Shadow

হর্ষিল: যেখানে দেবদারুর ছায়ায় ইতিহাস আর ঈশ্বর কথা বলে – অজন্তা প্রবাহিতা

pic : Sab khabar
হর্ষিল: যেখানে দেবদারুর ছায়ায় ইতিহাস আর ঈশ্বর কথা বলে
অজন্তা প্রবাহিতা

 

হিমালয় মানেই এক অদ্ভুত কৌতূহল আর অমোঘ টান। শৈশবে পড়া ভূগোল বইয়ের পাতা থেকে শুরু করে পরিণত বয়সের আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা— সবকিছুই যেন গিয়ে মেশে উত্তরের পাহাড়গুলোতে। কিন্তু উত্তরাখণ্ডের ভিড়ভাট্টা আর পর্যটকদের কোলাহল থেকে দূরে এমন এক লুকানো স্বর্গ আছে, যার নাম হর্ষিল। উত্তরকাশী জেলায় ভাগীরথী নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই জনপদটি আজও লোকচক্ষুর অন্তরালে অনেকটা স্বর্গের মতোই শান্ত।

আমার এক ভাই মহেশ, যিনি পেশায় একজন চালক এবং নেশায় পাহাড়-প্রেমী, তার মুখ থেকে হর্ষিলের বর্ণনা শুনে আমি এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছি যে প্ল্যান করেই ফেললাম হর্ষিল যাবার। তার স্টিয়ারিং ধরার অভিজ্ঞ চোখে দেখা হর্ষিল আর ইতিহাসের পাতায় থাকা হর্ষিল— এই দুইয়ের মিলনেই গড়ে উঠেছে এই ভ্রমণ আখ্যান। উত্তরকাশী জেলা দিয়ে যখন গাড়িটা পাহাড়ি বাঁক নিতে নিতে এগোচ্ছিল, জানালার বাইরে ভাগীরথীর গর্জন আর পাইনের সুবাস আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, আমি শুধু এক পর্যটন কেন্দ্রে যাচ্ছি না, আমি যাচ্ছি এক প্রাচীন গল্পের গভীরে।

হরি-শিলা থেকে হর্ষিল

‘হর্ষিল’ কোনো সাধারণ নাম নয়; এটি আসলে ‘হরি-শিলা’। এর পেছনে থাকা পৌরাণিক কাহিনীটি যেমন রহস্যময়, তেমনই আবেগপূর্ণ।

পুরাণ অনুসারে, জলন্ধর ছিলেন এক অপরাজেয় অসুর রাজা। তাঁর জন্মের ইতিহাসটিও বেশ অদ্ভুত। বলা হয়, মহাদেবের ক্রোধাগ্নি যখন সমুদ্রে গিয়ে পড়েছিল, সেই আগুন আর জলের মিলন থেকেই জলন্ধরের জন্ম। শিবের অংশ থেকে জন্ম হওয়ায় তিনি ছিলেন প্রচণ্ড শক্তিশালী। কিন্তু তাঁর আসল রক্ষাকবচ ছিল তাঁর স্ত্রী বৃন্দার সতীত্ব ও বিষ্ণুভক্তি। বৃন্দা যতক্ষণ পবিত্র থাকতেন, ততক্ষণ জলন্ধরকে কেউ পরাজিত করতে পারত না।

জলন্ধরের দাপট যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন দেবতাদের অনুরোধে ভগবান বিষ্ণু এক কঠিন ছলনার আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন। তিনি জলন্ধরের রূপ ধরে বৃন্দার সামনে উপস্থিত হন। স্বামীর রূপ দেখে বৃন্দা যখন তাঁকে স্পর্শ করেন, তখনই তাঁর সতীত্ব ভঙ্গ হয় এবং জলন্ধরের রক্ষাকবচ ভেঙে যায়। এই সুযোগে মহাদেব তাঁর ত্রিশূল দিয়ে জলন্ধরকে বধ করেন।

