Shadow

গল্প হলেও সত্যি – অমরেন্দ্র কালাপাহাড়

PC Bongodorshon

গল্প হলেও সত্যি

অমরেন্দ্র কালাপাহাড়

 এটা যদি নিছক গল্প আকারে না বলা হতো তাহলে রৌদ্রের আজকে হসপিটালে সিস্টার দিদিমণি ও ডাক্তার কাকুদের তত্ত্বাবধানেই নামকাওয়াস্তে জন্মদিন পালন না হয়ে ধুমধামে সেন পরিবারের এক জমজমাট বার্থ ডে পার্টি হতে পারত।এক বছরের শিশুটি কি করে জানবে তার জীবনটা এমনি এক দমকা ঝড়ে  তছনছ হয়ে যাবে!সে হারিয়েছে কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে তার সবচেয়ে প্রিয় নিকটজন মা-বাবা দিদাকে ।হয়তো একেই বলে ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস!

চাকরি সূত্রে রাজা সেন এক মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার। ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারের জনসন এন্ড হাডসন কোম্পানির ডেপুটি ডাইরেক্টর।রাজা সেন বিধবা মায়ের পছন্দের প্রার্থী মৌ ওরফে মালাকে বিয়ে করে মাকে সঙ্গে নিয়ে এদেশের পত্রপাঠ চুকিয়ে দিয়েছিল। কারণ সাত কুলে বহু দূরের আত্মীয় স্বজন ছাড়া এদেশে তার আর কেউ ছিলনা। বেশ কাটছিল বিদেশ-বিভুঁইয়ে জীবন।

দিনরাত ভাড়া ঘরে বৌমা ও শাশুড়ির নানান কথকতা ও খুনসুটি। চাকরি শেষে সন্ধ্যায় রাজা পৌঁছলে নতুন করে জমে উঠত নানান শত গালগল্প।

মায়ের আব্দার বাড়িতে আসুক দ্রুত এক ফুটফুটে নাতি ।মৌ এর ইচ্ছে  তার ছেলে হোক ।তবে রাজার ইচ্ছে তাদের ঘর আলো করে আসুক এক ফুটফুটে কন্যা, ডানা কাটা পরি।

ভোটের পাল্লায় যেহেতু ছেলের দাবি ভারী তাই বোধ হয় ঈশ্বর সেই দিকেই  ঝুঁকে ছিলেন।

প্রসব বেদনা ওঠায় মাকে বাড়িতে রেখে  রাজা মৌ কে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল স্থানীয় হসপিটালে।বাইরে আরাম সোফায় বসে ঈশ্বরকে বারবার ডাকছিল ।ভালোয় ভালোয় যাতে প্রসবের ঝামেলা মিটে যায়।কিন্তু বিধি বাম। সুস্থ বাচ্চা প্রসব করলেও মৌ এর রক্তাল্পতায় শারীরিক অবনতি রাজাকে বিব্রত করে।বলা হয় A+ গ্রুপের রক্ত এই মুহূর্তে হসপিটালে নেই তাই বাহির থেকে দ্রুত আনতে বলা হয়।উদভ্রান্তের মতো দ্রুত ছুটে গাড়ি ধরতে গিয়ে রাজা সেনের দেহ বাসের পিছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে দলা পাকিয়ে যায়। পকেটে থাকা আইডেন্টি কার্ড ও মোবাইলে মায়ের নাম্বার দেখে পুলিশ মাকে দ্রুত ফোন করে।একমাত্র ছেলের অকাল মৃত্যুর খবর শোনা মাত্র তিনি মারাত্মক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বহুক্ষণ মায়ের কাছ থেকে আর সাড়া না পেয়ে পুলিশ ফোন ট্র্যাক করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মায়ের মৃত্যুর করুন পরিণতির খোঁজ পায়। পাশের ফ্ল্যাটের জনৈক মহিলার কাছ থেকে পুলিশ এ বাড়ির একমাত্র জীবিত বৌমার ডেলিভারির জন্য কোন এক হসপিটালে ভর্তি খবর জানতে পারে।অগত্যা পুলিশ পাশাপাশি কয়েকটি হসপিটালে খোঁজ করে রাজা সেনের বউ মৌ এর সন্ধান পান। খুবই পরিতাপের বিষয় A+গ্ৰূপের রক্তের অভাবে ইতিমধ্যে মৌ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।বিদেশ-বিভুঁইয়ে এবং তিন কালে কেউ না থাকায় বাচ্চাটি তাই নার্স ও ডাক্তারবাবুদের হেফাজতে বড় হতে থাকে। ইন্ডিয়ান বলেই সবাই আদর করে ওর নাম দেয় রৌদ্র। আজও চলছে এমনি করে হসপিটালে ডাক্তার নার্সদের কোলেপিঠে রৌদ্রের দিন গুজরান।

