
কেউ কথা রাখেনি
সিতাংশু শেখর বিশ্বাস
কেউ কথা রাখেনি!
রাত ও ভোরের সন্ধিক্ষণে মানুষ স্বপ্ন দেখে,
তা নাকি বাস্তব?
কত রাত অতিবাহিত করেছি,
সকাল হবার আশায়, হাজার স্বপ্ন দেখে।
পুড়ে গেছি ভোরের আলোয়,
দুপুরের প্রখর উত্তাপ আজ তাই আর জ্বালায় না।
রাত গভীর হলে মনের ক্ষুধা বাড়ে।
আহত ঠোঁট, আমার পিপাসু কণ্ঠ আর নিঃস্ব বক্ষ,
অনাদ্রতা, মরীচিকা আর মিথ্যা আস্ফালন ছাড়া কিছুই পায় না।
তাই এসবের মাঝে, আমার চাওয়া পাওয়ার মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনি,
কবে আমি আবার নতুন হবো তোমার কাছে?
————————————————————————————–
চেনা অচেনা
সিতাংশু শেখর বিশ্বাস
কয়েকদিন আগে একটা মজার ঘটনা ঘটলো, লিখবো লিখবো করেও লেখা হয়ে ওঠেনি, আজ(10/12/2024) ল্যাবের কাজ একটু কম, তাই ভাবলাম আগে লিখে নিয়ে তবে bf করবো | গত পয়লা ডিসেম্বর(01/12/2024) সন্ধ্যায় বিপ্লব দার বাড়িতে একটা মিটিং ছিল, ওদিন সকাল থেকেই কালপাক্কাম এ বৃষ্টি, খুব বাজে ওয়েদার, বিপ্লব দা কে বললাম হয়তো আসা হবে না, দাদা বললেন যে এদিকে শুকনো পরিবেশ, চেন্নাই এর দিকে এসে যাও, কোনো অসুবিধে নেই| তাই দুপুরের খাওয়া সেরে চেন্নাইয়ের দিকে রওনা দিলাম, সত্যিই ওদিকে বৃষ্টি নেই, তিরুপরুর পেরোলেই আর কোনো বৃষ্টি নেই, ভাবলাম ভালোই হলো তাহলে যাওয়া যাবে, একটু ক্লান্ত ই ছিলাম, এসেই শুয়ে পড়লাম, সাড়ে পাঁচটার দিকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বেরোবো| বৃষ্টি না থাকলেও মেঘলা আবহাওয়া, এতো ঘুম ধরেছিলো যে ভাঙলো একেবারে পৌনে ছটায়, উঠে রেডি হয়ে বেরোতে বেরোতে ছ টা পনেরো হয়ে গেলো , একটু জোরেই গাড়ি চালাচ্ছিলাম, হঠাৎ করে দেখি সিরুচেরির junction এ পুলিশ কাগজ পত্র চেক করছে, তাড়াহুড়োর চোটে আই কার্ড টাও আনতে ভুলে গেছি, আই কার্ড টা অনেক বার অনেক কাজে এসেছে, অনেক ভুল ভাল করে ওই আই কার্ড দেখিয়ে বেঁচে গেছি, যাইহোক শেষমেষ দেখি আমার গাড়ি পাশে দাঁড় করালো, এবার কাগজ চাইছে, আমার সব কিছুই ডিজি লকার এ রাখা, আমি দেখালাম, এবার সেই পুলিশ বলছে আসল কাগজ দেখাও, সত্যি কথা বলতে গত প্রায় তেরো বছর হলো রাস্তায় কোনোদিন ও পুলিশ অরিজিনাল দেখতে চায়নি, আমি ওনাকে এতো বোঝাচ্ছি যে ডিজি লকার রিকগ্নাইস্ড, উনি কিছুতেই বুঝতে চাইছে না, আমাকে তো কেস দেবেই, আমি বললাম যে দেখুন কেস দেবেন না, আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স টা রেখে দিন, কাল বিকেলে আমি সব অরিজিনাল আপনাকে দেখাবো ওগুলো আমার কালপাক্কাম এর ঘরে রাখা আছে, যদি না দিই তখন যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবেন, ভাগ্যিস ড্রাইভিং লাইসেন্স এর অরিজিনাল টা গাড়িতে ছিল, এই বলে আমি আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স টা ওনার হাতে দিলাম, উনি ড্রাইভিং লাইসেন্স টা হাতে নিয়ে হঠাৎ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ,’আপনি কি বিশ্বাস স্যার?’
আমি তো অবাক, বললাম ,’ হ্যাঁ !’
জিজ্ঞেস করলাম ,’আপনি কি আমায় চেনেন?
উনি বললেন, চিনবো না? হয়তো আপনাকে দেখিনি, আমার ছেলের মুখে এখনো রোজ হয়তো একবার আপনার কথা শুনি |’
আমি বললাম,’ কি নাম আপনার ছেলের?’
