধের ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলার দুই–ই। অর্থাৎ ব্যবসাটা বেশ বড়। সরকারি একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছাড়া আর কোন হাসপাতাল না থাকায় ওঁদের এতবড় নার্সিং হোম সবসময় ভর্তি থাকে।”
কেষ্টদা একটু থামলেন। গেলাসের বাকি চা–টুকু শেষ করে সবার দিকে একবার দেখে নিয়ে বললেন, “কি? গল্পটা ভাল লাগছে তো?”
অন্য কেউ কথা বলার আগে উদয় উত্তরটা দিয়ে দিল, “গল্প তো আপনি ভালই বলেন। কিন্তু আপনার সেই বিখ্যাত গোয়েন্দাগিরি কই?”
কথাটা শোনামাত্র কেষ্টদা রেগে গেলেন। বললেন, “দেখ উদো! ঠাট্টা করবি না, বুঝলি। আমি নিজে যাকে আদৌ গোয়েন্দাগিরি বলতেই রাজি নই, সেটার সাথে তুই আবার বিশেষণ যোগ করছিস? তোদের এসব ডেঁপোমি দেখলে গা–পিত্তি জ্বালা করে।“
বিপিন কেষ্টদাকে শান্ত করার চেষ্টায় বলল, ‘ছাড়ুন তো উদোর কথা। আপনি বলুন কেষ্টদা।‘
“হ্যাঁ, যা বলছিলাম। এমনি করে বছর দুয়েক পার করে দিলাম। জীবনযাত্রা একটা নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে ফেলেছি। মানে, আপনজনদের নিয়ে গড়া সংসারের বাইরের জীবনের সাথে বেশ মানিয়ে নিয়েছি।
তখন পুজোর মরসুম সবে শেষ হয়েছে। বাড়িতে পুরো ছুটিটা কাটিয়ে ফালাকাটায় ফিরেছি। পরদিন কলেজ খুলবে।
পরদিন, সকাল থেকে মাথাটা একটু ভার ভার লাগছিল। কলেজে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ছুটির পর আজই কলেজ খুলছে। ফালাকাটায় থেকেও না যাওয়া ভাল দেখায় না। ভাল করে স্নান করে কলেজে গেলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর থেকেই আবার খারাপ লাগতে আরম্ভ করল। কলেজে সেদিন কোন ক্লাস হল না। বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়, মিষ্টিমুখ করা আর পুজোর নানা আলোচনায় দিন কেটে গেল। এদিকে দুপুর থেকে মনে হচ্ছিল একটু জ্বরও হয়ত এসেছে।
বিকেলে ফেরার পথে অতুলদার দোকানে গেলাম। অতুলদা নেই। একজন কর্মচারী বললেন কোন কাজে নার্সিং হোমে ঢুকেছেন। আমি ক্যালপল চাইলাম। বিকাশ নামে ওঁদের যে ম্যানেজার আছে, সে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘দাদা, শরীর খারাপ?’ আমি বললাম, ‘না, এমন কিছু নয়। সকাল থেকে মাথাটা একটু ভার হয়ে আছে। এখন মনে হচ্ছে একটু জ্বর জ্বর ভাব হয়েছে। একটা ক্যালপল খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।‘
বিকাশ বলল, ‘একবার ডাঃ সেনকে দেখিয়ে নেবেন? উনি এখন দোতলার চেম্বারে আছেন।‘ আমি আপত্তি করলাম, ‘আরে না না। ডাক্তার দেখানোর মতো কিছু হয়নি। তুমি আমাকে কয়েকটা ক্যালপলই দাও।‘
– ‘না দাদা! আপনার শরীর খারাপ জেনেও ডাক্তারবাবুকে না দেখিয়ে ওষুধ দিয়েছি শুনলে জ্যাঠাইমা রাগ করবেন। আপনি আমার সাথে একবার দোতলায় আসুন।
