Shadow

সাক্ষী সেগুন গাছ – আশিস দাস

PC ফেসবুক
সাক্ষী সেগুন গাছ
আশিস দাস

 

তখন হেডমাস্টার হিসেবে চাকরি করা বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে; নতুন স্কুল তখন পুরনো হয়ে গেছে। সেই সময় আমার একটা অভ্যাস ছিল, আমি স্কুলে গিয়েই প্রথমে এক গ্লাস জল খেতাম। স্কুলে যাবার আগেই আমাদের পিওন ভৃগু সেই জল রেডি করে রাখত।

 আমি সেদিন গিয়ে চেয়ারে বসার পর ভৃগু জল নিয়ে এল। ভৃগুর মুখটা থমথম করছে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ ভক্ত চলে গেল, স্যার।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “ভক্ত চলে গেল? কোথায়?”

“সকালবেলা, একটা ট্রাক, স্যার…” ভৃগু আর কথা বলতে পারল না।

তারপর খগেন, আরেকজন পিওন, সব বলল — “সকালবেলা একটা ট্রাক ভক্তকে পিষে দিয়ে চলে গেছে, স্কুলের সামনেই।”

মনটা দুঃখে ভরে গেল। ভৃগুর চোখে তখন জল, ও আর কথা বলতে পারল না। তারপর খগেন বলল, ওরা দু’জনেই সুইপার ডেকে ভক্তকে রাস্তা থেকে তুলে এনে আমাদেরই স্কুলের মাঠের এক প্রান্তে একটা সেগুন গাছের নীচে মাটি চাপা দিয়েছে।

খগেন বলল, “সেই সেগুন গাছটা, স্যার, আপনি জানেন তো সেই ঘটনা, ওই গাছটার নীচে… চলুন স্যার, একবার দেখে আসবেন।”

আর তো দেখার কিছুই নেই, তবু ভক্ত কোথায় শুয়ে আছে দেখার ইচ্ছে আমার হলো, কারণ ভক্তর সাথে আমারও বিশেষ চেনাজানা ছিল। ‘ভক্ত’ একটি কুকুরের নাম। এই নাম কে দিয়েছিল আমি জানি না, তবে সবাই ওকে ভক্ত নামেই ডাকত। ভক্ত রাত্রে আমাদের স্কুলেই থাকত, ভোর হলে চলে যেত। রোজ আমি স্কুলে যাবার পর একবার আসত, আমার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াত, একটু পরে নিজেই চলে যেত। স্কুলের ছেলেদের সাথে ওর খুব খাতির ছিল, ওরা ভক্তকে বিস্কুট খাওয়াত। আসলে ভক্ত আমাদের স্কুলেরই একজন হয়ে গেছিল।

এই স্কুলের পেছনে যে ওর অনেক অবদান, এই স্কুলের ছাত্রদের সাথে ওর যে পরম সম্পর্ক আছে, সে কথা আমরা জানতাম।

সেই ভক্ত স্কুলের সামনেই মারা গেছে, সেই ভোরবেলায়, শুনে সবারই মন খারাপ।

আমি ভৃগু, খগেনের সঙ্গে সেই সেগুন গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম।

মনে পড়ল, বেশ কয়েক বছর আগে, আমি এই স্কুলে আসার প্রথম দিকে, একদিন স্কুলে যাবার পর ভৃগু এসে বলেছিল, “স্যার, আজ খুব ভোরে একটা দারুণ ঘটনা ঘটেছে। খুব ভোরবেলা, সবে আলো ফুটেছে, আমি দেখছি যে অনেক কাক উড়ছে, খুব কা-কা করে চিৎকার করছে আর চক্কর খাচ্ছে। আমি সেই দেখে মাঠের দিকে গেলাম। গিয়ে দেখি আমাদের মাঠের সেগুন গাছটার নীচে একটা ছোট্ট বাচ্চা, হয়তো কালই জন্ম হয়েছে, একটা কাঁথা জড়ানো, শুয়ে আছে আর তারই ওপরে কাকগুলো উড়ছে। আশ্চর্য জিনিস দেখলাম, আমাদের স্কুলের বারান্দায় যে কুকুরটা থাকে , যাকে সবাই ‘ভক্ত’ বলে, সেই কুকুরটা বাচ্চাটার চারদিকে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, এদিক থেকে ওদিক, কাকগুলোকে নীচে নামতেই দিচ্ছে না। আমি সেই দেখে খগেনকে ডাকলাম। মাঠের পাশের বাড়িগুলোর লোকজনরা বেরিয়ে এল; পুলিশ এল; বাচ্চাটাকে ভক্তই বাঁচিয়ে দিল, স্যার!”