একদিন রৌদ্র অনেক বড় হয়ে জানতে পারবে তার জন্মের ইতিহাস ।ঘৃণায় আত্মশ্লাঘায় হয়তো নিজেকে শেষ করে দিতে  চাইবে। কারণ তার আগমনে এমনি করে হারিয়ে গেছে তার প্রিয় বাবা-মা ও দিদা। এ জীবনে হয়তো আর তার বাবা-মা দিদা ডাকটা হয়ে উঠলো না।

এখন রৌদ্র হাটি হাটি পায়ে ছুটে বেড়ায় রোগীদের এক বেড থেকে অন্য বেডে। সবাই তার সান্নিধ্য উপভোগ করে। রৌদ্রের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে ওকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় কারণ ইংল্যান্ডের আদালত শিশু পরিচর্চার ভার নেওয়ার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ইংল্যান্ডের একটি মানবিক সংগঠন এই দুর্ঘটনার জন্য ইংল্যান্ড সরকারকে এক প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে কেন হসপিটালে ওই গ্রুপের রক্ত ছিল না ।যদি না থাকে রোগীর আত্মীয়কে কেন তা আনতে বলা হল?পুলিশ কেন মৃত্যুর খবর সরাসরি ফোনে মাকে জানাল এবং যাত্রীকে ঠিকঠাক না তুলে কেন বাসটি দ্রুত বেরিয়ে গেছিল?হয়তো আগামী দিনে এই নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা হবে কিন্তু রৌদ্র কি ফিরে পাবে তার বাবা-মা দিদাকে কোনদিন?

——————////——————

এটা যদি নিছক গল্প আকারে না বলা হতো, তাহলে রৌদ্রের আজকে হাসপাতালে সিস্টার দিদিমণি ও ডাক্তার কাকুদের তত্ত্বাবধানে নামকাওয়াস্তে জন্মদিন পালন না হয়ে, ধুমধাম করে সেন পরিবারের এক জমজমাট বার্থ’ডে পার্টি হতে পারত। এক বছরের শিশুটি কী করে জানবে, তার জীবনটা এমনই এক দমকা ঝড়ে তছনছ হয়ে যাবে! সে হারিয়েছে কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে তার সবচেয়ে প্রিয় নিকটজন মা, বাবা ও দিদাকে। হয়তো একেই বলে নিষ্ঠুর ভাগ্যের পরিহাস!

চাকরি সূত্রে রাজা সেন এক মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার। ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারের জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানির ডেপুটি ডিরেক্টর। রাজা সেন বিধবা মায়ের পছন্দের প্রার্থী মৌ ওরফে মালাকে বিয়ে করে মাকে সঙ্গে নিয়ে এ দেশের পাট চুকিয়ে দিয়েছিল। কারণ সাত কুলে বহু দূরের আত্মীয়-স্বজন ছাড়া এ দেশে তার আর কেউ ছিল না। বেশ কাটছিল বিদেশ-বিভুঁইয়ে জীবন।

দিনরাত ভাড়া ঘরে বৌমা ও শাশুড়ির নানান কথকতা ও খুনসুটি। চাকরি শেষে সন্ধ্যায় রাজা পৌঁছলে নতুন করে জমে উঠত নানান শত গল্প।

মায়ের আবদার, বাড়িতে আসুক দ্রুত এক ফুটফুটে নাতি। মৌ-এর ইচ্ছে, তার ছেলে হোক। তবে রাজার ইচ্ছে, তাদের ঘর আলো করে আসুক এক ফুটফুটে কন্যা, ডানাকাটা পরী।