“মাসিমা রাগ করবেন শুনে আর বাধা দিলাম না। দোতলায় ডাঃ সেনকে দেখিয়ে নিলাম। সেখানেও এক বিড়ম্বনা। বিকাশ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ডাঃ সেন ফি নিলেন না। দুটো ওষুধ দিলেন। দুদিনের বেশি জ্বর থাকলে রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিলেন।
ডাক্তারের চেম্বার থেকে সোজা আমার ঘরে চলে এলাম। মাসিমা চা পাঠিয়েছিলেন। চা খেয়ে বাইরের ছাদে আচ্ছাদনের নীচে বসলাম। হালকা হাওয়া বইছে। ভাল লাগছিল। মাথাধরাটাও একটু কমছে মনে হল। কিছুক্ষণ পরে একটু তন্দ্রামতো এসে গেল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
যখন উঠলাম ঘড়িতে তখন প্রায় রাত্রি দশটা। খাওয়ার জন্য নীচে নামতে হবে। মাসিমা অপেক্ষা করবেন। ঘরে ঢোকার মুখে হঠাৎ ডানদিকে চোখ গেল। লন্ঠনজাতীয় আলো নিয়ে কে বা কারা কবরস্থানে ঘোরাফেরা করছে।
“কবরস্থান? সে কি কেষ্টদা? আপনার অতুলদার বাড়িটা কি কবরস্থানে ছিল নাকি?” গল্পের মাঝে বিপিন আবার ফুট কাটল।
বাধা পেয়ে কেষ্টদা ক্ষেপে গেলেন। বললেন, “আ গেল যা! এ তো কিছুই বোঝেনা। বাড়িটা কবরস্থানে হতে যাবে কেন? কবরস্থানটা ছিল বাড়ির পিছন দিকে, কিছুটা তফাতে। তাছাড়া ওটা চালু কবরস্থানও ছিল না। অনেক পুরনো, এখন পরিত্যক্ত একটা কবরস্থান। ফুট চারেক উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বুঝলি হতভাগা।“
তারপরই হঠাৎ উদয়ের দিকে ফিরে বললেন, “হ্যাঁরে উদো! শুধু গল্প শুনলে হবে? চা খাওয়াতে হবে না?”
উদয় কোন কথা না বলে চায়ের সন্ধানে ভিতরে ঢুকল। কেষ্টদা বেগুনীর শূন্য থালাটার দিকে একবার দেখে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। তারপর আবার বলতে আরম্ভ করলেন, “হ্যাঁ! যা বলছিলাম। অসময়ে পরিত্যক্ত কবরস্থানে আলো হাতে লোকজন দেখে চোখটা আটকে গেল। দরজার উপরে যে আলোটা জ্বলছিল সেটা নিভিয়ে দিলাম। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম ঘটনাটা কি। এত রাত্রে ওখানে কারা? ওদের প্রয়োজনটাই বা কি? লোকগুলো কবরস্থানে কিছু খুঁজছে। দাঁড়িয়ে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। মাসিমার ডাক এল। নীচে নেমে যেতে হল
“খাওয়া–দাওয়া সেরে যখন উপরে এলাম, কবরস্থানে তখন শুধুই অন্ধকার। লোকগুলো চলে গেছে।
সন্ধ্যায় অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়েছি। তাই ঘুম আসছিল না। তাছাড়া, কবরস্থানের ব্যাপারটা তাড়া করে ফিরছিল। রাতের অন্ধকারে পরিত্যক্ত কবরস্থানে ওরা কি খুঁজছিল? যদি কিছু খু্ঁজছিলই তাহলে এত তাড়াতাড়ি চলেই বা গেল কেন? মন বলছিল ওরা হয়ত আবার আসবে। কেন মনে হচ্ছিল, জানিনা।
