Shadow

বন্ধু – পূর্ণব্রত ভট্টাচার্য্য

PC facebook
বন্ধু
পূর্ণব্রত ভট্টাচার্য্য

 

অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলেন অমরেশবাবু। বেরিয়েই তিনি বাড়ির সংলগ্ন বাগানের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন। সারাটা বাগান জুড়ে নানা রকমের ফুলের বাহার, যেন সেই বাগানের সৌন্দর্যকে আরও একশো গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

অমরেশবাবু হাঁক দিয়ে ডাকলেন, “হারাধন, একবার এদিকে আয় তো।” কিছু দূরেই বাগানে কাজ করছিল হারাধন। হারাধন ছিল এই বাগানের দায়িত্বে থাকা মালি।

অমরেশবাবুর ডাক শুনে হারাধন তো এলই, কিন্তু তার পেছনে পেছনে এল একটি সাত-আট বছরের ছেলে। আজই অমরেশবাবু প্রথমবার দেখলেন এই ছেলেটিকে। ছেলেটির পরনে আধময়লা কাপড়, হাতে গুলতি, আর সারা শরীরে অযত্ন ও অবহেলার ছাপ স্পষ্ট।

অমরেশবাবু উৎফুল্ল মনে হারাধনকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন বাগানে এত সুন্দর ফুল ফোটানোর জন্য তারিফ করবেন বলে। কিন্তু তার সাথে এই ছোট ছেলেটিকে দেখে ভুরু কুঁচকে যায় অমরেশবাবুর। সেই ছোট্ট ছেলেটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল অমরেশবাবুর দিকে। অমরেশবাবু তাতে একটু অস্বস্তি বোধ করেন।

তারপর একটু কঠিন স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দেন হারাধনের দিকে—

“এই ছেলেটি কে, হারাধন?”

উত্তরে হারাধন একটু ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বলে ওঠে, “এ আমার বোনের ছেলে, বাবু। এর নাম হল হারান। বাপ-মা হারা ছেলে, বাবু, তাই আমার কাছেই নিয়ে এলাম।”

এই কথা শুনে অমরেশবাবু সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবলেন। তারপর আর কোনো কথা না বলে গাড়িতে উঠে চলে গেলেন অফিসের উদ্দেশে।

আর হারান সেইভাবেই তাকিয়ে থাকল দূরে চলে যেতে থাকা গাড়ির ধুলো-ওড়া পথের পানে।

অমরেশবাবু অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই বাড়ির দরজার পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে আরও একটি ছোট ছেলের মুখ। এই ছেলেটির বয়সও ছিল হারানের মতোই। দরজার আড়াল থেকেই এই ছেলেটি হারানের দিকে তাকিয়ে অকৃত্রিম বন্ধুভাবাপন্ন আহ্বানে হেসে উঠল।

আসলে এই ছেলেটি হল অমরেশবাবুর একমাত্র ছেলে। নাম তার অরিন্দম।

অমরেশবাবু এই দিন সাতেক হল বদলি হয়ে এসেছেন শিলিগুড়ি সাবডিভিশনের বড় কর্তা হয়ে। দুই বছর হল ওনার স্ত্রী মারা গেছেন। এখন এই ছেলেই হল ওনার জীবনের সবকিছু। তাই মাত্রাধিক খেয়াল তিনি রাখেন অরিন্দমের ওপর। অফিসে গিয়েও তিনি চিন্তিত থাকতেন অরিন্দমের জন্য।

এদিকে সদ্য শিলিগুড়িতে আসা অরিন্দমের মন সবসময় খারাপ থাকত। কলকাতায় তার বন্ধু-বান্ধব, চেনা জায়গা সব ছেড়ে এখানে এসে বড়ই একা একা লাগত তার। তাই আজ তারই বয়সের একটি সঙ্গীকে পেয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে চায় অরিন্দম।

শিশুমন হয় সরল, তাই অরিন্দম হারানের নোংরা জামা দেখেনি, দেখেনি তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত অবহেলার ছবি। সে দেখেছে একজন খেলার সাথীকে, একজন ‘বন্ধু’কে।

অনেকদিন পর অরিন্দমের মুখে হাসির জোয়ার ফুটে ওঠে হারানের বন্ধুত্বের পরশ পেয়ে। সারাটা দিন অরিন্দম ও হারান দু’জন মিলে হাসি-মজা করে খেলে কাটাতে থাকল।

বিকেলে যখন অমরেশবাবু বাড়ি ফিরলেন, তিনি এসে দেখলেন যে বাগানের মধ্যে একটা বড় শিমুল গাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অরিন্দম ও হারান একসাথে। দু’জনেই মনের আনন্দে খুব হাসছে, আর অরিন্দমের হাতে ধরা আছে একটা গুলতি। আর হারান সেই গুলতি কীভাবে চালাতে হয়, সেটাই শেখাচ্ছে অরিন্দমকে।

এই দৃশ্য দেখে অমরেশবাবু বেশ গম্ভীর গলায় চেঁচিয়ে ওঠেন অরিন্দমের নাম ধরে—

“অরিন্দম…”

