
পরমার ঘরে ফেরা
মহাশ্বেতা ব্যানার্জী
পরমা মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তাঁদের আদর-যত্নে হেসে-খেলে বড় হয়ে উঠেছিল। স্কুল ও কলেজের গণ্ডি পেরোতেই একটি শিক্ষিত, ভালো চাকুরে পাত্রের সাথে পরমার বিয়ে হয়ে গেল।
বিয়ের পর অন্যান্য মেয়েদের মতো পরমাও নিখিলের সাথে শ্বশুরবাড়ি গেল। নিখিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, তাই সেখানে সে পরম আদরিণী বউ হয়ে উঠল। নিখিল একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করত। সকালবেলা রান্নাঘরে গিয়ে নিখিলের মা ছেলের জন্য প্রাতরাশ, টিফিন সব বানিয়ে দিতেন। নিখিল ন’টার মধ্যে অফিস বেরিয়ে যেত। পরমা ঘুম থেকে উঠে দেখত, নিখিল অফিসে চলে গেছে। শাশুড়ি মা কখনও পরমাকে ডাকতেন না বা কোনো কাজ করতে বলতেন না।
পরমাও যথারীতি বেলা করে উঠে খেয়ে-দেয়ে অপেক্ষা করত নিখিলের জন্য। এভাবে কয়েকদিন কাটাবার পর পরমার মনে হতে লাগল, যদিও শ্বশুরবাড়িতে সে খুব আরামে আছে, কিন্তু বাপের বাড়িতে যেমন যখন-তখন বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যেতে পারত, সেগুলো কিছুতেই সম্ভব হয় না। কাউকে বলতেও পারে না, কেমন যেন বন্দী জীবন মনে হয় তার।
এভাবেই তার দিন কাটছিল। একদিন হঠাৎ নিখিল জানাল, সে চারদিনের জন্য ট্যুরে যাবে, তাই পরমার ইচ্ছে হলে ওই সময় বাপের বাড়ি ঘুরে আসতে পারে। পরমাও তাই খুশি মনে বাপের বাড়ি চলে গেল।
বাপের বাড়ি এসে পরমা আগের স্বাধীনতা ফিরে পেল। যখন-তখন ঘুম থেকে ওঠা, ইচ্ছেমতো রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়া, হৈ-হৈ করে বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যাওয়া — সব। চারদিন পর যখন নিখিল ট্যুর থেকে ফিরে এল, পরমা মাকে জানাল যে ও আর শ্বশুরবাড়িতে ফিরবে না, বাপের বাড়িতেই থাকবে। শ্বশুরবাড়ি থাকতে ওর একদম ভালো লাগে না।
মা একথা শুনে বললেন, “ঠিক আছে, তুই এখানেই থাক। কিন্তু তোর বিয়ে হয়ে গেছে, তুই এখানে একা থাকলে লোকে কী বলবে? তুই শ্বশুরবাড়ি ফিরে নিখিলকে বুঝিয়ে এখানেই নিয়ে আয়। এখান থেকেই নিখিল অফিস যাবে। এখানে দু’জনেই থাকবি।”
পরমা মহা-আনন্দে ফিরে এসে নিখিলের মা ও বাবাকে জানাল যে, নিখিলের অফিস ওর বাপের বাড়ি থেকে কাছে, তাই ওরা পরমাদের বাড়িতেই থাকবে। নিখিলের মা ও বাবা কোনো বিরোধিতা করলেন না। পরমা একটু অবাক হলেও ভগবানকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিখিলকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল।
বাপের বাড়ি এসে কয়েকদিন পরমার খুব ভালো লাগল। বাবা সকালে উঠে বাজার করে আনেন, মাও সকাল থেকে নিখিল ও পরমার পছন্দের রান্না করেন। নিখিল অফিস বেরিয়ে গেলে পরমাও ঘুম থেকে উঠে খাওয়া-দাওয়া সেরে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেরিয়ে যায় ও পরম স্বাধীনতা উপভোগ করে।
কিছুদিন এভাবে কাটার পর সে হঠাৎ লক্ষ্য করল, বাবা-মায়ের ভীষণ পরিশ্রম হচ্ছে। পরমা ভাবল, পরের দিন থেকে ওঁদের একটু সাহায্য করবে। পরের দিন সকালে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে মাকে সাহায্য করতে যেতেই মা খুশি না হয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, “আমাদের বাড়িতে তোর কাজ করার কোনো দরকার নেই, তুই তোর বাড়িতে গিয়ে কাজ কর গে যা।”