অনেকক্ষণ পরে, ঘুমটা তখন সবে আসছিল। কিন্তু বাধ সাধল কিছু লোকের ফিসফিসানি। খুব কাছে। বিছানা ছেড়ে অন্ধকারেই জানালার পর্দা অল্প ফাঁক করে দেখতে চেষ্টা করলাম। দেখলাম, নার্সিং হোমের পিছনের দরজাটা খোলা। লুঙ্গি পরা কয়েকজন লোক একটা মৃতদেহ বাইরে নিয়ে এসেছে। এরাই ফিসফিস করে কথা বলছে। এরা বেরনোর পরই একজন দরজাটা বাইরে থেকে ভেজিয়ে দিল। লোকটা পিছন ফিরতেই শিউরে উঠলাম। এ যে অতুলদা ! দেখামাত্র কান–মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। চোখ কিন্তু ওদের উপর থেকে সরেনি। লোকগুলো দেহটা নিয়ে কবরস্থানে ঢুকল। সেখানে আবার লন্ঠনের আলো। দুজন লোক মাটি খুঁড়ছে।
বিষয়টা পরিস্কার হয়ে গেল। ওরা আগে এসেছিল জায়গা খুঁজতে। এখন এই মৃতদেহ ওইখানে কবর দেওয়া হবে। কিন্তু কয়েকটা প্রশ্ন মাথার মধ্যে ধাঁধার মতো জট পাকাতে লাগল। যা ঘটছে তাতে যে একটা চরম গোপনীয়তা আছে, সেটা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কেন? লোকগুলো কারা? মৃতদেহটাই বা কার? সবচেয়ে আশ্চর্যের যেটা, এর মধ্যে অতুলদার ভুমিকা। কিন্তু এখানেও সেই একই প্রশ্ন – কেন? অতুলদা কি কোন দুষ্টচক্রের সাথে জড়িত? যদি তা–ই হয়, কি সেই চক্র
সারারাত ঘুম এল না। ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তাও গেল। গদাই চা এনেছে। বলল, ‘কি হল দাদাবাবু? আজকে এখনও ওঠেননি? শরীর খারাপ?’
” বললাম, ‘নারে গদাই। শরীর ঠিকই আছে। পড়াশোনা করছিলাম। শুতে রাত হয়েছে।‘
এদিকে পঞ্চাননও চা নিয়ে হাজির। কেষ্টদার সুবাদে আমরাও চা পেলাম। তবে কেষ্টদার জন্য সেই ‘স্পেশাল‘ চা। বড় কাঁচের গেলাস ভর্তি। তাতে তিন চামচ চিনি মেশানো, উপরে ভাসছে মোটা সর। সারাদিন এতবার চা প্রতিবার তিন চামচ করে চিনি। কেষ্টদা দিনে কতটা চিনি খায় কে জানে।
কেষ্টদা নিজের পেটেন্ট ভঙ্গিতে চায়ে গোটা তিনেক চুমুক দিয়ে বললেন, “কোথায় যেন ছিলাম? হ্যাঁ, গদাই এসেছিল।
সকালে জলখাবারের টেবিলে অতুলদাকে দেখলাম না। মাসিমা বললেন, ‘অতুল এখনও ওঠেনি। কাল রাত্রে একজন পেশেন্টের খুব বাড়াবাড়ি হয়েছিল। প্রায় সারারাত জাগতে হয়েছে।‘
কলেজে সেদিন দুটো ক্লাস ছিল। একটা সকালে, একটা শেষ পিরিয়ডে। মাঝে অনেকটা সময় ফাঁকা। নানারকম চিন্তা করেও ধাঁধার জট ছাড়াতে পারলাম না। বিকেলে ঘুরে কবরস্থানটার পাশ দিয়ে এলাম। নতুন কবরটা শুকনো ডালপালা এনে এমন করে ঢেকে দেওয়া হয়েছে যে একনজর দেখলে কারও সন্দেহ হবে না। একেবারে পাকা হাতের কাজ।