আমি অবাক হয়ে শুনেছিলাম পুরো ঘটনা। সেই থেকে ভক্ত সবার কাছে ‘হিরো’ হয়ে গেছিল।

এই ঘটনার পরবর্তী অংশও অনেক ঘটনাবহুল।

খবর পেয়েই চতুর্দিক থেকে ছুটে এসেছিল মানুষ। সেখানে এসেছিলেন দীপ্তি সেনগুপ্ত ও তাঁর স্বামী বিজন সেনগুপ্ত। দীপ্তিদি একটা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকা আর বিজনবাবু জীবন বীমা সংস্থায় কাজ করেন। ওঁদের ছেলেমেয়ে নেই। দীপ্তি দিদিমণি উপস্থিত সবার কাছে হাতজোড় করে আবেদন করেছিলেন, বাচ্চাটাকে সবাই যেন তাঁর হাতেই দেয়। পুলিশ অফিসার যিনি উপস্থিত ছিলেন, তাঁর হয়তো একটু মায়াই হয়েছিল। তিনি উপস্থিত সবার মত নিয়ে বলেছিলেন যে এ বিষয়ে কিছু আইনি ব্যবস্থা থাকে। যাই হোক, সেই সব আইনি ব্যবস্থায় তিনি সহযোগিতা করেছিলেন, যার ফলে দীপ্তি দিদিমণি ওই ছেলেটিকে নিজের সন্তানের স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছেন, নাম রেখেছেন অর্ক। সেই অর্ক পরবর্তীকালে আমাদের স্কুলেই ভর্তি হয়েছে। অর্ককে বড় হতে দেখলাম, সেই গাছটারও অনেক বয়স হয়ে গেল।

আজ সেই গাছের নীচেই চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে থাকল ভক্ত।

ভক্তর কাছে এই গাছতলার থেকে বড় শান্তির জায়গা আর হতে পারে না, তাই ভৃগু, খগেন ভক্তকে ঠিক জায়গায়ই শুইয়ে রেখেছে।

মনটা খারাপ হয়ে গেল… স্কুলে সেদিন আর ভালো লাগল না…

আজ অনেক দিন হয়ে গেল, দীপ্তি দিদিমণি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, বিজনবাবু আছেন, খুবই বৃদ্ধ, চলাফেরা করতে পারেন না। অর্ককে দেখতে পাই মাঝে মাঝে। অর্ককে দেখলেই মনে পড়ে ভক্তকে আর মনে পড়ে সেই সেগুন গাছটাকে, যে সব ঘটনাই দেখেছিল প্রথম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত!
——————————————————

আশিস দাস পরিচিতিঃ
জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগণার ভাটপাড়ায়,শৈশব থেকেই কয়লাখনির শহর আসানসোলে বাস। পড়াশোনা আসানসোল, বর্ধমান ও কল্যানীতে। ইংরাজি সাহিত্যে M.A. ত্রিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে বিশ বছরই আসানসোল মহিশীলা বয়েজ’ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আধুনিক ইংরাজি কবিতার,বিশেষ করে W B Yeats ও T S Eliot এর পরম ভক্ত,ভালো লাগে ইংরাজি ও বাংলা ভাষায় প্রবন্ধ লিখতে,আর ভালো লাগে রবীন্দ্রসঙ্গীত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!