পরে যখন বৃন্দা বিষ্ণুর এই ছলনা বুঝতে পারলেন, তিনি শোকে ও রাগে পাথর হয়ে যাওয়ার অভিশাপ দিলেন তাঁরই আরাধ্য দেবতা বিষ্ণুকে। তিনি বলেছিলেন, “তুমি পাষাণের মতো কাজ করেছ, তাই তুমি পাথরেই পরিণত হও।” ভক্তের সেই অভিশাপ মাথা পেতে নিয়ে বিষ্ণু এই উপত্যকায় শিলা বা পাথরের রূপ ধারণ করেন। সেই পবিত্র শিলা বা ‘হরি-শিলা’ থেকেই আজকের ‘হর্ষিল’।

ভাগীরথী নদীর তীব্র স্রোত যখন পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে, তখন মনে হয় যেন মা গঙ্গা আজও সেই হরি-শিলাকে প্রণাম জানিয়ে বয়ে চলেছেন।

দেবদারুর মায়া ও পৌরাণিক নিস্তব্ধতা

গাড়ি থেকে নামতেই ঝাপটা দিয়ে আসা হিমশীতল হাওয়া আর চোখে আছড়ে পড়া গাঢ় সবুজ রঙ মুহূর্তেই শরীরের সব ক্লান্তি ধুয়ে দেয়। অনেকেই হর্ষিলকে “ভারতের মিনি সুইজারল্যান্ড” বলেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, হর্ষিল তার চেয়েও বেশি কিছু। সুইজারল্যান্ডে জ্যামিতিক সৌন্দর্য থাকতে পারে, কিন্তু হর্ষিলে যা আছে তা হলো এক অতিলৌকিক প্রাণ।

উপত্যকার চারিদিকে দীর্ঘকায় দেবদারু বা দেওদার গাছের জঙ্গল যেন আকাশ স্পর্শ করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। স্থানীয়রা মনে করেন, এই দেওদার বা ‘দেব-দারু’ হলো স্বয়ং দেবতাদের বৃক্ষ। সূর্যের নরম আলো যখন সেই প্রাচীন পাতার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে বনের ঘাসওয়ালা মাটিতে পড়ে, এক অদ্ভুত আলো-আঁধারির মায়াজাল তৈরি হয়।

পাহাড়ি রাজার দেশ

হর্ষিলের এই প্রাচীন মায়াবী স্তব্ধতার মাঝে আধুনিকতার বীজ বপন করেছিলেন এক খামখেয়ালি ইংরেজ — ফ্রেডরিক উইলসন। সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ সৈন্যদল থেকে পালিয়ে আসা এই মানুষটি হর্ষিলের প্রেমে পড়ে এখানেই ঘর বেঁধেছিলেন।

ইতিহাস বলে, উইলসন সাহেবই প্রথম এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক আপেল চাষের সূচনা করেন। তাঁর হাত ধরেই হর্ষিল পেয়েছিল তার আজকের পরিচিতি — বিখ্যাত ‘উইলসন অ্যাপেল’। স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন পরম আপন, তাই তারা তাঁকে আদর করে নাম দিয়েছিল ‘পাহাড়ি রাজা’। আজও সেই কাঠের তৈরি দোতলা ‘উইলসন কটেজ’ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আজকের হর্ষিল সময়ের এক জীবন্ত ক্যানভাস। দিগন্তে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা তুষার-শুভ্র শৃঙ্গগুলো যখন সকালের রোদে রুপোর মতো চকচক করে, মনে হয় যেন তারা আকাশের নীলিমা ছুঁতে চাইছে।

পাহাড়ি রসনা ও সহজ জীবনের কঠিন সত্য

হর্ষিল কোনো গ্ল্যামারাস শহর নয়, হর্ষিল আসলে একটি অনুভূতি। এখানে পাথরে বাঁধানো মেঠো পথ দিয়ে হাঁটলে অনুভব করা যায়, আধুনিক সভ্যতার ইঁদুর দৌড় থেকে এই জনপদ কত দূরে।

পাহাড় ভ্রমণে রসনাবিলাস কেবল বিলাসিতা নয়, এটি টিকে থাকার রসদ। আমাদের রাত কাটানোর ব্যবস্থা হয়েছিল মহেশের এক বন্ধুর বাড়িতে।

হর্ষিলের ঘরে ঘরে যে খাবারটি সবচেয়ে জনপ্রিয়, তা হলো ‘গাহাত কি ডাল’। এই ডাল পাথুরে মাটিতে জন্মানো এক বিশেষ শস্য থেকে তৈরি, যা হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় শরীরকে ভেতর থেকে গরম রাখে। সাথে থাকে ‘মণ্ডুয়া কি রুটি’ — আঙুল জোয়ার বা রাগির তৈরি এই রুটি যেমন পুষ্টিকর, তেমনই শক্তিদায়ী।