দোকানে সন্ধ্যেবেলাও অতুলদাকে দেখলাম না। বিকাশ বলল নার্সিং হোমে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ বসে কথাবার্তা বলে রাত আটটা নাগাদ ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। এখানে কোন সূত্র পেলাম না। বাইরে এসে দেখি, নার্সিং হোমের গেটে নার্সরা যাতায়াত করছে। এ সময় ওদের ডিউটি বদল হয়। রাত্রের নার্সদের মধ্যে নন্দিনীকে দেখলাম। কোন কথা অবশ্য হল না। হাসি বিনিময় হল মাত্র। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় মনে হঠাৎ একটা আলোর দিশা দেখতে পেলাম। নন্দিনী। রাতে ডিউটি। তার মানে, হয়ত কাল রাত্রে ছিল। নন্দিনী আমাদের কলেজের ইতিহাসের প্রধান অধ্যাপক অশ্বিনীবাবুর খুড়তুতো ভাই সাধন সরকারের মেয়ে। ওদের বাড়িও ফালাকাটাতেই। ভদ্রলোক সরকারি চাকরি করেন।
অশ্বিনীবাবু আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। মজা করে ‘ব্রাইট ইয়ং ম্যান‘ বলে ডাকেন। পরদিনই একটু ফাঁকায় পেয়ে ওঁকে বললাম, ‘অশ্বিনীবাবু, একটা উপকার করবেন?’
তোমার মতো ব্রাইট স্কলারের জন্য কি কাজ করতে পারি ভাই?’ অশ্বিনীবাবু হেসে জবাব দিলেন।
আমি বললাম, ‘এখানে ঠিক বিশদে বলা যাবে না। তবে আপনার এক ভাই সাধন সরকারের কথা বলেছিলেন না, যাঁর মেয়ে অতুলদার নার্সিং হোমে চাকরি করে, সেই মেয়েটির সাথে আলাপ করিয়ে দেবেন?’
অশ্বিনীবাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন, ‘সে কি হে? কোথায় তুমি কলেজের একজন নামকরা অধ্যাপক আর কোথায় সাধনের মেয়ে নন্দিনী। কি অবাস্তব কথা বলছ ভাই?’
‘আরে না দাদা! আপনি যা ভাবছেন, বিষয়টা একদমই তা নয়। একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি নার্সিং হোমটাকে ঘিরে। তারই জট ছাড়াতে নন্দিনীর একটু সাহায্য নেব ভাবছিলাম।‘
‘ও তাই বলো। কিন্তু ভাই, যে ডালে বাস করছ, তার গোড়া কাটতে যাওয়া কি খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে? তাছাড়া, নন্দিনী ওখানে আজ প্রায় বছর পাঁচেক চাকরি করছে। ও কি তোমাকে কোন সাহায্য করবে? আমি বলি কি, তোমার নিজের কোন ক্ষতি না হলে থাক না ওসব রহস্য–টহস্য। যেচে বিপদ ডেকে আনার কি খুব প্রয়োজন আছে?’
‘আসলে হয়েছে কি জানেন দাদা? চোখের সামনে এমন একটা ঘটনা দেখে ফেলেছি যে, তার পর থেকে মানসিক শান্তি তো গেছেই, তার উপর অস্থিরতা ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে। যে পরিবারে গত দু বছরেরও বেশী আছি, যাকে বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবার বলেই মনে হয়েছে, তার গায়ে কালির আঁচড় লাগছে দেখে খারাপ লাগছ। আবার অন্য দিক দিয়ে দেখলে, যদি ওঁরা বা অতুলদা সত্যিই কোন দুষ্টচক্রের সাথে যুক্ত থাকেন,তাহলে ওখানে থাকা তো আর আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তাই না?’