সেই ডাক শুনে অরিন্দম ও হারান দু’জনেই এক পলকে চমকে ওঠে। হারাধনও ছুটে আসে তার বাবুর এমন গম্ভীর গলার ডাক শুনে। অমরেশবাবু বেশ কড়া ভাবে অরিন্দমকে বলেন, “আমি তোমাকে বাড়ি থেকে বেরোতে বারণ করেছিলাম না? তাহলে তুমি কেন বেরিয়েছ?” তারপর অমরেশবাবু হারানের দিকে তাকান। অমরেশবাবুর সেই রুদ্রমূর্তি দেখে হারান দৌড়ে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে হারাধনের পেছনে। অমরেশবাবু অরিন্দমকে বলেন, “এখনই ঘরের ভেতরে যাও তুমি।”

তারপর হারানের দিকে এক ঝলক দেখে হারাধনকে উদ্দেশ করে অমরেশবাবু বলেন, “সন্ধ্যাবেলায় এসে দেখা করো, হারাধন।”

এই কথা বলে কোনো দিকে না তাকিয়ে ঘরের দিকে চলে যান অমরেশবাবু।

সন্ধ্যাবেলা হারাধন দেখা করতে এলে অমরেশবাবু তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, কাল থেকে যেন হারান আর না আসে হারাধনের সাথে এই বাড়িতে। কারণ অরিন্দম ওনার একমাত্র ছেলে, তাই উনি চান না যে হারানের সাথে মিশে অরিন্দমের স্বভাবের ও চরিত্রের কোনোরকম পরিবর্তন হোক।

হারাধন চলে গেলে অমরেশবাবু অরিন্দমকে কাছে ডেকে বুঝিয়ে বলেন, গ্রামের ছেলেরা ভালো হয় না, তাদের স্বভাব আদব-কায়দা শহরের ছেলেদের থেকে পুরোপুরি আলাদা হয়। তাই তোমার সাথে হারানের মেলামেশা করা উচিত না। অরিন্দম বলে, “এখানে আমার কোনো বন্ধু নেই, বাবা, আমার খুব মন খারাপ করে।” এই কথা শুনে অমরেশবাবু বলেন যে, কিছুদিনের মধ্যেই তিনি এখানকার সবচেয়ে ভালো স্কুলে অরিন্দমকে ভর্তি করে দেবেন। তখন আর অরিন্দমের বন্ধুর কোনো অভাব থাকবে না। এই বলে অমরেশবাবু অরিন্দমকে ভোলানোর চেষ্টা করেন। আর ভালো করে অরিন্দমকে বারণ করে দেন, যেন সে আর হারানের সাথে মেলামেশা না করে।

সে অমরেশবাবু যাই বলুন না কেন, ছেলেমানুষদের বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো ঘোরপ্যাঁচ থাকে না। বড়দের মতো এত ভালো-মন্দ যুক্তি-তর্ক তারা বোঝে না। একদিনের দেখাতেই হারানের সাথে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল অরিন্দমের। অরিন্দমকে হারান কথা দিয়েছিল যে সে রোজ এসে অরিন্দমের সাথে খেলা করবে।

পরের দিন সকাল থেকে অরিন্দম উদগ্রীব হয়ে থাকে হারাধন কাকার আসার প্রতীক্ষায়। কারণ তার সাথেই আসবে হারান। কিন্তু আজ হারাধন কাকা এলেও, হারান কিন্তু এল না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল অরিন্দমের। অমরেশবাবু ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অরিন্দমকে বললেন, “কী হয়েছে, বাইরে কী করছ তুমি? আমি তোমাকে বাইরে আসতে বারণ করেছি না?” এই কথা শুনে অরিন্দম মুখটা ছোট করে ঘরের ভেতর চলে যায়।

অমরেশবাবু অফিসে বেরিয়ে গেলে অরিন্দম হারাধন কাকার কাছে এসে জানতে চায় যে হারান আজ আসেনি কেন। হারাধন তাকে সত্যি কথাটা বলে না। বলে যে হারান ওর নিজের বাড়ি চলে গেছে। এই কথা শুনে মনটা আরও খারাপ হয়ে যায় অরিন্দমের। মনমরা হয়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে বসে পড়ে সে। কিছুক্ষণ পর ঘরের উত্তর দিকের জানালাতে একটা শব্দ হয়। অরিন্দম সেদিকে তাকিয়ে দেখে, ওই জানলার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে হারান। মুখে তার একমুখ হাসি। অরিন্দম তখনই দৌড়ে যায় জানালার কাছে।

হারানের হাত দুটো শক্ত করে ধরে অরিন্দম প্রশ্ন করে, “হারাধন কাকা যে বলল তুমি বাড়ি চলে গেছ? আমার কত মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল জানো? আমাকে কথা দাও, তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।”

এবার হারান অরিন্দমকে বলে সব কথা। যে অমরেশবাবু হারানকে এই বাড়িতে আসতে আর অরিন্দমের সাথে মিশতে বারণ করেছেন। তাই আজ হারান এভাবে লুকিয়ে এসেছে শুধু অরিন্দমের সাথে দেখা করার জন্য। কারণ অরিন্দমের সাথে দেখা না করে হারানেরও কষ্ট হচ্ছিল তারই মতো।

