
অসমাপ্ত
রাজর্ষি দত্ত
শুদ্ধসেনের মনে হয় আজকাল সব ভুলে যাচ্ছে।
ভুলে যাওয়া মানে বাজারে মুগ আনতে মুসুর, রাস্তায় দেখা পরিচিত লোকের নাম, হিট গানের কম্পোজার – এসব সাধারণ ব্যাপার না। সেসবে ওর ভুল হয় না।
অথচ রোজকারের রুটিনমাফিক কাজ সিরিয়াসলি করার শেষে মনে হয় কি যেন একটা বাদ পড়ে গেল। হাজার ভেবেও তার কোন হদিস পায় না। সত্যিই যদি ভুল হয়, তবে দু-চার দিনের মধ্যে তো বোঝা যাবে। তেমন কিছু তো হয় না, তবু এই মনে হওয়াটাই ইদানিং খুব পীড়া দেয়।
আটচল্লিশ ছুঁই ছুঁই শুদ্ধসেনকে দেখলে আরও বছর দশেক বেশি মনে হয়। অনিয়মিত কামানো গালে খোঁচা খোঁচা সাদা বরফকুচির মত দাড়ি, ঢোলা পাজামা, ফেডেড টি-শার্ট আর অজন্তা চটি পড়ে সে ঘরের কাজ থেকে মাছ কেনা সবই করে। তারপর প্রাইমারি স্কুলে যায়।
যাবার আগে পর্ণার ওষুধগুলো সামনে রাখতে ভোলে না। পর্ণা, মানে শুদ্ধসেনের স্ত্রী, শুধু দুপুরের রান্নাটাই করে। আর সারাদিন শুয়ে, বসে আকাশ পাতাল ভাবে। বরং সেই বেশি ভুলোমনা। সেটা রান্না খেয়ে প্রত্যহ বোঝে শুদ্ধসেন। কিন্তু কিছু বলে না। বললে অগ্নিকাণ্ড বা ভারী বর্ষণ – যা কিছুই হতে পারে।
ক্লাসে পড়াতে পড়াতে ছাত্রদের থেকে বেশি অমনোযোগী হয়ে পড়ে শুদ্ধসেন। হঠাৎ করে মনে পড়ে কি যেন একটা জরুরী কাজ করা হয়নি। কিন্তু যথারীতি মনে পড়ে না। ও হতাশভাবে স্কুলমাঠের দিকে তাকায়। একদিকে ভাঙ্গা বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে গরু ঢুকে পড়ে ঘাস খাচ্ছে। সীমানার শিমুল গাছ থেকে তুলো খসে পড়ছে ঘাসের উপর। দূর থেকে মনে হয় যেন সবুজ গালিচায় তুষারপাত।
মাথা খুঁড়তে গিয়ে বরং অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে যায়। আশ্চর্য! দিব্যি মনে আছে এখনও। গ্রামের বাড়িতে চিতু পূজার কথা। লক্ষ্মীপূজায় সদর দরজায় আলপনার ডিজাইন – কাকিমা আঁকত সব সময়। স্কুল ফাইনাল মার্কশিটের প্রতিটি নম্বর। ঈদের নেমন্তনে মফিজুলদের বাড়িতে সামাইয়ের স্বাদ। এমনকি বনলতাদি…
বনলতাদি ওর বন্ধুর দিদি। চেহারায় লম্বা চওড়া…বেশ মদ্দা মদ্দা ভাব। কানে, নাকে অনেকগুলি দুল। ফোঁপানো চুল উঁচু করে বাঁধা। মোটা ভুরু, চোখে চড়া করে পরা কাজল। লিপস্টিক কচ্চিৎ লাগায়, মুখে প্রসাধনের চেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম লেগে থাকে। গানের গলাটা ভরাট , জলদ গম্ভীর গলায় গজল গাইত দুর্দান্ত।
কোন এক বৃষ্টির দিনে ওদের বাড়িতে বন্ধু বা অন্য কেউ ছিলনা। বনলতাদি সেদিন ওকে আচমকা তীব্রভাবে চুমু খেয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলেছিল – “কেমন লাগল?”