‘তুমি দেখছি খুব গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছ। বেশ, অনুসন্ধান করছ , করো। তবে এই বুড়ো মানুষের কথা যদি শোনো, তবে বলি, এর মধ্যে বাইরের আর পাঁচজনকে জড়িয়ে ফেলো না। এতে তোমার উদ্দেশ্য তো ভেস্তে যাবেই, উল্টে তুমি নিজেও বিপদে পড়ে যেতে পারো।’
অশ্বিনীবাবুর কথাগুলো ভাল লাগল। দেখলাম, আমি এতটা তলিয়ে ভাবিনি। অতএব প্রজেক্ট নন্দিনী বাতিল। অন্য উপায় ভাবতে হবে।
সেদিন বিকেলে ফেরার পথে আবার কবরস্থানের পাশ দিয়ে এলাম। বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়নি। শুধু শুকনো ডালপালাগুলো আরও শুকিয়েছে। ফলে, কবরটা আগের থেকে বেশী অনাবৃত হয়ে আছে। একটু দাঁড়িয়ে চলে আসছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ ডাকল, ‘এই যে মাস্টারবাবু, শোনেন।‘
পিছন ফিরে দেখি, চেক লুঙ্গি ও হাতাওয়ালা ময়লা গেঞ্জি পরা একটা লোক, খানিকটা ষন্ডামার্কা, আমাকে ডাকছে। থামতে হল। আমি কিছু বলার আগে লোকটাই বলল, ‘আমারে চেনেন?’
বললাম, ‘না, কে আপনি?’
‘সে কি মশায়? তামাম মুলুক আমারে চেনে আর আপনি বলছেন না? রহিম সেখের নাম শুনেছেন? আমিই সেই লোক।‘
নামটা শোনামাত্র শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। রহিম সেখ – দুর্দ্ধর্ষ সমাজবিরোধী। ছিনতাই থেকে খুন পর্যন্ত, অজস্র অপরাধমুলক কাজের জন্য যাকে প্রায় সব মানুষই যমের মতো ভয় পায়।
রহিম আবার বলল, ‘আপনি এই গোরস্থানটার কাছে রোজ ঘুরঘুর করেন কেন বলুন তো?’
‘না মানে কোন কারণ নেই। এই পুরনো কবরস্থানটা ভাল লাগে। তাই কোন কোনদিন ফেরার পথে একটু ঘুরে যাই ‘, আমি আমতা আমতা করে জবাব দিলাম।
‘বাজে কথা ছাড়েন তো। মোসলমানের একটা গোরস্থান, তাও আবার আদ্যিকালের পুরনো। হিঁদু হয়ে সেটাকে ভাল লাগে। বললে কেউ বিশ্বেস করবে? আসল মতলবটা কি বলেন তো?’ রহিমের কর্কশ প্রত্যুত্তর।
‘না! সত্যিই কোন মতলব নেই। অন্য কোন সময় আসি না। শুধু ফেরার পথে কোন কোনদিন আসি।‘
‘ কাল থেকে আর আসবেন না। মনে থাকে যেন। রহিম সেখের কথা না শুনলে জবাই করে এখানে গোর দিয়ে দেব।‘
কথাটা বলার সময় গেঞ্জি ফাঁক করে ইঙ্গিতে যা দেখাল সেটা মাংস কাটার একটা বড় ছুরি। আমি আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পায়ে চলে এলাম। নার্সিং হোমে বা দোকানে না ঢুকে সোজা আমার ঘরে। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে ওখানে কাউকেই দেখতে পেলাম না। একটা বলয় আমাকে ক্রমশঃ গ্রাস করে ফেলতে লাগল। আমি কি কারও নজরে পড়ে গেলাম?” গদাই চা নিয়ে হাজির। বলল, ‘বাইরে চা দেব?