পরমার চোখে জল এসে গেল। ওর বোধগম্য হল যে, নিখিলের বাড়িটাই এখন ওর নিজের বাড়ি।
নিখিল অফিস থেকে ফিরে এলে ও নিখিলকে জানাল, আর সে বাপের বাড়িতে থাকবে না। পরের দিন নিখিলের সাথে বাড়ি ফিরে আসার সময় দেখল, মা ও বাবার মুখে পরম তৃপ্তির হাসি।
শ্বশুরবাড়ি ফেরার পর নিখিলের মা ও বাবা সাদর অভ্যর্থনা করে পরমা ও নিখিলকে ঘরে তুললেন। এরপর দিন কেটে যেতে লাগল। পরমা আর কখনও বাপের বাড়িতে বসবাস করার কথা ভাবতে পারেনি। যথাসময়ে পরমা এক ফুটফুটে মেয়ের মা হল, সেও ঠাকুমা ও ঠাকুরদাদার পরম আদরিণী নাতনি হয়ে উঠল। পরমাও বাড়ির সবার সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে সুগৃহিণী হয়ে উঠল।
কয়েক বছর পর শ্বশুরমশাই গত হলেন। এক বছরের মধ্যে শাশুড়িও শয্যা নিলেন। পরমা মনপ্রাণ দিয়ে শাশুড়ির সেবা-যত্ন করত। একদিন উনি পরমাকে ডেকে বললেন, ওঁর আলমারিতে একটি বাক্স আছে, সেখানে উনি নাতনির জন্য গয়না রেখেছেন, সেটা যেন ওর বিয়ের সময় পরমা ওকে দিয়ে দেয়। এরপর শাশুড়িও মারা গেলেন। বাড়িটা তখন খুব খালি লাগত পরমার। সবসময়ই ওঁদের কথা মনে করে চোখের জল ফেলত আর ভাবত, কী করে ওঁদের ছেড়ে বাপের বাড়িতে থাকবার কথা ভেবেছিল সে!
এদিকে পরমার মেয়েও বিবাহযোগ্যা হলে তার জন্য পাত্র খোঁজা শুরু হলো। ভালো ছেলের সন্ধান পাওয়া গেল এবং বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল। মেয়ের বিয়ের জোগাড় করতে গিয়ে পরমার শাশুড়ির নাতনিকে দেওয়া গয়নার কথা মনে পড়ে গেল। শাশুড়ির আলমারি খুলতেই একটি কাঠের বাক্স চোখে পড়ল, সেটি খুলতেই দেখল, একটি খামে ভরা চিঠি ও একটি সীতাহার। খুব আগ্রহ নিয়ে চিঠিটা পরমা খুলল। দেখল, চিঠিটা পরমার মা লিখেছেন ওর শাশুড়িকে। চিঠিটা এইরকম —
> শ্রদ্ধেয়া বেয়ানঠাকুরানি,
> আশা করি ভালো আছেন। আপনি কোনও চিন্তা করবেন না, আপনার ছেলে ও বউমা এখানে খুব ভালো আছে। কয়েকদিনের মধ্যেই আপনার কাছে দু’জনেই ফিরে যাবে। এমন শিক্ষা আমার মেয়েকে দেব, যে কখনও ও শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি এসে বরাবরের মতো থাকতে চাইবে না। আমার প্রণাম নেবেন।
ইতি —
মালতী।
চিঠিটা পড়ে মায়ের প্রতি ওর মন কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল। মনে পড়ে গেল, যখন ও নিখিলকে নিয়ে বাপের বাড়ি থেকে চলে আসছে, তখন বাবা ও মায়ের মুখে সেই তৃপ্তির হাসির কথা।
পরমা ঠিক করল, সেও মেয়েকে এভাবেই শিক্ষা দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবে, যাতে ও প্রথম থেকেই শ্বশুরবাড়িকে নিজের বাড়ি মনে করে সুখে সংসার করতে পারে।
————————————————————

মহাশ্বেতা ব্যানার্জী – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ভৌত বিজ্ঞানে) স্নাতক ও বি.এড ডিগ্রী থাকলেও বাংলা সাহিত্যের প্রতি অদম্য আগ্রহ। শৈশব থেকেই স্কুলে ও কলেজের ম্যাগাজিনে কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তী জীবনে কিউ ম্যাথ শিক্ষিকা হলেও স্থানীয় ম্যাগাজিনে অনেক বাঙলা কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে । প্রিয় বিষয়-বন্ধুত্ব ও বাঁচার উৎস-প্রকৃত মানুষ ।