মাথার ভেতর তীব্র দপদপানির মধ্যে শুদ্ধসেনের গলা দিয়ে উত্তর বের হল – “বোরোলিনের গন্ধ”।
“কি?” ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বনলতাদি হো হো করে হেসে উঠেছিল। মোটা গলায় জানিয়েছিল নাকের দুল ঢোকানোর জায়গাটা পেকে গেছে, তাই বোরোলিন লাগানো।
কলেজে যখন নিজেকে কেউকেটা ভাবে তখন নির্মলা ঘেঁসে থাকতো সবসময়। একটা সমর্পণের ভাব ছিল। যদিও ওর অতিরিক্ত সাজুগুজু করাটা শুদ্ধসেন ভুরু কুঁচকে দেখত। প্রপোজাল নির্মলার দিক থেকে এসেছিল।
-“আমায় বিয়ে করতে চাস? কি দিবি আমায়?” শুদ্ধসেন প্রশ্ন করেছিল।
-“বাহ্, এটা কেমন কথা! সবাই যা দেয় – ভালোবাসা, যত্ন…” নির্মলা বলে।
-“আমার মতে মেয়েরা সেসব জিনিস যত্ন করে, যাদের প্রাণ নেই! যেমন চুল, নখ। কোন জীবন্ত মানুষ? উঁহু!”
নির্মলা আগুনঝরা দৃষ্টি হেনে উঠে চলে গেছিল। তাতে শুদ্ধসেনের খারাপ লাগেনি। বরং নিজের কথাটা মিলে যাওয়ায় আত্মপ্রশান্তি পেয়েছে। কিন্তু চোদ্দ বছরের সংসার জীবনে বুঝেছে, সেদিনের কথাটা পুরোটা ঠিক নয়। কিন্তু পর্ণা আজকাল কেমন যেন হয়ে গেছে।
আজ বিকেলে বাড়ি ফিরে দেখে পর্ণা অঝোরে কাঁদছে শব্দ করে। এমন প্রায়ই করে আজকাল। এ সময় একলা ঘরে সামলানোর কেউ থাকেনা। ঘরের মেঝে বই, খাতা, অন্য জিনিসে ছত্রাখান। শুদ্ধসেন জড়িয়ে ধরল পর্ণাকে – “এমন করে না, প্লিজ! শরীর আরও খারাপ করবে।”
চিরকালের শান্ত স্বভাবের পর্ণা আজ হিংস্র। ও দেয়ালের দিকে হাত বাড়ায়। শুদ্ধসেন আটকাতে গেলে বিষ্ণুপুরের টেরাকোটার নিদর্শন মেঝেতে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
-“ছিঃ, কি করছ! পাগল হয়ে গেলে নাকি?” শুদ্ধসেন জোর ধমক দেয়।
পর্ণা একদৃষ্টে তাকায়। ফিসফিস করে বলে “দেবে ওষুধ? যাতে একেবারে পাগল হয়ে যাই! উফ মাগো!”
শুদ্ধসেনের মনে পড়ে গতরাতে অ্যান্টিডিপ্রেশন ট্যাবলেটটা ঠিক খাওয়ানো হয়েছে। তবুও…”
দেয়ালে আটকানো ফটোটা বেঁচে গেছে। আজই সরিয়ে ফেলতে হবে। ডাক্তার আগেই বলেছিল। ফটোতে একটি এগারো বছরের বাচ্চা হাসছে এসব কাণ্ডকারখানা দেখে। ঘরেতে ছড়িয়ে তার স্কুলের ব্যাগ, বইপত্র, খেলনা, জামা কাপড়। এর প্রতিটি জিনিসের সাথে এগারো বছরের প্রতি মুহূর্ত জড়িত। তিল তিল করে গড়া সময় এক ঝটকায় এসে কেড়ে নিল ডেঙ্গু। চব্বিশ ঘন্টার ধ্যানজ্ঞান, স্বপ্ন যাকে ঘিরে, সে আজ অনেক দূরে। সবকিছু ফাঁকা হয়ে এখন অতলান্তিক শূন্যতা।
সেই শুরু! তখন থেকে রোজ শুদ্ধসেন ভাবতে থাকে কি যেন একটা কাজ বাকি রয়ে গেছে। করা হয়নি।।
———————————————–

রাজর্ষি দত্ত :
শিলিগুড়িতে জন্ম ও উত্তরবঙ্গের আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা। কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন চা-শিল্পের সাথে যুক্ত। পরিবেশ ও মানুষের প্রতি টান তার লেখার প্রেরণা। ভালবাসেন বই পড়তে,গান শুনতে,খেলাধূলা আর প্রকৃতির সান্নিধ্য।