বললাম, ‘না! ভিতরেই দে। একটু কাজ আছে। এখন বাইরে বসা যাবে না।’
প্রকৃত ঘটনা হল, বাইরে বসার মতো মনের সাহসটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। ছাদ থেকে কবরস্থানটা দেখা যায়। ওখান থেকেও সহজেই কেউ আমাকে নজরে রাখতে পারে।রাত্রে ঘুম হল না। সকালে উঠে ভাল করে স্নান করলাম। ভয় পাওয়া ভাবটা মোটামুটি কেটেছে বলে মনে হল। কলেজে অশ্বিনীবাবুকে গত দিনের অভিজ্ঞতাটা জানালাম। অশ্বিনীবাবুর প্রাজ্ঞ প্রতিক্রিয়া, ‘তুমি বিপদে পড়তে পারো এটা আমার মনে হয়েছিল। কিন্তু সে বিপদ যে এত তাড়াতাড়ি আসবে ভাবিনি। দ্বিতীয়তঃ, এর মাধ্যমে একটা বিষয় কিন্তু পরিস্কার হয়ে গেল, তোমার সন্দেহ অমূলক নয়।’
‘দাদা, আমি কি পুলিশে জানাব?’‘না ভাই! ওটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। পুলিশ হয়ত কেসটা নেবে। কিন্তু তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা ওরা করতে পারবে না। তাছাড়া, তোমার নাম পুলিশের খাতা থেকে জানাজানি হয়ে যাবেই।‘অশ্বিনীবাবু অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি ও আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। ওঁর কথা অমান্য করার কোন প্রশ্নই ছিল না। অতএব আমাকে আবার ভাবনার সাগরে ডুব দিতে হল।
এমনি করেই পেরিয়ে গেল আরও দশ–বারো দিন। আমি এখনও অথৈ জলে। এর মধ্যে গত পাঁচদিন অশ্বিনীবাবু অসুস্থ হয়ে বাড়িতে শয্যাশায়ী। আমি একদিন দেখে এসেছি। সুস্থ হয়ে কাজে আসতে আরও দিন দশেক লাগতে পারে
চিন্তা করতে করতে পড়াশোনারও ক্ষতি হচ্ছে। কলেজে পড়াতে গেলে নিজেও প্রচুর পড়তে হয়। অথচ, আমি গত কয়েকদিন যাবৎ এমন একটা জটিল বিষয়ে জড়িয়ে পড়েছি যে, পড়াশোনা মাথায় উঠেছে। এক একবার ভাবছি আমার দ্বারা এই জটিল ধাঁধার সমাধান সম্ভব নয়। আবার ভাবছি, দেখেও ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হবে?
এর মধ্যেই একদিন কলেজের একটি ছেলে এসে খবর দিল,’অশ্বিনীবাবু ডেকেছেন |’
বিকেলে গিয়ে দেখি সেই ছেলেটিও রয়েছে। অশ্বিনীবাবুর ইঙ্গিতে সে–ই কথা বলল, ‘স্যার, আমার নাম আকাশ মন্ডল। হিস্ট্রি অনার্স, থার্ড ইয়ার। আমার বাবা বেঙ্গল পুলিশের ডি আই জি। এখন মালদাতে পোস্টেড। আপনি অনুমতি দিলে আমার বাবার সাথে কথা বলাতে পারি। আপনার হয়ত কোন সাহায্য হবে।‘
আমি এরকম প্রস্তাবের জন্য তৈরী ছিলাম না। খানিকটা অবাক হয়েই অশ্বিনীবাবুর দিকে তাকালাম। অশ্বিনীবাবু বললেন, ‘কোন কাজ তো নেই। সারাদিন শুয়ে থাকা আর নানা চিন্তা করা। কালকে হঠাৎ আকাশের কথা মনে পড়ল। ওর বাবা আমার খুব ভাল বন্ধু। ওরা কাছেই থাকে, এ পাড়াতেই। ভাবলাম, তোমার সমস্যার কথা ওর বাবাকে বললে হয়ত কিছু পরামর্শ দিতে পারবেন। তাই তোমাদের একসাথে ডেকেছি।‘‘আপনি অসুস্থ অবস্থাতেও আমার কথা ভাবছেন অশ্বিনীদা? কিন্তু একটা খটকা আছে। অতদূর মালদা থেকে কোন কিছু করা ওঁর পক্ষে আদৌ সম্ভব হবে?’
