Shadow

দাম্পত্য – নবনীতা চক্রবর্তী

দাম্পত্য
নবনীতা চক্রবর্তী

 

দামিনীদেবী রেগে গজগজ করে চেঁচিয়ে বললেন,

“যাহ্! আবার একটা কাপ ভাঙলে! এক হাতে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে, এক হাতে কাপ তুললে ভাঙবে না তো কী! চারুশিল্প মেলার সিকিমের স্টল থেকে কত শখ করে চারটে কাপ কিনলাম! এইভাবেই, ঠিক এইভাবেই মোবাইল হাতে নিয়ে কাপ তুলতে গিয়ে দুটো ভাঙলে! শখ-শৌখিনতা বলে তো কিছু নেই! এখন হয়েছে শুধু মোবাইল! কী ছাতার খবর সারাক্ষণ দেখতে থাকো!”

বলেই চললেন দামিনী,

“শুধু অর্ডার করতে আর খেতে শিখেছ! পারব না আমি এসব ফাইফরমাশ খাটতে! নিজের চা নিজে করে খাবে।”

এবার কুমুদবাবু মুখ খুললেন,

“তা বলি, করবেটা কী সারাদিন! কিটি পার্টি! রান্নাটাও তো ঠিকঠাক পারো না! উহ্, কী সব খাবার বানাত মা!”

“ব্যস, শুরু হল খাবার পুরোনো কীর্তন! জ্বালিয়ে মারলে, এই লোক সারাজীবন…” — গজগজিয়ে ঘরে ঢুকে দোর দিলেন দামিনী।

—

রেবাদেবী বারান্দায় চা নিয়ে বসেছিলেন। শীতের সকাল। রোদটা বেশ আরামদায়ক। মিটিমিটি হাসেন রেবা। পাশের বাড়ির কুমুদবাবু ও দামিনীর কলহ শুনে। প্রায়ই শোনেন।

রিটায়ারমেন্টের পর এখন এই বারান্দাটাই রেবার প্রাণ। অনন্ত সময়। প্রচুর গাছের টব বসিয়েছেন। তাদের পরিচর্যায় অনেকটা সময় কাটে। তাছাড়া বই পড়া, রোদ পোহানো তো আছেই! খুব একটা মিশুকে নয় রেবা। আর এতদিন স্কুলে পড়াতে যাওয়া-আসার ঘেরাটোপের জীবন ছিল। এখন একা লাগে।

তাঁদের বাড়িটি ভীষণ শান্তিপূর্ণ। কেউ থাকে বলেই মনে হয় না। স্বামী সারাদিন স্টাডিতেই ব্যস্ত থাকেন। তাঁর সাথে রেবার দিনে ক’টা কথা হয় গুনে বলা যায়। বড় ব্যারিস্টার। রেবার সাথে দু’দণ্ড কথা বলার সময় বা ইচ্ছে, কোনোটাই তাঁর তেমন নেই বলেই রেবার মনে হয়। সন্তানাদিও নেই তাঁদের। দুটি মানুষ যেন নদীর দুই পাড়ের বাসিন্দা। একই স্রোতে শুধু বয়ে যাওয়া জীবন।

তাই, ওই বাড়ি থেকে যখন কলহ বা আবেগঘন কথাবার্তার ফুলঝুরি রেবার কানে ছিটকে আসে, মনটা উদাস হয়।

যদিও পাড়ার লোকজন কুমুদবাবুর বাড়িকে বলে ‘পাগলাগারদ’, আর রেবাদের বাড়িকে বলে ‘শান্তিনীড়’। রেবা ভাবে, লোকের কথায় কী যায় আসে! এখন যদি সে জীবনে অমন একটি উষ্ণতা-মাখা পাগলাগারদ পেত, বেশ হতো তবে।

ভাবে, দামিনীর সাথে গিয়ে আলাপ করবে একদিন। তার কিটি পার্টিতেও যুক্ত হতে ইচ্ছে হয় রেবার, এখন।
———————————————————————————————————————————————-

নবনীতা চক্রবর্তী কলকাতার সল্টলেকের বাসিন্দা। ২০১৭ সাল থেকে কিছু লেখালেখি শুরু করেন। ছোট-গল্প থেকে কবিতা সংগ্রহে আছে কিছু। কিছু ওয়েব ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। একটি নিজের প্রকাশিত কবিতার বই আছে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!