উনি বললেন,’ আপনার ছাত্র “সারাভানান”,
বললাম,’ সিঙ্গাপেরুমাল কইল এ থাকে কি?’
উনি বললেন,’ হ্যাঁ , আমি তার বাবা | ‘
শুনে মুহূর্তের ভিতর প্রায় বছর চারেক আগের সারাভানানের সাথে আমার কয়েকটা মাসের কথা মনে পড়ে গেল | সারাভানান তখন বি টেকের ছাত্র, ওকে আমার ল্যাব এ ডেকেছিলাম ইন্ডাকশন মোটরের ভেক্টর কন্ট্রোল বানানোর জন্য, এক কথায় রাজি হয়েছিল, বলেছিলো ,’স্যার শিখিয়ে দিলে ঠিক করে ফেলবো |’
সত্যি কথা বলতে ওই কাজটি করার জন্য আমি অনেক ছাত্রদের ডেকেছিলাম, একবারতো কোনো আই আই টি থেকে একদল ছেলে এসেছিলো, ওটা শুনেই তারা যে কোথায় পালিয়ে গেছিলো আর দেখা মেলেনি| পুরো কাজটা বুঝতে সারাভানান কুড়িদিন সময় নিয়েছিল, তিনমাসের ভিতর মোটর চালিয়ে দেখিয়েছিল, বিষয়টা একটু কঠিন ছিল, আসলে ইন্ডাকশন মোটরকে ডিসি মোটরের মতো চালানোকেই ভেক্টর কন্ট্রোল বলে যেখানে টর্ক ও স্পিডকে আলাদাভাবে কন্ট্রোল করা যায়, খুব মনোযোগী ছাত্র ছিল সারাভানান, ওর সাথে আর একজন ছেলে এসেছিল, তার নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না, দুজনে মিলে সারাদিন কাজে ডুবে থাকতো, বেশ মনে আছে সারাভানান এর মা প্রায় ই পরোটা টাইপের কিছু আর তার সাথে টমেটো রসুন দিয়ে একটা টক টাইপের গ্রেভি বানিয়ে পাঠাতো | খুব টেস্টি ছিল ওর মায়ের হাতের রান্না, সারাভানান একটা জাহাজ কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছিলো, চাকরি পেয়েই ফোন করেছিল আমাকে | বলেছিলো ,’ স্যার, আপনার প্রজেক্ট টা দেখিয়েই সিলেক্ট হলাম | ‘ বহুদিন সারাভানান এর সাথে যোগাযোগ নেই, আজ ওর বাবা বললেন যে স্যার ও সেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে, এখন সিভিল সার্ভিস এর জন্য গত দেড় বছর প্রিপারেশান নিচ্ছে, আমি জানি সিওর সারাভানান ভালো র্যাঙ্ক করবে, খুব একনিষ্ঠ ও পরিশ্রমী ছেলে সারাভানান| এদিকে আমার সময় তো দৌড়চ্ছে, সারাভানান এর বাবা তো আমায় ছাড়বেই না, বলছে স্যার চলুন কোথাও বসে খাবেন, আমি বললাম ,’ দেখুন আমি আমার এক দাদার বাড়ি যাচ্ছি, ওখানে রাতের ডিনার, উনিতো কিছুতেই ছাড়বেন না | আমি শেষমেষ বললাম,’ চলুন তাহলে ওই কফির দোকানে, সিরুচেরি থেকে পাদুর এর দিকে একটু এগোলেই ওখানে ডানদিকে একটা ভালো কফির দোকান আছে, ওখানে গেলাম | ‘
উনিতো কফি স্নাক্সস মিষ্টি সব অর্ডার করে যাচ্ছেন | আমি ভাবলাম বিপ্লবদার বাড়িতে আর হয়তো খেতে পারবোনা, বাঙালি খাবার খেতে পারবো না ভেবে খারাপ লাগছিলো | কিন্তু উনিতো নাছোড়বান্দা, কফি আর একটু মিষ্টি খেয়ে বললাম,’ আজ উঠি তাহলে, একদিন আপনার বাড়ি যাবো |’
এই কুড়ি পঁচিশ মিনিট আমাকে নিয়ে গেছিলো বছর চার পাঁচ আগের কিছু মিষ্টি স্মৃতি রোমন্থনে, ওনাকে বিদায় জানিয়ে যখন বিপ্লব দার বাড়ি পৌঁছলাম, তখন প্রায় সাড়েসাতটা, খুব বেশি লেট্ হয়নি দেখলাম | পার্থদা, সৌম ওরা সব দেখি গেট এ সিগারেট খেতে এসেছে, আমিও ওদের সাথে যোগ দিলাম ।।
——————————————————-