এবার উত্তর দিল আকাশ, ‘ও নিয়ে ভাববেন না স্যার। বাবা এর আগে আলিপুরদুয়ারেই ছিলেন। মাত্র এক বছর আগে মালদা গেছেন। এখানে বাবার ভাল জানাশোনাও আছে।‘
‘বেশ! অশ্বিনীদা যখন বলছেন তখন আমি নিশ্চয় কথা বলব। কিন্তু কিভাবে? তোমার বাবা কি এখন বাড়িতে এসেছেন
‘না স্যার! ফোনে কথা বলাব আমাদের বাড়ি থেকে। আপনি আমার সঙ্গে চলুন।‘চা এসে গিয়েছিল। চা পর্ব শেষ করে অশ্বিনীদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পশ্চিমে চারটে বাড়ি ছেড়ে আকাশদের বাড়িতে ঢুকলাম। প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো লাল ইটের বাড়ি। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের গুণে এখনও ঝকঝকে উজ্জ্বল।
ওদের কি ব্যবস্থা আছে জানিনা। একবারেই যোগাযোগ করা গেল। প্রথমে আকাশ ভূমিকা করার পর, আমি সবিস্তারে ঘটনা দুটো বললাম। ওর বাবা একটু ধীরে বলতে বললেন। মনে হয় ঘটনাগুলো লিখে নিলেন। শেষে আশ্বস্ত করলেন, ‘আপনার কোন বিপদ হবে না মাস্টারমশায়। আপনার অভিযোগ আমি সঠিক জায়গায় জানাচ্ছি। ওখান থেকে একজন বা দুজন আপনার সাথে দেখা করবে। ওদের সাহায্য করবেন। আশা করি আপনার কাজ হয়ে যাবে।‘
কেষ্টদা থামলেন। এক গেলাস জল চেয়ে নিয়ে পুরোটা খেলেন। তারপর বললেন, “আমার গল্প শেষ। কেন না আমার গোয়েন্দাগিরিও শেষ।“
‘বাকিটা কেন বাকি রাখছেন দাদা?’ বিপিনের আকুল প্রার্থনা।
কেষ্টদা হেসে বললেন, ‘এরপর আর বিশেষ কিছু নেই। দ্বিতীয়দিনই আকাশ ওর স্কুটারে চাপিয়ে আবার ওদের বাড়ি নিয়ে গেল। সেখানে দুজন পুলিশ অফিসার আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ওঁরা আমার বয়ান নিলেন। আমাকে সই করালেন। বললেন, ‘আমরা নজর রাখবো। তবু একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন। নতুন কেউ আলাপ করতে এলে সাবধান হবেন। আর এখন কদিন কবরস্থানের দিকটা এড়িয়ে চলবেন। কেমন?’