তারপর হারান অরিন্দমকে বলে যে রোজ সে এভাবেই এসে দেখা ও খেলা করে যাবে তার সাথে। তাহলে অমরেশবাবু কিছুই জানতে পারবেন না।

এরপর অরিন্দম বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে রোজ খেলা করত হারানের সাথে। আর অমরেশবাবু আসার আগেই চলে যেত হারান। খুব অল্পদিনের মধ্যেই হারান ও অরিন্দমের বন্ধুত্ব খুব গাঢ় হয়ে উঠেছিল।

এভাবেই চলতে থাকে সবকিছু।

কিন্তু একদিন অমরেশবাবু বিশেষ কিছু কারণে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসেন। আর এসে দেখেন যে হারান ও অরিন্দম সেই শিমুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে গুলতি ছোড়া খেলছে। অমরেশবাবু তো সেটা দেখেই রক্তচক্ষু নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যান এবং অরিন্দমকে ধমকের সাথে বলেন, “তোমাকে এত করে বলার পরেও তুমি আবার এই ছেলেটার সাথে খেলছ?”

বাবাকে দেখে ভয়ে অরিন্দমের হাত থেকে গুলতিটা মাটিতে পড়ে যায়। আর এক ছুটে সে সেই শিমুল গাছটার নিচে চলে যায়। অমরেশবাবু অরিন্দমকে ধরে আনার জন্য পা বাড়াতেই যাবেন, এমন সময় তিনি অরিন্দমের পেছনের দিকে শিমুল গাছটার দিকে চেয়ে দেখেই ভয়ে শক্ত কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। অমরেশবাবু দেখলেন যে গাছটার নিচে এখন দাঁড়িয়ে আছে অরিন্দম ঠিকই, আর ঠিক তার পেছনের ডালেই বড় ফণা তুলে বসে আছে একটা বিরাট খরিশ গোখরো সাপ। এই সাপের নাগপাশ থেকে কেউ জীবিত ফিরতে পারে না। সেই দৃশ্য দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যান অমরেশবাবু। সাপটির একদম নাগালের মধ্যে চলে গিয়েছিল অরিন্দম। সাপটিও অরিন্দমকে দেখে ভয়ভীত হয়ে ছোবল দেওয়ার উপক্রম করছে। সেই দেখে ভয়ে আতঙ্কে হাত দিয়ে মুখ চাপা দিতে যাচ্ছেন অমরেশবাবু, এই দৃশ্য তিনি দেখতে পারবেন না বলে। ঠিক সেই সময় বিদ্যুতের গতিতে মাটির ওপর পড়ে থাকা গুলতিখানা হাতে তুলে নেয় হারান। সাথে সাথে তার পকেট থেকে একটা পাথর বার করে গুলতিতে বসিয়ে নির্ভুল নিশানায় নিক্ষেপ করে দেয় সাপটার মাথা লক্ষ্য করে। পরক্ষণেই এত বড় সাপের মাথাটা গুলতির সেই পাথরের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে রক্ত-মাংস ছিটিয়ে পড়ে সেই গাছের গায়ে। আর সাপটা গাছ থেকে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। এতটা চকিতে ঘটে যায় এই পুরো ঘটনাটা, সেটা দেখে হতবাক হয়ে যান অমরেশবাবু। সাপটা মাটিতে পড়ে যেতেই হারান দৌড়ে গিয়ে অরিন্দমকে টেনে নিয়ে চলে আসে অমরেশবাবুর কাছে। তারপর হারান আর কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে চলে যেতে থাকে সেখান থেকে। এমন সময় অমরেশবাবু অরিন্দমের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন। অরিন্দমকে যে তিনি জীবিত দেখতে পাবেন, সেই আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন অমরেশবাবু। তারপর তিনি হারানের দিকে তাকিয়ে দৌড়ে গিয়ে সস্নেহে বুকে টেনে জড়িয়ে ধরেন তাকে। দু’চোখ দিয়ে ঝরনাধারার মতো জল প্লাবিত হতে থাকে অমরেশবাবুর। সেই দেখে অরিন্দমও ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে তাঁদের।

মনের মধ্যে যে ভুল ধারণাটা ছিল অমরেশবাবুর, সেটা ভেঙে যায় আজ এক পলকে।

তারপর হারাধনের সাথে কথা বলে বরাবরের মতো হারানকে তিনি রেখে দেন নিজের ও অরিন্দমের সাথে।

হারানও হয়ে ওঠে অমরেশবাবুর আরও এক ছেলে।

তার কিছুদিন পর থেকেই অরিন্দম ও হারান একসাথে স্কুল যেতে শুরু করে। দুই বন্ধুর বন্ধুত্ব থেকে যায় চিরদিনের জন্য।
—————————————————-

পূর্ণব্রত ভট্টাচার্য্য, নিবাস বৈদ্যবাটী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!