আর মিষ্টির কথা উঠলে স্থানীয় মিষ্টি ‘বাল মিঠাই’ এর কথা না বললেই নয়। খয়েরি রঙের চকোলেটের মতো এই মিষ্টি ছোট ছোট সাদা চিনির দানায় মোড়া থাকে।

এখানে শীতের কয়েক মাস বরফের নিচে ঢাকা থাকে সব কিছু। তাই এখানকার নারীদের হাতে তৈরি পশমি শাল বা পুরুষদের গায়ে থাকা তামাটে রঙের গারোয়ালি টুপি কেবল ফ্যাশন নয়, শীতের হাত থেকে বাঁচার বর্ম। সন্ধেবেলা নির্জনতায় কান পাতলে মাঝেমধ্যে ভেসে আসে ‘ঢোল-দামাউ’ এর আওয়াজ।

শহরের মানুষের কাছে যা ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’, এখানকার মানুষের কাছে তা-ই দৈনন্দিন সংগ্রামের মাটি। কিন্তু এত প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁদের আতিথেয়তায় কোনো কমতি নেই। আগন্তুককে তাঁরা ঘরের সদস্যের মতোই আপ্যায়ন করেন।

জরুরি তথ্য

স্বাস্থ্য:  হর্ষিল মূলত একটি নির্জন পাহাড়ি জনপদ, তাই এখানে বড় কোনো মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল আশা করা ভুল হবে। ছোটখাটো চোট বা সাধারণ অসুস্থতার জন্য এখানে একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। তবে গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে উত্তরকাশী জেলা হাসপাতালে যেতে হয়। ভ্রমণে আসার সময় নিজের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ও ফার্স্ট এইড কিট সাথে রাখুন। হর্ষিল প্রায় ৭,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত, তাই পর্যাপ্ত জল খাওয়া এবং শরীরকে উচ্চতার সাথে মানিয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া প্রয়োজন।

– কোথায় থাকবেন?: এখানে থাকার জন্য সেরা অভিজ্ঞতা হলো হোমস্টে। এছাড়া সরকারি GMVN গেস্ট হাউস থেকেও পাহাড়ের প্যানোরামিক দৃশ্য অপূর্ব লাগে। আর যারা একটু রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য ভাগীরথীর তীরে লাক্সারি টেন্ট বা ক্যাম্পিং হতে পারে জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা।

 কখন যাবেন?:

   বসন্ত ও গ্রীষ্ম (এপ্রিল থেকে জুন): যখন উপত্যকা ফুলে ফুলে ভরে ওঠে।

   শরৎ (সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর): যখন আকাশ থাকে কাঁচের মতো পরিষ্কার আর আপেল বাগানে ফল পাকার সময়। এটিই ভ্রমণের সেরা সময়।

পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমে যাওয়া পথ ধরে ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, হর্ষিল কেবল পাথর আর জলের সংমিশ্রণ নয়, এটি একটি জীবন্ত পুরাণ। এই ভ্রমণ কাহিনীটি সম্ভব হতো না আমার ভাই মহেশের সেই জহুরির চোখ আর নিরাপদ চালনা ছাড়া।
————————————————

অজন্তা প্রবাহিতা

অজন্তা প্রবাহিতাঃ
লেখক পরিচিতিঃ আসামের ডিব্রুগড় শহরে জন্ম। স্কুলিং আসামের তৈলনগরী ডিগবয়ে। উচ্চমাধ্যমিকের পরে উচ্চশিক্ষার জন্য স্বপ্নের শান্তিনিকেতনে পাড়ি। সেখান থেকে অর্থনীতি নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী। বিভিন্ন পত্রিকা ও সংকলনে লেখালেখি করেন। বন্যপ্রাণী ও পাখী সংরক্ষণের চেষ্টায় নিকটতম বন্ধুদের সাথে www.lensinwoods com নামে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংরক্ষণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। জীবনের লক্ষ্য,নিজের কাজের সাহায্যে যেন পৃথিবীর বুকে নিজের একটা আঁচড় কেটে যেতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!