আমি সম্মতি জানালাম। দিন সাতেকের মধ্যেই কয়েকটা ধর–পাকড় হল। একটা দুর্দ্ধর্ষ ডাকাতের দল। ফালাকাটার বাইরে কোথাও পুলিশের সাথে গুলির যুদ্ধ হয়েছিল। ওদের যে সর্দার, সে গুলিতে আহত হয়েও দল নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়। পরে গোপনে অতুলদার নার্সিং হোমে আসে। বেশ মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রফা হয়। তবে সর্দারকে বাঁচানো যায়নি। গুলিটা অনেকক্ষণ শরীরে থাকার ফলে পচন ধরেছিল। তার থেকে গ্যাংগ্রিন ও মাল্টি অরগ্যান ফেলিওর হয়। পুলিশ পরে কবর খুঁড়ে মৃতদেহ বার করে।
প্রথম অবস্থায় আমার উপর কারও সন্দেহ হয়নি। পুলিশ থেকেও আমার নাম প্রকাশ করা হয়নি। আমি অবশ্য অতটা নিশ্চিন্তে থাকতে পারিনি। কারণ, সবাইকে ধরা গেলেও রহিম সেখকে ধরা যায়নি।অথচ, এটা জানা গিয়েছিল যে, সর্দারকে এখানে কবর দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে রূপায়ণ পর্যন্ত সবটাই করেছিল ওই রহিম। ওর মতো লোক বাইরে থাকলে আমার বিপদ ষোল আনা। তাই চেষ্টা–চরিত্র করে রানীগঞ্জের একটা কলেজে কাজ জুটিয়ে নিয়েছিলাম।
রহিমকে ধরা জরুরী হয়ে পড়েছিল। অথচ, রহিম যে কোথায় লুকিয়ে আছে সে খবর কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না।
এ অবস্থায়, ফালাকাটা ছেড়ে চলে আসার ঠিক আগের দিন সব গুছিয়ে নিয়ে রাত্রি আটটা নাগাদ ছাদে এলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল, কবরস্থানের ডানদিকে, যেখানে নার্সিং হোমের একটা স্টোররুম আছে, সেখানে লন্ঠন হাতে কেউ ঘোরাফেরা করছে। একটু পরেই সেই লন্ঠনের আলো স্টোরের পিছনদিকে হারিয়ে গেল।
কিন্তু ওখানে তো কোন ঘর–বাড়ি নেই। তাহলে লোকটা গেল কোথায়? এরকম আকাশ–পাতাল যখন ভাবছি, তখন, মানে প্রায় মিনিট দশেক পরে সেই আলোটা আবার দেখলাম। এবার লোকটা স্টোররুমের পিছনের দরজায় দাঁড়াল। দরজার কব্জাটা খোলার জন্য নীচু হতেই লন্ঠনের আলোয় চিনতে পারলাম – রহিম সেখ।
তৎক্ষণাৎ, গায়ে একটা জামা গলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এ সুযোগ ছাড়া ঠিক হবে না। মাসিমাকে ‘একটু আসছি‘ বলে সোজা থানায়।
আধ ঘন্টার অপারেশনে রহিম ধরা পড়ল। কিন্তু এই শেষ কাজটাতে কিছুটা হইচই গোপন করা গেল না। সবার কাছে আমার ভূমিকা প্রকাশ হয়ে পড়ল। আমি আর নিজের বাসায় ফিরতে পারলাম না। আমাকে পুলিশের গেষ্ট হাউসে রাখা হল। ওদের লোক গিয়ে আগে থেকে গোছানো মালপত্র নিয়ে এল।
আমি পরদিন ওখান থেকেই সোজা ট্রেনে ফালাকাটা ছেড়ে রওনা হয়ে গেলাম।“
কেষ্টদা থামলেন। সবার মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, “অনেক রাত হয়েছে। নয়ত আরেকবার চা হলে মন্দ হতো না।”
——————————————-
![]()
লেখক পরিচিতি (চন্দ্রকান্তি দত্ত):
ভারতীয় জীবন বীমা নিগমের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। জন্ম মহারাষ্ট্র রাজ্যের পুনা শহরে ১৯৫৯ সালে। স্কুল শিক্ষার শুরুটা পুরুলিয়ায় হলেও, প্রায় পুরোটাই হয়েছে দুর্গাপুরে। উচ্চ শিক্ষাও সেখানেই। নিজেকে লেখক না বলে গল্পকার বলতেই বেশী ভালবাসেন। লেখার শুরু গত শতকের নয়ের দশকের শেষ দিকে,তাও একজন সিনিয়র সহকর্মীর উৎসাহ ও চাপে। সেই থেকে টুকটাক লিখলেও,শারীরিক অসুস্হতার কারণে লেখাতে ছেদ পড়েছে অনেকবার। এখন,চাকরী থেকে অবসরের পরে,প্রায় নিয়মিত লেখেন। গল্প ছাড়াও কয়েকটি কবিতাও লিখেছেন-বাংলা ও হিন্দিতে।