ভোটের পাল্লায় যেহেতু ছেলের পাল্লা ভারী, তাই বোধহয় ঈশ্বর সেই দিকেই ঝুঁকেছিলেন।

প্রসব-বেদনা ওঠায় মাকে বাড়িতে রেখে রাজা মৌ-কে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল স্থানীয় হাসপাতালে। বাইরে আরাম-চেয়ারে বসে ঈশ্বরকে বারবার ডাকছিল, যাতে ভালোয় ভালোয় প্রসবের ঝামেলা মিটে যায়। কিন্তু বিধি বাম। সুস্থ বাচ্চা প্রসব করলেও মৌ-এর রক্তাল্পতায় শারীরিক অবনতি রাজাকে বিব্রত করে। বলা হয়, A+ গ্রুপের রক্ত এই মুহূর্তে হাসপাতালে নেই, তাই বাইরে থেকে দ্রুত আনতে বলা হয়। উদভ্রান্তের মতো দ্রুত ছুটে গাড়ি ধরতে গিয়ে রাজা সেনের দেহ বাসের পিছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে দলা পাকিয়ে যায়। পকেটে থাকা আইডেন্টি কার্ড ও মোবাইল দেখে পুলিশ মাকে দ্রুত ফোন করে। একমাত্র ছেলের অকাল মৃত্যুর খবর শোনা মাত্র তিনি মারাত্মক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

মায়ের কাছ থেকে আগেই পুলিশ জানতে পেরেছিল হাসপাতালে ভর্তি রাজা সেনের স্ত্রী মৌ-এর সংকটময় অবস্থার কথা। হাসপাতালে পুলিশ যোগাযোগ করে, যাতে মৌ ও তার সন্তানকে বাঁচানো যায়। কিন্তু বিধাতার দিনলিপি ছিল অন্যরকম। তাই রক্ত পৌঁছানোর আগেই মৌ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিন কুলে কেউ না থাকায়, বাচ্চাটি তাই নার্স ও ডাক্তারবাবুদের হেফাজতে বড় হতে থাকে। ইন্ডিয়ান বলেই সবাই আদর করে ওর নাম দেয় রৌদ্র। আজও চলছে এমনি করে হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সদের কোলে-পিঠে রৌদ্রের দিন গুজরান।

একদিন রৌদ্র অনেক বড় হয়ে জানতে পারবে তার জন্মের ইতিহাস। ঘৃণায়, আত্মগ্লানিতে হয়তো নিজেকে শেষ করে দিতে চাইবে। কারণ তার আগমনে এমনি করে হারিয়ে গেছে তার প্রিয় বাবা, মা ও দিদা। এ জীবনে হয়তো আর তার বাবা-মা, দিদা ডাকটা আর হয়ে উঠল না।

এখন রৌদ্র হাঁটি হাঁটি পায়ে ছুটে বেড়ায় রোগীদের এক বেড থেকে অন্য বেডে। সবাই তার সান্নিধ্য উপভোগ করে। রৌদ্রের এক আত্মীয় ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে ওকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়, কারণ ইংল্যান্ডের আদালত শিশু-পরিচর্যার ভার নেওয়ার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ইংল্যান্ডের একটি মানবিক সংগঠন এই দুর্ঘটনার জন্য ইংল্যান্ড সরকারকে এক প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন হাসপাতালে ওই গ্রুপের রক্ত ছিল না! যদি না থাকে, রোগীর আত্মীয়কে কেন তা আনতে বলা হলো? পুলিশ কেন মৃত্যুর খবর ফোনে মাকে জানাল? এবং যাত্রীকে ঠিকঠাক না তুলে কেন বাসটি দ্রুত বেরিয়ে গেল?

হয়তো আগামী দিনে এই নিয়ে অনেক ভাবনা-চিন্তা হবে, কিন্তু রৌদ্র কি ফিরে পাবে তার বাবা-মা-দিদাকে আর কোনোদিন?
——————————————————-
অমরেন্দ্র কালাপাহাড়

কবি ও গল্পকার অমরেন্দ্র কালাপাহাড় পরিচিতি: ১৩৬৬ বঙ্গাব্দের ১০ই আশ্বিন দক্ষিণ ২৪পরগনা জেলার কুলপি থানার তারাচাঁদপুর গ্ৰামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম। অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক,এম এ বিএড। শৈশবে টুকিটাকি লেখা হলেও ২০১৮ থেকে পঞ্চাশের বেশি সাহিত্য পত্রিকা ও ফেসবুকে নিয়মিত লেখালেখি। বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ-খোলা আকাশ (২০২০)।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!